রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণ এখন আর কেবল শীতকালীন বা নির্দিষ্ট কিছু এলাকার সমস্যা নয়। নির্মাণকাজের ধুলাবালি, যানবাহনের নির্গমন, বর্জ্য পোড়ানো, ইটভাটা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ নানা উৎসের দূষণে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দূষণের মাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোও এর বাইরে থাকতে পারছে না। সম্প্রতি আগারগাঁও, গুলশান, বনানী, বারিধারা ও ধানমন্ডির বিভিন্ন পর্যবেক্ষণস্থল ঢাকার দূষিত এলাকার তালিকায় উঠে এসেছে। বণিক বার্তার একটি প্রতিবেদনে এমনটাই দেখা যাচ্ছে।
আইকিউএয়ারের সূচকে ৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর মধ্যে ঢাকার অবস্থান ছিল তৃতীয়। এ সময় ঢাকার বায়ুমান সূচক ছিল ১৬৪, যা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত। পর্যবেক্ষণস্থলগুলোর মধ্যে আগারগাঁওয়ের বিআইডিএস-সংলগ্ন এলাকায় সূচক ছিল সর্বোচ্চ ১৮৬। বারিধারা পার্ক রোডে ১৬৮, প্রগতি সরণি ও বেচারাম দেউড়িতে ১৬৭, বারিধারা লেকসাইড ও ধানমন্ডিতে ১৬১, গুলশান লেক পার্কে ১৬০ এবং বনানীর ইস্টার্ন হাউজিং এলাকায় ১৫৬ রেকর্ড করা হয়। অর্থাৎ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার বাতাসও অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে। এটি শুধু পরিবেশগত বিপর্যয়ের চিত্র নয়, বরং দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
বায়ুদূষণের স্বাস্থ্যগত প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশের গড় বার্ষিক বায়ুমণ্ডলীয় পিএম ২ দশমিক ৫-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৬৪ মাইক্রোগ্রাম। ঢাকায় এ মাত্রা ছিল ৯০ থেকে ১০০ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশক মাত্রার প্রায় ২০ গুণ। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণের কারণে ১ লাখ ৫৯ হাজার অকালমৃত্যু এবং ২৫০ কোটি অসুস্থতাজনিত কর্মদিবসের ক্ষতি হয়েছে। এ পরিসংখ্যান পরিবেশগত ও গৃহস্থালি বায়ুদূষণের সম্মিলিত প্রভাব নির্দেশ করে। ফলে বায়ুদূষণকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করলে এর প্রকৃত জনস্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আড়ালে থেকে যায়।
দূষণের উৎস সম্পর্কে জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার তথ্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বৃহত্তর ঢাকা এলাকার ২০২০ সালের পিএম ২ দশমিক ৫-এর উৎসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্থানীয় উৎস থেকে আসা দূষণের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান গৃহস্থালি কার্যক্রমের, বিশেষত বায়োমাস জ্বালানিতে রান্নার; এর পরিমাণ ২৮ শতাংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের অবদান ২৪ শতাংশ, ইটভাটার ১৩ শতাংশ এবং পৌর বর্জ্য খোলা জায়গায় পোড়ানোর ১১ শতাংশ। সড়কের ধুলার অবদান ৮ শতাংশ এবং যানবাহনের নির্গমনের ৪ শতাংশ। উল্লেখ্য, এসব বৃহত্তর ঢাকা এলাকার স্থানীয় উৎস থেকে সৃষ্ট দূষণের অনুপাত; পুরো দূষণের উৎসের হিসাব নয়। এ তথ্য স্পষ্ট করে যে যানবাহন ও নির্মাণকাজের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন, ইটভাটা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রান্নায় ব্যবহৃত জ্বালানির দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সমস্যার অন্যতম কারণ বিদ্যমান বিধিবিধানের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া। জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণসামগ্রী ঢেকে রাখা, সুরক্ষাবেষ্টনী স্থাপন, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং খননকাজ শেষে রাস্তা যথাযথভাবে পুনরুদ্ধারের মতো ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক নির্মাণ প্রকল্পেই এসব ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। ফিটনেসবিহীন ও অতিরিক্ত ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধেও কার্যকর তদারকির ঘাটতি রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, রাজউক ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ও কার্যক্রমের সমন্বয় নিশ্চিত না হলে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন।
এ অবস্থায় ২০২৪-৩০ সালের জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। পরিকল্পনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় জনসংখ্যাভিত্তিক বার্ষিক গড় পিএম ২ দশমিক ৫-এর মাত্রা ৩০ মাইক্রোগ্রাম কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু যানবাহন বা নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ করলেই চলবে না; বিদ্যুৎ উৎপাদন, ইটভাটা, গৃহস্থালি জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও দূষণ কমাতে হবে। নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, নির্গমন পরীক্ষা এবং সনদ প্রদানের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
পাশাপাশি উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে সিটি করপোরেশনগুলোর বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথক্করণ ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। গৃহস্থালি পর্যায়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং ইটভাটা ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নির্গমন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে হবে, যাতে দূষণের উৎস শনাক্ত এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সিটি করপোরেশন, বিআরটিএ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা দরকার।










