যুক্তরাষ্ট্রের আবাসন খাতে ২০০৮ সালে বড় ধরনের ধস নামে, যা একসময় পুরো বিশ্বের আর্থিক খাতকে প্রভাবিত করে। বিশ্লেষকদের মতে, ওই পরিস্থিতি বিশেষভাবে ব্যাংক খাতের নাজুকতা ও নিয়ন্ত্রকদের ব্যর্থতা তুলে ধরেছিল। ব্রাসেলসভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ফাইন্যান্স ওয়াচের মতে, ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রণ আইনে সংস্কার আনা না হলে তেমন ঘটনা আবারো ঘটতে পারে। তবে এ ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব দেখা যাচ্ছে। ব্যাংকগুলোও যথাযথভাবে প্রস্তুত নয়। খবর ইউরো নিউজ।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আর্থিক খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের ২০০৮ সালের ঘটনা পুনঃবিশ্লেষণ জানিয়েছে ফাইন্যান্স ওয়াচ। কারণ সে সংকট এখন স্মৃতি থেকে ‘অনেকটাই বিবর্ণ’ হয়ে গেছে।
সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যতের যেকোনো সংকট মোকাবেলায় আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর পরস্পরকে সহযোগিতা করা উচিত। এজন্য সমন্বিত প্রবিধান ও মান নির্ধারণে কাজ করতে হবে। কিন্তু সহযোগিতার বদলে বৈশ্বিক পক্ষগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা ক্রমে বেড়ে চলেছে বলে সতর্ক করেছে ফাইন্যান্স ওয়াচ।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে ব্যাসেল থ্রি ফ্রেমওয়ার্ককে এগিয়ে নিতে অগ্রগতির অভাবকে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৭-০৯ সালের আর্থিক সংকটের যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সে লক্ষ্যে এ কাঠামো তৈরি করেছিল জি১০ দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। এর মাধ্যমে ব্যাংকে পর্যাপ্ত মূলধন সংরক্ষণ, আর্থিক চাপ পরীক্ষা ও তারল্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মান নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক সতর্কতা সত্ত্বেও ব্যাসেল থ্রি নিয়ে নীতিনির্ধারকরা ‘আত্মতুষ্টি’তে ভুগছেন বলেন অসন্তুষ্টি ফাইন্যান্স ওয়াচের।
এ বিষয়ে বেসরকারি সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক ও পরামর্শক ক্রিশ্চিয়ান এম স্টিফমুলার বলেন, ‘ক্রেডিট সুইসের পতন ও সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকসহ যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক খাতে ব্যর্থতায় সংস্কারসহ বড় ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মাঝে সে ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।’
ক্রিশ্চিয়ান এম স্টিফমুলারের মতে, বিশ্বব্যাপী ব্যাংকিং প্রবিধানের জন্য একীভূত কাঠামো তৈরির উদ্দেশ্যে ব্যাসেল থ্রি হলেও এখন পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের ব্যাংক শুধু ব্যাসেল থ্রির মান গ্রহণ করতে ব্যর্থই হচ্ছে না, বরং দেশগুলোর সীমিত অগ্রগতি এখন উল্টো দিকে যাত্রা করেছে। সহযোগিতা ও সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রবিধানকে উৎসাহিত করার পরিবর্তে ব্যাসেল থ্রির জটিল প্রকৃতি দেশভেদে আলাদা নিয়ম তৈরি করে দিচ্ছে এবং কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে বাধাগ্রস্ত করছে।
জরুরি অবস্থায় ব্যাংকে যেন পযাপ্ত অর্থ জমা থাকে তা নিশ্চিত করতে ব্যাসেল থ্রি ফ্রেমওয়ার্ক চালু করেছে ব্যাসেল কমিটি অন ব্যাংকিং সুপারভিশন (বিসিবিএস)। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এ কাঠামোর ত্রুটি তুলে ধরেছে ফাইন্যান্স ওয়াচ।
ব্যাসেল থ্রির প্রবিধান ‘আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয়’ ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলা হলেও এর সংজ্ঞা অস্পষ্ট। সুনির্দিষ্টতার অভাবে কোন ব্যাংক এ নিয়মের অধীন তা নিয়ে বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে। ফলে কিছু ব্যাংক নিয়ন্ত্রকদের বাইরে চলে যেতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাসেল থ্রির লক্ষ্য অর্জন খুব জটিল কিনা। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রবিধান খুব জটিল হলে কার্যকর নাও হতে পারে।
ফাইন্যান্স ওয়াচ বলছে, তারল্য সংকট মোকাবেলায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যাসেল থ্রি প্রস্তাবিত কম্বাইন্ড বাফার রিকোয়ারমেন্ট (সিবিআর) পদ্ধতির উপযোগিতা সম্পর্কে অনিশ্চিত। এ সিবিআর সেফটি নেট হিসেবে কাজ করে, যাতে ব্যাংক ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কভিড-১৯ মহামারীর সময় বাফার ব্যবহারের জন্য উৎসাহিত করা হলে বিতর্ক শুরু হয়েছিল। তখন ব্যাসেল থ্রি প্রস্তাবিত বাফারের উপযোগিতা সম্পর্কে অনেক অনিশ্চয়তা ধরা পড়ে।
ফাইন্যান্স ওয়াচের মতে, ব্যাসেল থ্রিতে বাফারগুলোর প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। এর কাঠামোগত ও চক্রীয় উপাদানের পার্থক্যও সুস্পষ্ট নয়, যা এর ব্যবহার সম্পর্কে অবাস্তব প্রত্যাশা উত্থাপন করতে পারে। এছাড়া আরেকটি উদ্বেগ হলো, ঝুঁকি সংজ্ঞায়নে ব্যাংকগুলো নিজস্ব মডেল ব্যবহার করে। এভাবে আলাদা আলাদা মূল্যায়ন পদ্ধতি ও এর নমনীয়তা ব্যাসেলের যৌথ লক্ষ্যকে দূরে সরিয়ে দেয়।
এ দ্বিধাবিভক্ত পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতি ফাইন্যান্স ওয়াচের আহ্বান, ইইউ ও সদস্য রাষ্ট্র পর্যায়ে ব্যাসেলের প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি জোরদার এবং বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মতো অংশীদারদের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণের শিথিলতা দূর করা যাবে। সরল ও সমন্বিত নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় ব্যাংকগুলোর জন্য একই ধরনের ব্যবসায়িক ক্ষেত্র নিশ্চিত করে।
এ মাসের শুরুতে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করে ১৯ শতাংশ মূলধন জমা রাখার সুপারিশ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ। কিন্তু খাতসংশ্লিষ্টদের চাপের মুখে তা ৯ শতাংশে নেমে আসে।
সম্প্রতি ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মারিও দ্রাঘি দাবি করেছেন, ব্যাসেল বাস্তবায়নে ইইউ অত্যন্ত কঠোর। এখানে ব্যাসেলের ওপর ভিত্তি করে অনেক প্রবিধান রয়েছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তার চেয়ে কঠোর। একইভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যাসেল কাঠামোর পরিকল্পনা শিথিল করেছে যুক্তরাজ্য। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ঘোষণা অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের ব্যাংকে মূলধন ২০৩০ সালের জানুয়ারিতে বাড়বে ১ শতাংশের কম। অথচ এর আগে ৩ শতাংশের প্রস্তাব করা হয়েছিল।










