ইউরোপের বাজারে এতদিন বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম বড় শক্তি ছিল শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মাঠে এবার শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আসছে ভারত। ভারতে–ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট এফটিএ) কার্যকর হলে ইউরোপের বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার আরো সহজ হবে। ফলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সুবিধা আর একক থাকবে না।

এটি কেবল একটি বাণিজ্য চুক্তির গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রফতানি, শিল্পায়ন ও লাখো শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রশ্ন। ভারত যখন ইউরোপের বাজারে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলছে, তখন বাংলাদেশ কি নিজের অবস্থান ধরে রাখতে প্রস্তুত? নাকি বৈশ্বিক বাণিজ্যের নতুন সমীকরণে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে?

ভারত ও ইইউর এ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আলোচনা, কূটনৈতিক যোগাযোগ, রাজনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দরকষাকষি। ধারাবাহিক আলোচনার পর অবশেষে চুক্তির কাঠামো চূড়ান্ত হয়। এ বছর ২৭ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৬তম ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে দুই পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির আলোচনা সম্পন্ন করে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, দীর্ঘ আলোচনা ও দরকষাকষির পর চুক্তিটি স্বাক্ষরের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬ নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই পক্ষের লক্ষ্য, প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২০২৭ সালের প্রথমার্ধে চুক্তিটি কার্যকর করা।

চুক্তিটিকে ভারতের পক্ষ থেকে ‘মাদার অব অল ডিলস’ বা ‘সব চুক্তির সেরা চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এর কারণও রয়েছে। চুক্তির আওতায় ভারতের ৯৯ শতাংশের বেশি রফতানি ইইউর বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে ভারত ইইউর ৯২ দশমিক ১ শতাংশ পণ্যের ওপর শুল্ক কমাবে বা প্রত্যাহার করবে। ফলে এ চুক্তি শুধু দুই পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ নয়, বরং বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ ব্যবস্থায় সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করবে।

এ চুক্তি কি বাংলাদেশের জন্য চিন্তার কারণ? অবশ্যই, কারণ ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। এতদিন এ ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ছিল শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার। ভারত এতদিন এ সুবিধা পায়নি। কিন্তু নতুন চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় রফতানিকারকরাও একই ধরনের শুল্ক সুবিধা পাবেন। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতার ধরন অনেকটাই বদলে যাবে। এখন প্রশ্ন হলো, ভারতের শিল্প সক্ষমতা, উন্নত অবকাঠামো, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং বৃহৎ উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

নতুন চুক্তি: প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় বাজারে একটি বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ করে আসছে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইইউর এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) কর্মসূচির আওতায় শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা পেয়ে আসছে। এর অর্থ হলো, অস্ত্র ও গোলাবারুদ ছাড়া প্রায় সব বাংলাদেশী পণ্য ইউরোপের বাজারে কোনো আমদানি শুল্ক ছাড়াই এবং নির্দিষ্ট কোটা সীমাবদ্ধতা ছাড়া প্রবেশ করতে পারে। অন্যদিকে ভারত এলডিসিভুক্ত না হওয়ায় বাংলাদেশের মতো ইবিএ সুবিধা পায় না। দেশটি আগে ইইউর সাধারণ জিএসপি কর্মসূচির আওতায় কিছু পণ্যে শুল্কছাড় পেলেও ২০২৩ সাল থেকে ভারতীয় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত সে সুবিধার বাইরে চলে যায়। ফলে ভারতীয় পোশাককে ইউরোপের বাজারে সাধারণত ৯-১২ শতাংশ পর্যন্ত এমএফএন শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।

ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে এ ব্যবধান কমে আসবে; ভারতীয় পোশাকও চুক্তির আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। নতুন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ও ভারতের পণ্য ইউরোপীয় বাজারে প্রায় একই ধরনের শুল্ক সুবিধা পাবে। ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশেষ বাণিজ্যিক অবস্থান আর আগের মতো অক্ষুণ্ন থাকবে না।

ভারতের এ সুবিধা শুধু শুল্ক কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা উৎপাদনকারী দেশ। দেশটির তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক উপকরণ, আনুষঙ্গিক পণ্য এবং তৈরি পোশাক উৎপাদনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী সংযোগ রয়েছে। ফলে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন পর্যন্ত একটি সমন্বিত ও কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থার সুবিধা কাজে লাগাতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প এখনো তুলা, সুতা, কাপড়, রাসায়নিক উপকরণ ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানিনির্ভর। ফলে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহের সময় এবং সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতার দিক থেকে ভারত তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

