চলতি বছর আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল থেকে শুরু করে আকরিক লোহা, সব ধরনের পণ্যের দামেই নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে শ্লথগতি ও সম্ভাব্য মন্দার ইঙ্গিত দিচ্ছে এ প্রবণতা। খবর সিএনবিসি। 

বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া পণ্যগুলো নিয়ে একটি মূল্যসূচক তৈরি করে বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল। এটি এসঅ্যান্ডপি জিএসসিআই কমোডিটি ইনডেক্স নামে পরিচিত। মূল্যসূচক অনুযায়ী, গত ১২ মাসে সব ধরনের পণ্যের দাম গড়ে ২৫ শতাংশ কমেছে। 

বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে শিল্প ধাতুর দাম ৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মতো পণ্যের দাম ২৩ এবং খাদ্যশস্য, গম, চিনিসহ কৃষি পণ্যের দাম প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। বিশ্লেষকরা জানান, কভিড-১৯ সংক্রান্ত সব ধরনের বিধিনিষেধ উঠিয়ে নিলেও পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি চীনের অর্থনীতি। এছাড়া অন্যান্য শীর্ষ অর্থনীতিগুলোও নানা প্রতিবন্ধকতায় কঠিন সময় পার করছে। এমন পরিস্থিতি পণ্যবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতা বিশ্ব অর্থনীতিতে শ্লথগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। 

বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের পণ্যবাজার বিশ্লেষক রেইড-ই অ্যানসন বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতিতে উত্থান-পতনের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে তামা ও আকরিক লোহার বাজার। কারণ অবকাঠামো নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে এসব ধাতু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অনেক দেশেই এসব খাত মন্দার মধ্যে পড়েছে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপুল পরিসরে কমে যেতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিমের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে।’

তিনি আরো জানান, চলতি বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে অথবা আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে জিডিপির হার কমে যেতে পারে। তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যেই এ পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে পারে ইউরোপের দেশগুলো। 

পণ্যবাজারে নিম্নমুখী প্রবণতার ক্ষেত্রে মোটা দাগে চীনের অর্থনীতিকে দায়ী করছেন এ বিশ্লেষক। তিনি বলেন, চীনের অর্থনীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় গতিশীল হতে না পারায় আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারও গতি ফিরে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। 

এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে কৃষিপণ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু বৃদ্ধির গতি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য সুখকর নয়। অন্যদিকে শিল্প ধাতু ও জ্বালানি পণ্যের দাম অব্যাহত কমছে। 

চলতি বছরের এখন পর্যন্ত অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম লক্ষণীয় মাত্রায় কমেছে। পণ্যটির আন্তর্জাতিক বাজার আদর্শ ব্রেন্টের দাম এক বছরের ব্যবধানে কমেছে ৩৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রফতানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক উত্তোলন কমানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পর বাজার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় ফিরছে না। 

ইউরোপের দেশগুলোয় শীতের প্রবণতা কম থাকায় জ্বালানির ব্যবহার কম হয়েছে। ফলে দেশটিতে গ্যাসের মজুদ বেড়ে পাঁচ বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। এ কারণে গ্যাসের দাম লক্ষণীয় মাত্রায় কমেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকট এড়াতে ব্যাপক হারে কয়লা উত্তোলন বাড়াচ্ছে চীন। এতে জ্বালানির বাজারও নিম্নমুখী। অনেক বিশ্লেষক বলছেন, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষকই এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে এখনো কিছু জানাতে পারেননি। 

বাজার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, গত কয়েক মাসে প্রধান প্রধান পণ্যের দাম কমেছে। কারণ কোম্পানি ও ভোক্তারা অর্থনীতি সম্ভাব্য নিম্নমুখী চাপের আশঙ্কায় তাদের চাহিদার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন। উন্নত দেশগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অব্যাহত সুদহার বাড়াচ্ছে। এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে পণ্যের দাম আরো কমতে পারে, যা অর্থনীতিকে আরো বেশি চাপের মুখে ঠেলে দেবে।