সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মাত্রা বেড়েছে বিপজ্জনক হারে। যানবাহনে সংযোজিত সিলিন্ডার ও বাসাবাড়িতে ব্যবহূত গ্যাস সিলিন্ডার উভয় ক্ষেত্রেই কথাটি প্রযোজ্য। সিএনজি স্টেশনের স্টোরেজ ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করে লাইসেন্স নবায়নের কথা থাকলেও অনেকে সেটি মানছে না। অবাক করা বিষয়, এদের যথাযথ তদারকিও নিশ্চিত হচ্ছে না। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার ব্যবহূত হয় এবং হচ্ছে সিএনজি স্টেশনগুলোয়। আমদানীকৃত সিলিন্ডারের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে প্রস্তুত সিলিন্ডারও রয়েছে। একেকটি স্টোরেজের নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে, আছে তার মান পরীক্ষার বিধান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হয় না। নিম্নমানের সিলিন্ডারের কথা বাদ দিলেও ভালো মানেরগুলোও নিয়মিত দেখভাল তথা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এর সঙ্গে রয়েছে কাগজপত্রের অসংগতি। আরপিজিসিএল সম্প্রতি কয়েকটি সিএনজি স্টেশন পরিদর্শন করে দেখেছে, অধিকাংশেরই কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ। প্রথম অবস্থায় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছ থেকে লাইসেন্স, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র ও আরপিজিসিএলের কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায় সিএনজি ফিলিং স্টেশন। লাইসেন্সের মেয়াদ হয় সর্বনিম্ন এক থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর। এরপর তা একই মেয়াদে নবায়ন করতে হয়। খবর মিলছে, দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এখনো অনেকে অনুমোদন নেয়নি। নেই বিইআরসির হালনাগাদ লাইসেন্স। পাশাপাশি নির্ধারিত মেয়াদ পেরিয়ে গেলেও রিজার্ভ সিলিন্ডার পরীক্ষা করানো হয়নি। বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরিদর্শনে কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের স্টোরেজ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবেও চিহ্নিত হয়েছে।

কাভার্ড ভ্যানের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বাহনের ভেতরে কয়েকটি সিলিন্ডার যুক্ত করে বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ বাহনে সিএনজি স্টেশনগুলোই গ্যাস সরবরাহ করছে। তাদের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও এ ধরনের কাজ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি এখনো। বাংলাদেশে সিএনজি স্টেশন নির্মাণ থেকে শুরু করে এর কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালু রাখতে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আইন অনুযায়ী। এমনকি এটি সচল এবং ঝুঁকিহীন রাখতে মানতে হয় বিভিন্ন বিধান। বিভিন্ন পর্যায়ে পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থা রয়েছে। তার পরও নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ হতাশাজনক। বলা হয়ে থাকে, জনবল সংকটের কারণে তদারকির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি স্টেশনগুলো। এটি খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনতে সারা বিশ্বেই গাড়িতে পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। নতুন নতুন প্রযুক্তিরও উদ্ভব হচ্ছে। জ্বালানি তেলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা হওয়ায় সিএনজি ব্যবহারে মানুষের আগ্রহও বাড়ছে। তাছাড়া সিএনজিচালিত স্কুটার, ব্যক্তিগত গাড়িও বাড়ছে। সে অনুপাতে সিএনজি স্টেশন গড়ে না ওঠা এবং অনেক জেলায় সিএনজি না পাওয়ায় অবৈধ প্রক্রিয়ায় গ্যাসের ব্যবহার বাড়ছে। প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সিএনজি স্টেশনগুলো লাইসেন্স নবায়ন থেকে শুরু করে স্টোরেজ ব্যবস্থা পরীক্ষা করার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিধান পরিপালনে গাফিলতি করছে। জরিমানা বা শাস্তির পরিমাণ কম হওয়ায়ও তারা নিয়ম পরিপালনে উৎসাহী হচ্ছে না। এক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ বাড়ানো, সিএনজি স্টেশন বন্ধ বা বায়েজাপ্ত করার মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। বছরে শুধু কয়েক দিন সিএনজি স্টেশন তদারকির মধ্যে সরকারি কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না রেখে বছরব্যাপী নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন। জননিরাপত্তার স্বার্থে দুর্ঘটনা রোধে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ও সরকার সক্রিয় হবে, এমনটিই প্রত্যাশা সবার। আশার কথা হলো, আরপিজিসিএল ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর এরই মধ্যে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ সিএনজি স্টেশন চিহ্নিত করেছে, কয়েকটির লাইসেন্সও নাকি নবায়ন করা হয়নি। এদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বিইআরসি তাদের লাইসেন্স বাতিল করবে বলে প্রত্যাশা। লাইসেন্স নবায়নবিহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্টোরেজ ব্যবস্থা নিয়ে যাতে কোনো সিএনজি ষ্টেশন পরিচালনা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের সক্রিয়তা কাম্য। একই সঙ্গে প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। এক্ষেত্রে আরপিজিসিএল ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরের সক্রিয়তা প্রয়োজন। গ্যাস সিলিন্ডারের গুণগত মান নিশ্চিত করা, সেগুলোর নিয়মিত পুনঃপরীক্ষার ওপর নিয়মিত নজরদারি করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া প্রয়োজন। স্টোরেজের আদর্শ মান ও নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরো বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। জরুরিভাবে সারা দেশে ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ সিএনজি স্টেশন চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া এখন সময়ের দাবি। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবার কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধনও দরকার।