শুধু তাই নয়, তুলনামূলক স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত যোগাযোগ ও বন্দর অবকাঠামো, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিস্তৃত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির নেটওয়ার্ক ভারতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করবে। বিপরীতে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা, ডলার সংকট এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে একই ধরনের শুল্ক সুবিধা পেলেও ইউরোপের বাজারে দুই দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান সমান হবে না। বরং বিদ্যমান শিল্প সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত ব্যবধানের কারণে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় বাড়তি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি তাই শুধু শুল্ক সুবিধার ব্যবধান হারানো নয়, বরং সামগ্রিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি।

ভারত-ইইউ চুক্তিতে ভূরাজনীতি

এ চুক্তির পেছনে শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থ নয়, আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে চীননির্ভরতা কমানো এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বিকল্প অংশীদার তৈরি করা এখন পশ্চিমা দেশগুলোর অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার। রাশিয়ার জ্বালানি তেলের ওপর ইউরোপের অতীত নির্ভরতা ইউক্রেন যুদ্ধের পর তাদের সামনে সরবরাহ নিরাপত্তার ঝুঁকি স্পষ্ট করে তুলেছে। একই ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি চীনের ক্ষেত্রেও তৈরি হোক, তা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা চান না। তাই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিবর্তে তারা ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা কমানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এর অর্থ হলো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, কাঁচামাল ও শিল্প উপকরণের জন্য একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না থেকে বিকল্প উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস তৈরি করা।

এ প্রেক্ষাপটে ভারত পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে ভারতের ভূরাজনৈতিক ও সীমান্তগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল বাজার, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতি ভারতকে বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ইউরোপীয় কমিশনও ভারত-ইইউ চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে সরবরাহ ব্যবস্থার বৈচিত্র্য বৃদ্ধি এবং ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করার কথা উল্লেখ করেছে। দুই পক্ষের সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি এবং বিশ্ব জিডিপিতে তাদের অংশ প্রায় ২৫ শতাংশ। পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রেও চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রবণতার কিছু পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। অতএব ভারত-ইইউ চুক্তিকে শুধু বাণিজ্যিক সমঝোতা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এটি ইউরোপের বাজার সম্প্রসারণ, চীননির্ভরতা কমানো এবং এশিয়ায় বিকল্প অর্থনৈতিক অংশীদার তৈরির বৃহত্তর কৌশলেরও অংশ।

এখন কী করা প্রয়োজন?

ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি শুধু বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা নয়; এটি পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। চীননির্ভরতা কমানো এবং নতুন অর্থনৈতিক অংশীদার তৈরির কৌশলে ভারত বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশকেও পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন টেকসই গণতন্ত্র, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা, যাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

তৈরি পোশাক শিল্পকে তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। সামাজিকভাবে এ শিল্পে কাজ করার বিষয়ে যে নেতিবাচক ধারণা বা সংকোচ রয়েছে, তা দূর করা জরুরি। পোশাক শিল্পকে শুধু কম মজুরির শ্রমনির্ভর উৎপাদন খাত হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, ব্যবস্থাপনা ও উচ্চ দক্ষতানির্ভর শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশ দরিদ্র, তাই এখানে অনন্তকাল কম মজুরির শ্রমিক পাওয়া যাবে’—এমন ধারণা ও নীতিনির্ভরতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। বরং শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের জন্য এ শিল্পে নতুন কর্মক্ষেত্র ও নেতৃত্বের সুযোগ কীভাবে তৈরি করা যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

এজন্য প্রয়োজন গতানুগতিক শিল্পনীতি থেকে বেরিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর। অটোমেশন, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত মানের উৎপাদন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আইটি, চামড়া শিল্পসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় রফতানি খাতকে শক্তিশালী করতে হবে।

বিশ্ব বাণিজ্যে কোনো সুবিধাই স্থায়ী নয়। প্রতিবেশী দেশ যখন নতুন ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে কাজে লাগিয়ে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশেরও প্রস্তুতি নিতে হবে এখনই। কারণ ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় শুধু কম খরচে পণ্য উৎপাদন নয়, বরং প্রযুক্তি, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও উৎপাদনের উৎকর্ষই নির্ধারণ করবে কারা বাজারে টিকে থাকবে।

ড. মো. ফরিদ তালুকদার: সহকারী অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ম্যাকনিজ স্টেট ইউনিভার্সিটি, লুইজিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র