শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন মানুষ প্রকৃত আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। শিক্ষা মানুষের ভিতরে থাকা অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার, ধর্মের অপব্যাখ্যা দূর করে মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করে। মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত হওয়ার মাধ্যমে এক জন মানুষ দেশ ও সমাজের উন্নয়নের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। ফলে যে দেশের শিক্ষার হার যত বেশি সেই দেশ তত উন্নত হয়। দেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধি তথা পাঠদানে শিক্ষকদের অবদান সবথেকে বেশি। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠদানের মাধ্যমে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, মানবিকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষকরা হচ্ছে বাতিঘর যারা আলোকিত করে দেশ ও সমাজকে তাদের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে। নিরক্ষরতা একটি দেশের জন্য বোঝা স্বরূপ, এই গুরুত্ব অনুধাবন করেই স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিটি সরকার শিক্ষার উন্নয়নে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বেশ গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারি করণ করা হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে, প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি কলেজ স্থাপন ও নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে সরকার। যার ফলে কয়েক কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু মহামারী করোনা শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইউনেস্কোর মতে, এই ভয়াবহ মহামারীর প্রাদুর্ভাবে পৃথিবীব্যাপী ১ দশমিক ৩২ বিলিয়ন শিক্ষার্থী এখন গৃহবন্দী।
একইভাবে বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্তের কিছু দিন পর থেকে সরকার সারা দেশে লকডাউন জারি করে। ১৮ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। শিল্প কারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাজার ঘাট, অফিস আদালত সিমিত পরিসরে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চালু করলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো খুলে দেওয়া সম্ভব হয়নি। কবে নাগাদ খুলবে এটাও অনিশ্চিত। তবে সরকার সংসদ টিভির মাধ্যমে দূরশিক্ষণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এখন অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করা সময়ের দাবি। কেননা কবে স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে আমরা কেউই জানিনা। কিন্তু ছাত্রছত্রীরা কি এতদিন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে?
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অনলাইন শিক্ষা নিয়ে একটা বিরূপ ধারণা হয়তো আছে। অনলাইনে অর্জন করা ডিগ্রিকে অনেকে তেমন গুরুত্ব সহকারে দেখে না অন্যথায় এই অনলাইন ডিগ্রি অর্জনে ও কিন্তু একই সময় এবং পরিশ্রম একজন ছাত্রকে বা শিক্ষককে দিতে হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন শিক্ষা আমাদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের একটি জরিপে দেখা গেছে পুরো পৃথিবীতে এখন প্রায় ৩০০ মিলিয়ন শিক্ষার্থী অনলাইনে শিক্ষাগ্রহণ করছে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হল বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে এই অনলাইনে শিক্ষাদান পদ্ধতি একেবারেই নতুন। পূর্বে এ বিষয়ে অভিজ্ঞার অভাব রয়েছে ফলে যে শিক্ষক ক্লাশে পাঠদানে দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি ও হয়তো অনলাইনে ভালোভাবে ক্লাশ নিতে পারছেন না। আবার অনলাইন ক্লাসের কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, মোবাইল ডাটার চড়া দাম, শিক্ষার্থীদের মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের অভাব। এতসব বাঁধা থাকার পরও অনেক শিক্ষক প্রাণপনে চাইছেন তাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে। এরকম অনেক শিক্ষকের পাশে দাঁড়াতে ‘গ্রো ইউর রিডার’ নামে একটি অর্গানাইজেশন কাজ করা শুরু করেছে। তারা বিনামূল্যে শিক্ষকদের দিচ্ছে অনলাইনে শিক্ষাদানের প্রশিক্ষণ। তাদের অনলাইন প্রশিক্ষনে শিক্ষকদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে বিভিন্ন ধরনের টেকনলজির সহায়তায় সহজে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেয়া যায়, অনলাইনে পড়ানোর জন্য কীভাবে পাঠ পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়, বিভিন্ন এডুকেশনাল সাইট ব্যবহার করে কীভাবে অনলাইনে গুণগত শিক্ষা দেয়া যায়।
এ বিষয়ে গ্রো ইউর রিডারের সহ প্রতিষ্ঠাতা সাদিয়া জাফরিনকে প্রশ্ন করা হয়, ‘অনেক এলাকায় ইন্টারনেট নেই, শিক্ষার্থীদের কাছে স্মার্টফোন নেই, রয়েছে আরো অনেক সীমাবদ্ধতা। আপনাদের প্রশিক্ষণটি আসলে কতটা সহায়ক হবে বলে আশা করেন?’ এর জবাবে সাদিয়া জাফরিন দিয়েছেন খুবই সময়োপযোগী একটি উত্তর। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে আমাদের কোনটা ভালো কোনটা খারাপ বিচার করার আবকাশ থাকে না বরং আমাদের ভাবতে হয় কোনটি অপেক্ষাকৃত কম খারাপ আর কোনটি বেশি। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ১০০ জন শিক্ষক ও যদি ক্লাশ শুরু করতে পারে তাহলে তার শিক্ষার্থীরা ক্লাশে ফিরতে পারবে। এটাই বা কম কি বলুন! এই ১০০টি ক্লাশে যদি ৩০ জন করেও শিক্ষার্থী থাকে সেই সংখ্যাটা হয় ৩০০০। আমাদের লক্ষ্য ১০০০ শিক্ষককে এই প্রশিক্ষণের আওতায় আনা। অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতির সাথে আমাদের গতানুগতিক শিক্ষাদান পদ্ধতির খুব একটা তফাৎ কিন্তু নেই। শিক্ষক কিন্তু চক আর বোর্ড ব্যবহার করেও অনলাইনে পড়াতে পারেন। কিন্তু এই পড়ানোটাই পৌঁছাতে হবে শিক্ষার্থীর কাছে। আর এটাই আমাদের চ্যালেঞ্জ। কিন্তু এর জন্য দরকার একটুখানি প্রযুক্তিগত দক্ষতা। যা আমরা এখন শিক্ষকদের দেয়ার চেষ্টা করছি।’
গ্রো ইউর রিডার ২০১৬ সাল থেকে শিশুদের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরনে কাজ শুরু করেছে। সারাদেশে তাদের ২০টি লাইব্রেরি এবং ৫০০০ বই আছে। ৬০০০ শিশু পাঠক আছে তাদের। ক্রিয়েটিভ এডুকেশন লার্নিং এ অবদানের জন্য সিটিজেন ওপেন ফোরাম থেকে ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি পায় ইন্সপিরেশনাল অ্যাওয়ার্ড। এছাড়া সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করার অবদান স্বরূপ নিউইয়র্কের নিনা ফাইন্ডেশন থেকে ও তারা পেয়েছে গ্রান্ট। তারা বর্তমানে শিশুদের ইংরেজি রিডিং শেখানোর জন্য কারিকুলাম এবং শিশুদের মনন ও সৃজনের উন্নয়নের জন্য ও বিভিন্ন কারিকুলাম তৈরি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে। এছাড়া তারা করোনাকালীন সময়ে অনলাইনে লাইভ ক্লাশ নিয়ে শিশুদের মানসিক সাপোর্ট দেয়ার ও চেষ্টা করে যাচ্ছে।
লেখক: শিক্ষক










