বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) বাজার কয়েক বছর ধরে নতুন নতুন বিনিয়োগ পাচ্ছে। নতুন মডেলের বিক্রি পূর্বাভাস ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার ছড়াছড়ি লক্ষ করা গেছে। শেয়ারবাজারে অটোমেকার ও এ খাতে স্টার্টআপে প্রবেশকারীদের বাজারমূল্য বেড়েছে দ্রুত। কিন্তু ভোক্তা রুচি ও সামর্থ্যের হেরফেরের কারণে সে উচ্ছ্বাসে ভাটা লক্ষ করা যাচ্ছে। এখন অনেক কোম্পানিই ধীরে চলার নীতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। খবর সিএনবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফোর্ড মোটর, জেনারেল মোটরস থেকে মার্সিডিজ-বেঞ্জ, ফক্সওয়াগন ও অ্যাস্টন মার্টিনের মতো বৈশ্বিক অটোমেকাররা ইভির ক্ষেত্রে পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইভির বাজারে নেতৃত্ব দিচ্ছে টেসলা, যারা ২০২৩ সালে বাজারটির ৫৫ শতাংশ দখলে রাখে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও ইলোন মাস্ক জানুয়ারির শেষ দিকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ইভির বিক্রি বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। এজন্য তারা প্রস্তুতও।
আগে ইভির ভবিষ্যৎ হিসেবে অল-ইলেকট্রিকের পূর্বাভাস দিত সব কোম্পানি। কিন্তু এখন প্রবৃদ্ধির মন্থরতার কারণে বিকল্প হিসেবে হাইব্রিড ও অল-ইলেকট্রিকের পাশাপাশি গ্যাসচালিত গাড়ির প্রস্তাব করছে।
ফোর্ডের ইভি ইউনিটের প্রধান অপারেটিং অফিসার মারিন গাজা জানান, ২০২১ ও ২০২২ সালে ইভির বাজারে যে ঊর্ধ্বগতি ছিল, সে চাহিদা এখন কমে গেছে।
ফোর্ডের উৎপাদন লক্ষ করলেও সে প্রমাণ পাওয়া যায়। অল-ইলেকট্রিক মডেলের চেয়ে তারা হাইব্রিডের উৎপাদন বাড়াচ্ছে। এ মডেলের বিক্রিও বাড়ছে। কারণ অনেক চালকই পুরো বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনে যেতে প্রস্তুত নন।
অতিপরিচিত জেনারেল মোটরস ইভি ও গ্যাসচালিত গাড়ির পাশাপাশি প্লাগ-ইন হাইব্রিড ইভির পরিকল্পনা করেছে। একই চিত্র হুন্দাই মোটর, কিয়া, টয়োটা মোটর ও ফক্সওয়াগনের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ফক্সওয়াগন যুক্তরাষ্ট্রের সিইও পাবলো ডি সি মনে জানান, এতদিন ইউরোপে হাইব্রিড গাড়ি বিক্রি করলেও মার্কিন বাজারে আনা হয়নি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি হলো বাজারে টিকে থাকার সর্বোত্তম উপায়।
স্পষ্ট করে বলতে গেলে ভোক্তা পর্যায়ে ইভির চাহিদা ও নির্বাহীদের প্রত্যাশা একইভাবে কাজ করছে না। তবে পূর্বাভাসগুলো এখনো আশাবাদী তথ্যই দিচ্ছে। এ খাতের বিশ্লেষক সংস্থা কক্স অটোমোটিভের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর রেকর্ড ১২ লাখ ইউনিট ইভি বিক্রি হয়, যা সামগ্রিক জাতীয় বাজারের ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুসারে, দশকের শেষ নাগাদ এটি ৩০-৩৯ শতাংশের মধ্যে বাড়বে।
আরেক বিশ্লেষক সংস্থা অটোফোরকাস্ট সলিউশনের গ্লোবাল ভেহিক্যাল ফোরকাস্টিংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট স্যাম ফিওরানি জানান, প্রযুক্তির রূপান্তরের সঙ্গে গ্রাহকের মানিয়ে নেয়ারও বিষয় রয়েছে। বিশেষ করে কম প্রযুক্তিবান্ধব ক্রেতাদের মানিয়ে নিতে সময় লাগার কারণে আগামী কয়েক বছরে ইভি মার্কেট শেয়ার মন্থর গতিতে বাড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অটোমেকারদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দেয়নি। তবে লক্ষ্য পূরণের পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। যেমন ২০৩৫ সালের অল-ইলেকট্রিক লক্ষ্য থেকে সরার ঘোষণা দেয়নি জিএম। কিন্তু কোম্পানির জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ক্যাডিল্যাক বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাসচালিত মডেলের উৎপাদন শেষ করার লক্ষ্যে তারা বহাল থাকছে না। একই ধরনের ঘটনা ফোর্ডের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। তারাও অনেক লক্ষ্য পিছিয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি পোরশের সিইও অলিভার ব্লুম জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের মোট গাড়ির ৮০ শতাংশ হবে ইভি। তবে সম্পর্কে "নমনীয় অবস্থানে" রয়েছে। কোম্পানিটি ইভি গ্রহণ ও নিয়মকানুন পর্যবেক্ষণ করছে।
ইভির ধীরগতি গ্রহণের ফলে ফোর্ড ম্যাসটাং ম্যাক-ই, টেসলা মডেল ওয়াই ও নিসান আরিয়ার মতো বেশ কয়েকটি মডেলের দাম কমানো বা ছাড় দেয়া হয়েছে।
গাড়ি কোম্পানিগুলোর ইভির লক্ষ্য তৈরিতে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণবিষয়ক উদ্বেগগুলো কাজ করছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে নীতিমালাও ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ না করলেও অটোমেকারদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে। কিন্তু ভোক্তা রুচির পরিবর্তনে ধীরগতি, প্রযুক্তি মূল্য ও পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশনের বিষয়টিও এখন বিবেচনায় আনতে হচ্ছে। এ কারণে পরিবর্তন আসতে পারে প্রস্তাবিত জ্বালানি নীতিতেও।










