নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পর ক্রমে দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার বেহাল ফুটে উঠছে। নানা সমস্যার মধ্যে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর অভিযোগ উঠছে অহরহ। করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে সারা দেশে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে স্বাস্থ্যসেবা না দেয়ার অভিযোগ আসছে নিয়মিত। সাধারণ সর্দি-কাশি বা জ্বর থাকলে রোগীদের কাছে যাচ্ছেন না চিকিৎসকরা। এতে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা না পেয়ে রোগীরা বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। অনেক সময় প্রাথমিক চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। সেই সংখ্যাও নেহাত কম নয়। এর সঙ্গে আবার যোগ হয়েছে করোনা চিকিৎসার নামে প্রতারণা। এত এত অভিযোগ থাকার পরও তাদের কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, তাদের কাছে লিখিত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না আসার কারণে তারা ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। এমন প্রেক্ষাপটে নানা অনিয়মের অভিযোগে র্যাব পরিচালিত অভিযানে সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় সিলগালা করে বন্ধ করে দেয়া হয় রিজেন্ট হাসপাতাল। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে মঙ্গলবার। কিন্তু কভিড চিকিৎসার শুরুতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সেবা প্রদানের চুক্তি করে রিজেন্ট হাসপাতাল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০১৪ সালেই হাসপাতালটির লাইসেন্সের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায় বলে খবর মিলছে। রাজধানীতে সরকারের চোখের সামনেই প্রায় ছয় হাজার ব্যক্তিকে পরীক্ষা ছাড়াই করোনার সনদ দিয়েছে হাসপাতালটি। অনুমোদিত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়মিত তদারক করার জন্য নির্ধারিত কমিটি রয়েছে। রাজধানীর উপপরিচালক বা সহকারী পরিচালকের নেতৃত্বে দুটি কমিটি এবং বিভাগীয় পর্যায়ের জন্য বিভাগীয় পরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি আছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের জন্য সিভিল সার্জন এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার নেতৃত্বে কমিটি রয়েছে। এসব কমিটি নিয়মিত মনিটরের কথা থাকলেও বছরে দু-একবার গেছে কিনা, সন্দেহ রয়েছে।

জাতীয় দুর্যোগের সময়ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো অনৈতিকভাবে ব্যবসা করে যাচ্ছে। বলা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক্ষেত্রে শুধু অনুরোধের মধ্যেই নিজের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রেখেছে। কারো বিরুদ্ধেই কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। করোনা পরীক্ষার নামে ইচ্ছামতো ফি আদায় থেকে শুরু করে ত্রুটিপূর্ণ বিলের মাধ্যমে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ আদায়, এমনকি মানুষ হত্যার অভিযোগও আমলে নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ফলে চিকিৎসকদের প্রাণ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। অথচ সমস্যা তৈরি করছেন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। চিকিৎসক ও নার্সরা দিনরাত পরিশ্রম করে রোগীর সেবা দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাপকদের কারণে তা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এসব হাসপাতালের সেবা ও বিলের বিষয়ে অডিট জরুরি। যৌক্তিকভাবে এসব হাসপাতালকে বিল দিতে হবে। আর করোনা চিকিৎসায় ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো কোনোভাবেই অতিরিক্ত বিল নিতে পারবে না। কারণ সরকারের পক্ষ থেকে সব সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হচ্ছে। দ্রুত সংক্রমণ প্রতিরোধ আইনের নিয়ম মানতে এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করাতে হবে। প্রয়োজনে মানবাধিকার সংগঠন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে সবার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বারবার বলছে, কোনোভাবেই যেন করোনার চাপে অন্য রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।

নভেল করোনাভাইরাস দুর্যোগ সামাল দেয়ার প্রস্তুতি বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। শুধু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের জন্য প্রণোদনা ও বীমার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বেসরকারি ও প্রাইভেট হাসপাতালে কাজ করেন এমন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করার আহ্বান জানাই। শুধু হুমকি-ধমকি দিয়ে এদের নামানো যাবে না। কারণ অনেক হাসপাতাল ও ক্লিনিকই প্রভাবশালীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সব ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীদের বিচরণ। তাই আলোচনা করে বিল ও পদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে তদারকি বাড়াতে হবে। পুরো ব্যবস্থাপকে একটা ভিশনের আওতায় এনে যে হেলথ সার্ভিসটাকে দেখা, এটা কিন্তু কখনই হয়নি। কখনো এইচআইভি চলে এল তো সেটার ওপর টার্গেটেড কিছু প্রোগ্রাম করা হলো; কখনো টিবি চলে এল তো সেটাকে গুরুত্ব দেয়া। আমরা শুধু ইস্যুভিত্তিক চিন্তা করেছি। পুরো সিস্টেম নিয়ে কখনো পরিকল্পনা করা হয়নি।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো ঠিকমতো সেবা দিচ্ছে কিনা, সেটি তদারকির দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হলেও তারা এক্ষেত্রে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে। প্রমাণ পেলে র্যাবের অভিযানে সিলগালা করার পর রিজেন্ট হাসপাতাল বন্ধে মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সক্রিয় হওয়ার কথা ছিল বেশি। তাদের উদাসীনতার কারণে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় দৈন্য বিরাজ করছে। এসব ব্যাপারে সব মহলেরই অভিযোগ এবং সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ওয়াকিবহাল থাকলেও কারো পক্ষ থেকে এর প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নেই। এটাই রহস্য। সুনির্দিষ্ট আইন ও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকার অজুহাত দেখিয়ে পার পেতে চায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যেটা কোনোভাবেই মেনে নেয়ার নয়। জনস্বাস্থ্য নাগরিক অধিকারের প্রধান একটি স্তম্ভ। এটাকে কোনোভাবে অবহেলা করা চলে না। চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কিত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে পরিচালিত বা উপযুক্ত সেবার মান সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেসব চিকিৎসক কমিশন বাণিজ্যের স্বার্থে রোগীদের হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ফাঁদে ঠেলেন, তাদের আইনের আওতায় আনার পন্থাও খুঁজে বের করতে হবে। এ-সংক্রান্ত আইনের সংস্কার, প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ন এবং তদারককারী দপ্তরের জনবল বাড়ানো দরকার জরুরি ভিত্তিতে।