বিশ্বের সম্পদ বাজারের তালিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) অবস্থান ১৪তম। এর মধ্যে বৈশ্বিক ধনীদের বিনিয়োগ ও অভিবাসনে এগিয়ে রয়েছে দুবাইয়ের মতো ইউএইর প্রধান শহরগুলো। দুবাইভিত্তিক রিয়েল এস্টেট কোম্পানি বেটার হোমসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, দেশটির প্রতি ধনীদের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণের মধ্য দিয়ে বৈশ্বিক সম্পদ বিন্যাসে কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যা চলতি বছর আরো দৃঢ় হবে। ডলারে সম্পদের মূল্য বিবেচনায় আরব আমিরাতে বর্তমানে ১ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ মিলিয়নেয়ার বাস করছেন, যা গত এক দশকে বেড়েছে ৯৮ শতাংশ। খবর অ্যারাবিয়ান বিজনেস।
বিদেশী বিনিয়োগ ও সম্পদ স্থানান্তরে উৎসাহ দিতে গত কয়েক দশক বিভিন্ন ধরনের নীতি সুবিধা দিয়ে আসছে ইউএই কর্তৃপক্ষ। এর সুযোগ নিয়ে দেশটির বাণিজ্য কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক অবৈধ অর্থের গন্তব্য। অবশ্য বেটার হোমস বলছে, অতিধনীদের দেশটির বেছে নেয়ার পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক নীতিমালা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে আস্থা ও ভোগৌলিকভবে ইউএইর কৌশলগত অবস্থান।
বেটার হোমসের সিইও লুইস হার্ডিংয়ের মতে, যেখানে সম্পদ ভালোভাবে কাজে লাগানো যায়, সেখানেই পুঞ্জীভূত হয়। এ কারণে উচ্চ নিট মূল্যের সম্পদধারী ব্যক্তিদের (এইচএনডব্লিউআই) কাছে দুবাইয়ের মতো শহর আকর্ষণীয়। এখানে আয়কর নেই। পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিশ্বমানের অবকাঠামো ও অঞ্চলটি বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যার কাছে ৮ ঘণ্টার ফ্লাইট দূরত্বে অবস্থিত। এখন এ শহরের রয়েছে মূলধন সংরক্ষণ, নীতিগত স্পষ্টতাসহ এমন কিছু সুবিধা, যা অন্যরা দিতে পারে না।
চলতি বছরে ইউএইতে মিলিয়নেয়ার বাসিন্দার সংখ্যা ১ লাখ ৪২ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে দুবাইকে নতুন গন্তব্য হিসেবে বেছে নেবেন ৭ হাজার ১০০ মিলিয়নেয়ার, তারা আনুমানিক ৭১০ কোটি ডলার মূলধন নিয়ে আসবেন—যা ২০২৪ সালের দুবাইয়ের মোট প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রায় অর্ধেক।
লুইস হার্ডিংয়ের মতে, ধনীদের ইউএইর শহরগুলোয় স্থানান্তরের এ প্রবণতা সাময়িক নয়। বরং একটি স্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন। তিনি বলেন, ‘এ পরিবর্তন চক্রাকার নয়, কাঠামোগত। গত এক দশকে ইউএইতে মিলিয়নেয়ারের সংখ্যা ৯৮ শতাংশ বেড়ে গত বছরের শেষ নাগাদ ১ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ জনে পৌঁছে। দুবাই এখন বিশ্বের দ্রুততম সেন্টি-মিলিয়নেয়ার অঞ্চল। এটি মিয়ামি, মিলান এমনকি শেনঝেনকেও ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে লন্ডন ও প্যারিসের মতো পুরনো কেন্দ্রগুলো করের চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ধন-সম্পদ হারাচ্ছে।’
বিশেষ করে, ব্রিটিশ ধনীদের উল্লেখযোগ্য হারে দুবাইয়ে স্থানান্তরে শহরটির নীতিগত সুবিধা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি লন্ডনে নন-ডম কর সংস্কারে কিছু শিথিলতা এলেও যুক্তরাজ্য বিদেশী ধনীদের উদ্বেগ দূর করতে পারেনি। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি বছর যুক্তরাজ্য থেকে ৯ হাজার ৫০০ ধনী বিদেশী গন্তব্যে স্থানান্তর হবেন। যা চীনের পরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং ২০২৪ সালের ৪ হাজার ২০০-এর তুলনায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ব্রিটিশ ধনী দুবাইয়ে বসবাস শুরু করবেন। এ স্থানান্তর ব্রিটিশ কর ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রতি অনাস্থার প্রতিফলন।
অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু কর নয় আবহাওয়া, জীবনধারা ও উদীয়মান বাজারে ব্যবসার সুযোগও দুবাইকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
এদিকে দুবাইকে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখেছে ভারতীয় ধনীরাও। ড্রাইভেন প্রপার্টিজের ‘গ্লোবাল মিলিয়নেয়ার মাইগ্রেশন টু দ্য ইউএই ২০২৫’ প্রতিবেদন অনুসারে, চীন, যুক্তরাজ্য ও ভারতের ধনীরা সবচেয়ে বেশি দেশত্যাগ করছেন। এর মধ্যে চলতি বছর ৪ হাজার ৩০০-এর বেশি ভারতীয় মিলিয়নেয়ার সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বাসস্থান হিসেবে বেছে নেবেন।
দুবাইয়ের প্রতি ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হলো আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের সুবিধা ও উন্নত আর্থিক পরিষেবা।
গোল্ডেন ভিসা প্রোগ্রাম ইউএইতে অভিবাসনের ধারা বদলে দিয়েছে, যা বিদেশীদের দীর্ঘমেয়াদে দেশটিতে বসবাস, কাজ ও শিক্ষা নিশ্চিত করে এবং অনেক বিশেষায়িত সুবিধা দেয়।
লুইস হার্ডিং বলেন, ‘কর সুবিধা তো শুধু সূচনা। দুবাইয়ে যা ধরে রাখে তা হলো নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক জীবনধারা। এখানে মিলছে সম্পদ সুরক্ষা ও জীবনমান—যা একসঙ্গে পাওয়া কঠিন।’










