বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো অপেক্ষাকৃত ভালো করলেও বছরের পর বছর লোকসানে নিমজ্জিত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের এ প্রবণতা অনেক পুরনো। স্বাধীনতার পর দু-এক বছর ছাড়া প্রতি বছরই এসব পাটকল লোকসান দিয়েছে। সরকারের বোঝা কমাতে অতীতে বেশকিছু রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ পাট খাতকে লাভজনক করার অঙ্গীকার করে। তারা ক্ষমতায় আসার পর বিজেএমসিকে লাভজনক করতে কর্মপরিকল্পনা নেয়। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আগের মতো লোকসানের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত এসব পাটকল। মূলত দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, শ্রমিক নেতাদের দৌরাত্ম্য, পুরনো আমলের যন্ত্রপাতিসহ কিছু কারণে এমনটি হচ্ছে। ফলে লোকসানের পরিমাণ বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছিল রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির মাধ্যমে। প্রস্তাবিত বাজেটেও এ বাবদ ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রতি বছর ভর্তুকি দেয়ার কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আর্থিক চাপ বেড়ে চলেছে। এ অবস্থায় ক্রমাগত লোকসানের বোঝা থেকে মুক্ত হতে বিজেএমসির অধীন পাটকলগুলো বন্ধের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সেক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে পুনরায় চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি জারি রাখা আবশ্যক।

পাট পণ্য রফতানিতে নতুন করে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যেজন্য এই দুঃসময়েও আমাদের পাটপণ্যের রফতানি বেড়েছে। এ সম্ভাবনার বাস্তব ভিত্তি হলো উন্নতসহ বিশ্বের অনেক দেশই এখন সবুজ শিল্পে বেশি জোর দিচ্ছে। কিছুদিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো পলিথিন ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে ইইউতে বিপুল পরিমাণে পাটপণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। এ চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে দেশ থেকে বিশ্ববাজারে পাটপণ্যের জোগান নিশ্চিত করা গেলে রফতানি যেমন বাড়বে, তেমনি এটি হবে প্রবৃদ্ধির নতুন চালকও। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। 

পাট ও পাটশিল্পের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। যেহেতু অল্প সংখ্যক দেশ এই পাট রফতানি করে এবং বাংলাদেশ যেহেতু অন্যতম রফতানিকারক দেশ, তাই এই শিল্পের দিকে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। রফতানির বাজার যেহেতু সীমিত, তাই দেশে ক্যাপটিভ মার্কেট তৈরি করতে হবে। এ জন্য সরকারকে পণ্য মোড়ক আইনকে কার্যকর করতে হবে। এখন দেশে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন হচ্ছে তাতে যদি এই আইন কার্যকর করা যায়, তাহলে পাটশিল্পের আশি ভাগ বাজার এখানেই তৈরি করা সম্ভব। জেলা শহরে যেসব সড়ক আছে, তার বিটুমিনের ওপর পাটের তৈরি চট ব্যবহার করা। এই সংক্রান্ত ধারা তৈরি করতে হবে। পাটপণ্যের বহুমুখী ব্যবহার তৈরি করতে হবে। নিত্যনতুন পণ্য যাতে এই খাত থেকে তৈরি হয়, সে জন্য গবেষণা প্রয়োজন। পাট খাতকে ছোট আকারের শিল্প হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই খাতকে বড় শিল্প হিসেবে বিবেচনা করার অবকাশ নেই। কেননা এই খাত থেকে বড় ধরনে মুনাফা অর্জন এখন কষ্টকর। তাই করপোরেশনগুলোকে সীমিত করে বেসরকারি খাতের দিকে পাটশিল্পকে নিয়ে যাওয়াই হবে সঠিক উদ্যোগ।

পাট খাতের রফতানিতে সম্ভাবনার একটি বাস্তব ভিত্তিও বিদ্যমান। সামপ্রতিক বছরগুলোয় বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উন্নয়ন ও শিল্পায়ন চিন্তায় বড় পরিবর্তন এসেছে। উন্নতসহ বিশ্বের অনেক দেশই এখন সবুজ শিল্পে বেশি জোর দিচ্ছে। এক্ষেত্রে একটি রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো পলিথিন ব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে ইইউতে বিপুল পরিমাণে পাটের ব্যাগের চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে, হবে। এছাড়া শপিং ব্যাগ, শৌখিন জিনিস ও আসবাব তৈরির কাঁচামাল উৎপাদনেরও সুযোগ বাড়ছে। বলা যায়, পাটের তৈরি পণ্যের বড় ধরনের চাহিদা তৈরি হবে। চাহিদা অনুযায়ী দেশ থেকে বিশ্ববাজারে পাটপণ্যের জোগান নিশ্চিত করা গেলে এটি যেমন রফতানির অন্যতম খাত হতে পারে, তেমনি হতে পারে প্রবৃদ্ধির নতুন চালকও। তবে তার জন্য চাই যথাযথ পরিকল্পনা, সঠিক কৌশল ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগ। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপ জরুরি।

পাটের উজ্জ্বল সম্ভাবনা সত্ত্বেও দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ধুঁকছে। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনছে। এই দুর্দশার মূল কারণ সেকেলে ও জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি। দেশের পাটকলগুলো এখনো পুরনো যন্ত্রপাতি দিয়ে চলছে। এর বদলে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার মান উন্নত করা হলে পাটকলগুলোকে লাভজনক করা কঠিন নয়। সুতরাং বিষয়টি গভীরভাবে আমলে নেয়া প্রয়োজন। বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা আমাদের পাট শিল্পের সামনে যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তা অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে এবং সেজন্য এ খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।

সরকার কয়েক বছর ধরে পাট খাতে নীতি সহায়তা দিয়ে আসছে। এটা অব্যাহত রাখতে হবে। কিন্তু শুধু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে এ খাতকে এগিয়ে নেয়া যাবে না। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এ খাতে অধিকমাত্রায় সম্পৃক্ত করতে হবে। পাট খাতকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালকে পরিণত করা সম্ভব— এ প্রত্যয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে পাট শিল্পের সহায়ক নীতি প্রণয়ন এবং সেখানে বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার প্রদান করা প্রয়োজন।