উন্নত বিশ্বে আরো অনেক আগে থেকেই এ বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হলেও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। তবে এ চিত্র বদলাতে বছর দুয়েক আগে করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির আওতায় সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্লাস্টিক বর্জ্যকে বিকল্প জ্বালানি এবং শিল্পের কাঁচামালে রূপান্তরের এক অভিনব ও টেকসই উদ্যোগ নিয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি।

সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৭৫ টন বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য তৈরি হয়, যার একমাত্র ঠিকানা আট একর আয়তনের লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ড। এখানে বর্তমানে আনুমানিক আট লাখ টন বর্জ্য ডাম্প করা রয়েছে। বাসা-বাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এ বর্জ্যগুলো সংগ্রহের পর কিছু পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য আলাদা করে বিক্রি করেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। বাকি সব অপচনশীল বর্জ্য নিয়ে আসা হয় এ ডাম্পিং গ্রাউন্ডে। এ বর্জ‍্যের টেকসই সমাধানে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা, যদিও কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি।

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সিলেট সিটি করপোরেশনের সঙ্গে টেকসই উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ। এরপর শুরু হয় সিলেটের লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি (এমআরএফ) বসানোর কাজ। ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা এ এমআরএফ উদ্বোধন করা হয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং এখান থেকে বর্জ্য নেয়া শুরু হয় একই বছরের ১৪ মে।

সম্প্রতি সিলেটের লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ড পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় এখান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ টন বর্জ্য ছাতকে অবস্থিত লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিমেন্ট কারখানায় নিয়ে গিয়ে টেকসই উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। এ ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে প্রথমে এমআরএফের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের অপচনশীল দ্রব্য বিশেষ করে প্লাস্টিক ও পলিথিন পৃথক করা হয়। তারপর কোম্পানির নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তা নিয়ে যাওয়া হয় সিমেন্ট কারখানায়।

বাংলাদেশে একমাত্র লাফার্জহোলসিমের ছাতক প্লান্টে আমদানি বিকল্প পণ্য ক্লিংকার উৎপাদন হয়। ক্লিংকার তৈরির সুবিধা থাকায় এ প্লান্টে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ রয়েছে। এ সুবিধার নাম জিওসাইকেল। সিমেন্ট প্লান্টে এ বর্জ্যগুলো নিয়ে তা সিমেন্ট কিলনে পাঠানোর উপযোগী করে তোলা হয়। এরপর তা বিশেষ একটি ফিডারের মাধ্যমে সিমেন্ট কিলনে পাঠানো হয়। এ কিলনে ক্লিংকার তৈরির জন্য প্রয়োজন ১ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা। এ তাপমাত্রায় সব বর্জ্য কো-প্রসেস হয়ে যায়, যার কোনো অবশিষ্ট পরিবেশে ফেরত আসে না। বর্তমানে জিওসাইকেল প্রযুক্তির মাধ্যমে বছরে প্রায় এক লাখ টন বর্জ্য টেকসই উপায়ে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বর্জ্য পুরো জাতির জন্য, পৃথিবীর জন্য একটি বোঝা। বিশ্বের সব দেশ বর্জ্য নিয়ে কাজ করছে। আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর কোর্স চালু করা উচিত। ভবিষ্যতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চাকরির একটি বড় ক্ষেত্র হবে। সিলেট সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ বলা যায়। এখানকার জনসংখ্যা ও বর্জ্যের পরিমাণ সহায়ক হওয়ার কারণে পাইলট ভিত্তিতে প্রকল্পটি করা সম্ভব হয়েছে। যশোর ও কুষ্টিয়ায়ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু কাজ হচ্ছে এবং সেটি সেখানকার জন্য কার্যকর।’

সিমেন্ট তৈরির মূল কাঁচামাল হচ্ছে ক্লিংকার। চুনাপাথর ও কাদামাটির মিশ্রণকে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ক্লিংকার তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে জিপসাম, স্ল্যাগ ও ফ্লাই অ্যাশ মিশিয়ে সিমেন্ট তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের অন্যান্য কোম্পানি সিমেন্ট উৎপাদনে ক্লিংকার আমদানি করলেও লাফার্জহোলসিম নিজেদের কারখানায় তা উৎপাদন করছে। মূলত ভারতের মেঘালয়ে থাকা লাফার্জহোলসিমের মালিকানাধীন খনি থেকে চুনাপাথর বিশেষ কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে ছাতকের কারখানায় নিয়ে এসে এ থেকে ক্লিংকার ও অ্যাগ্রিগেটস তৈরি করা হয়।

ক্লিংকার তৈরিতে অতি উচ্চ তাপের প্রয়োজন হওয়ায় এ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করছে লাফার্জহোলসিম। ক্লিংকার উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্রায় দেড় হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় প্লাস্টিক বর্জ্য পুড়ে নিঃশেষ হয়ে ছাইয়ে পরিণত হয়। এ ছাই সিমেন্ট উৎপাদনেও কাজে লাগে। তাছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য পোড়ানোর মাধ্যমে ডিকার্বোনাইজেশন বা কার্বন নিঃসরণ কমানোও সম্ভব হয়েছে। বর্জ্য থেকে বিকল্প জ্বালানির মাধ্যমে ২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণ ১০ দশমিক ৭ শতাংশ তাপ প্রতিস্থাপন হার (টিএসআর) অর্জন করেছে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ। এর ২১ শতাংশই ছিল পৌর বর্জ্য।

লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের হেড অব জিওসাইকেল মো. লতিফুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে আমাদের কার্যক্রম চালু আছে। বাংলাদেশে জিওসাইকেলের যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা খরচ করে ২০২২ সালে আমরা গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। বাংলাদেশে আমরা প্রতি বছর ৫০ হাজার টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করি। পৌর ও বিভিন্ন শিল্প-কারখানা থেকে আমাদের কাছে বর্জ্য আসে। ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়িয়ে বার্ষিক চার লাখ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লাফার্জহোলসিমের সুরমা প্লান্টে ১৩ লাখ টন সক্ষমতার বিপরীতে ১৩ লাখ ৫০ হাজার টন ক্লিংকার উৎপাদন হয়েছে। একই সময়ে কোম্পানিটির সিমেন্ট উৎপাদন আগের বছরের ১১ লাখ ১০ হাজার টন থেকে বেড়ে ১১ লাখ ৪০ হাজার টনে উন্নীত হয়েছে, যা বাজারে কোম্পানিটির অংশীদারত্ব বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ টেকসই পদ্ধতির প্রতি অন্যান্য সিটি করপোরেশনগুলোও আগ্রহ হয়ে উঠছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের একটি প্রতিনিধি দল সিলেট সিটি করপোরেশনের এমআরএফ ও ছাতকে লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিমেন্ট প্লান্টে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি ঘুরে দেখে সন্তুষ্টি প্রকাশ করার পাশাপাশি একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছে।

এশিয়া ইউরোপ ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি ১৫ বছরে এর শহুরে বর্জ‍্যের পরিমাণ দ্বিগুণ হচ্ছে। বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকে প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৫০০ টন মিউনিসিপ্যাল সলিড ওয়েস্ট তৈরি হতো, যা ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুসারে ২৫ হাজার টন ছাড়িয়ে গেছে। দেশে যে পরিমাণ বর্জ্য প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে, তার শতকরা ৫৫ ভাগ যেখানে সেখানে ফেলা হয়। যতটুকু সংগ্রহ করা হয় তার বড় একটা অংশ মাটিতে স্তূপ করে রাখা হয় কিংবা পুড়িয়ে ফেলা হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এ পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায় হলো সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই উপায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।