বিশ্বের বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন, শীতকালে করোনা সংক্রমণ আরো বাড়বে। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ঢেউ প্রথম ঢেউয়ের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন তারা। কোনো কোনো শীতপ্রধান দেশে এরই মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে এবং সেসব দেশে করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুহারও বেড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশে আসন্ন শীত সামনে রেখে করোনা মোকাবেলায় জোরালো প্রস্তুতি নিতে হবে আমাদের। অক্টোবরের শেষ বা নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশে শীতের প্রকোপ বাড়তে পারে। এ সময়টিতেই দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সম্প্রতি করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণের হার বাড়তে পারে বলেও জনিয়েছেন। আসন্ন শীতে বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ আরো ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে যেতে পারে। শুষ্ক আবহাওয়ায় করোনাভাইরাস বাতাসে বেশিক্ষণ ভেসে থাকতে পারে, তাই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। তাপমাত্রার সঙ্গে সরাসরি করোনা সংক্রমণের হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি এখনো সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত না হলেও বিশ্বে শীতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রবণতা বেড়েছিল।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ রোধে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে আক্রান্ত দেশগুলো। স্পেনের মাদ্রিদে লকডাউন দেয়া হয়েছে। নেদারল্যান্ডসে অধিক আক্রান্ত তিন শহরের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ নিষেধ করা হয়েছে। কানাডায় প্রদেশভিত্তিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কুইবেক প্রদেশে ২৮ দিনের জন্য রেস্তোরাঁ, সিনেমা, থিয়েটার, জাদুঘর ও গ্রন্থাগার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। উত্তর-পূর্ব যুক্তরাজ্যসহ আরো কিছু এলাকায় স্থানীয়ভাবে লকডাউন কার্যকর করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউয়ের এ কঠিন সময়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের জন্য স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে সংক্রমণ স্থিতিশীল অবস্থায় চলে আসতে পারে। করোনাভাইরাসের ‘প্রথম ঢেউ’ নিয়ন্ত্রণে সফল দেশ অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় জুলাই-আগস্টে নতুন করে সংক্রমণ দেখা যায়। তবে দেশ দুটি আবার কিছু বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে ‘দ্বিতীয় ঢেউ’ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে।

বিগত সময়ে কভিড মোকাবেলা কার্যক্রমের একটি অনুপুঙ্খ পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন হওয়া জরুরি, যাতে অতীতের ভুল-ত্রুটি-সীমাবদ্ধতার আলোকে সামনের দিনগুলোর করণীয় নির্ধারণ সহজতর হয়। বিগত সময়ে কয়েকটি নেতিবাচক বিষয় দেখা গেছে। প্রথমত, কভিড-১৯ মোকাবেলা করতে গিয়ে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভঙ্গুর দশা দৃশ্যমান হয়েছে। কভিডে আক্রান্ত হয়নি, এমন সাধারণ রোগীদেরও হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা পাওয়া ব্যাহত হয়েছে। প্রথম দিকে অনেক সাধারণ রোগী হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরেও চিকিৎসা না পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দ্বিতীয়ত, কভিড-১৯ মোকাবেলা কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ব্যাপক অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি ঘাটতির চিত্র উন্মোচন হয়েছে। এন-৯৫ মাস্ক, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা ও বিতরণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কভিড-১৯ পরীক্ষায় প্রতারণা, ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার কেলেঙ্কারিতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। তৃতীয়ত, কভিড সংক্রমণের বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে প্রাথমিক করণীয় হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুনঃপুন তাগিদ সত্ত্বেও দ্রুত বিপুলসংখ্যক মানুষের কভিড পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়নি। প্রথম দিকে শুধু সরকারি সংস্থার হাতেই পরীক্ষার এখতিয়ার সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। বেসরকারি কোনো সংস্থাকে পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়নি দীর্ঘ সময় ধরে।

শুরু থেকেই ঢাকার বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোতে টেস্টিং ফ্যাসিলিটি নগণ্য। সঙ্গে রয়েছে টেস্টের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার লাইন। সেখানে সুস্থ মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা যেমন প্রবল, তার সঙ্গে রয়েছে টেস্টের ফলাফল দেয়ার ক্ষেত্রে অনাকাক্ষিত বিলম্ব। এটি জনগণকে টেস্টের প্রতি অনাগ্রহী করে তোলার জন্য যথেষ্ট। সংক্রমণের প্রাথমিক দিনগুলোর চেয়ে বর্তমানে আমাদের দেশে টেস্ট করার ক্ষেত্রে আরো অনেক অন্তরায় তৈরি হয়েছে। টেস্টের ক্ষেত্রে ফি নেয়া এর মধ্যে একটি বড় অন্তরায়। পাশাপাশি করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি ঋণাত্মক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অধিকাংশ নাগরিককে টেস্ট করার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছে। মহামারীর শুরুর দিনগুলো থেকেই আমাদের সমন্বয়ের অভাব ছিল, পরিকল্পনায় ঘাটতি ছিল। সবচেয়ে বড় কথা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শের সঙ্গে করোনা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় মিলের চেয়ে অমিলই বেশি দেখা গেছে। করোনা আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, কোথায় আমরা পিছিয়ে রয়েছি এবং সামনের দিনগুলোতে আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে। অতীতের ভুলগুলো সংশোধন করে আগামী দিনগুলোর জন্য বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।

অযথা কালক্ষেপণ না করে দ্রুত র্যাপিড অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি টেস্টিং শুরু করা এবং করোনা টেস্টের সব অন্তরায় দূর করা প্রয়োজন। অ্যান্টিজেন টেস্টিং যেমন টেস্টের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমাবে, পাশাপাশি অধিকসংখ্যক মানুষকে টেস্টিংয়ের আওতায় নিয়ে আসবে। ফলে সংক্রমিত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও পৃথকীকরণ সহজতর হবে। বিভিন্ন জেলায় করোনা সংক্রমণের মাত্রা ভিন্ন হওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন, স্থানীয় প্রশাসন ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। এক্ষেত্রে সিভিল সার্জনের নেতৃত্বে করোনা নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠানগুলোতে করোনা নিয়ন্ত্রণের জন্য গাইডলাইন তৈরি করেছে। কিন্তু বিভিন্ন অফিস-আদালত, গণপরিবহন ও তৃণমূল পর্যায়ে এ স্বাস্থ্যবিধি কতটুকু মানা হচ্ছে, তা নির্ধারণে কোনো দৃশ্যমান প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়নি। স্বাস্থ্যবিধি ও গাইডলাইনের যথার্থ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে নিয়ম ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

করোনার দ্বিতীয় ডেউয়ের সংক্রমণ প্রতিরোধের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পূর্ণ প্রস্তুতি রাখতে হবে। শীতকালে সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেলে তা মোকাবেলার জন্য হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও আইসিইউর ব্যবস্থা রাখতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে তারা কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই রোগীদের চাপ সামলাতে পারেন। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কমানোর জন্য জনগণকে টেলিহেলথ সেবার প্রতি উৎসাহিত করতে হবে। দেশে কভিড শনাক্তের সংখ্যা কমার কারণে অনেকের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানতে অনীহা দেখা দিয়েছে। আসন্ন শীত মৌসুমে সংক্রমণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। কাজেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই, বরং আশঙ্কায় বিচলিত হওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আজকের সতর্কতা ও পূর্বপরিকল্পনাই অপূরণীয় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে বাংলাদেশকে।