অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে গিয়ে নকশা ও কর্মপ্রক্রিয়ায় নিয়মিত বিরতিতে ত্রুটি ধরা পড়ছে। কারিগরি ত্রুটি, নকশায় সমস্যা, কাজ করতে গিয়ে নতুন সমস্যার উদ্ভব ইত্যাদি কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প পদ্মা সেতুর নকশা সংশোধন করতে হয়েছে কয়েক দফায়। শুধু তাই নয়, এর আগে রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্মাণ ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়। পরে সেটি সংশোধন করে বাড়তি ব্যয় ও সময় নিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। সম্প্রতি ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনায় ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেন মহাসড়ক নির্মাণ হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে, যার কারণে দ্রুতগামী গাড়িগুলো কাঙ্ক্ষিত গতিতে চলতে পারছে না এবং প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্প পদ্মা সেতু রেললাইনের নকশায়ও ত্রুটি ধরা পড়েছে। এটা প্রকৌশলগত অদক্ষতা ও দূরদর্শিতাহীনতারই প্রতিফলন। একটি প্রকল্প চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগে কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। কোনো ধাপেই এ ধরনের ত্রুটি ধরা পড়ল না, অথচ নির্মাণের সময়ে এসে ধরা পড়ল, এটি সত্যিই দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। এজন্য প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নির্মাণে ত্রুটি পেয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে এরই মধ্যে বিদ্যমান নকশা সংশোধন করতে বলা হয়েছে। সেতু কর্তৃপক্ষ পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তেই রেললাইনের নকশায় ত্রুটি আছে বললেও রেল সংযোগে সংশ্লিষ্টরা শুধু জাজিরা প্রান্তেই সমস্যা রয়েছে বলছেন। বিষয়টি যথাযথভাবে খতিয়ে দেখে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া দরকার। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ এরই মধ্যে অনেকখানি এগিয়েছে। সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী বাস্তবায়নাধীন সেতুটির সার্বিক কাজ ৯০ শতাংশের কাছাকাছি সম্পন্ন হয়েছে। এ অবস্থায় রেললাইনের নকশা সংশোধনে বিলম্ব মোটেই কাম্য নয়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি প্রবণতা রয়েছে, যেকোনো প্রকল্পে ত্রুটি দেখা দিলে তা সংশোধনের জন্য অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় করা হয়। এ ধরনের অর্থ ব্যয় রাষ্ট্রীয় অপচয় বৈকি। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়। এ ধরনের প্রবণতা দূর করতে হলে প্রথমত নকশায় ত্রুটির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অযৌক্তিক সময়ক্ষেপণ যেকোনোভাবে এড়াতে হবে।

অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রকৌশলগতভাবে যথাযথ বাস্তবায়নের ওপর। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য। বিপুল অর্থ ব্যয়ে আলোচ্য অবকাঠামো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে সড়ক ও রেললাইনের মাধ্যমে রাজধানীর সঙ্গে সংযুক্ত করতে এটিই হবে সবচেয়ে দীর্ঘতম সেতু অবকাঠামো। বছর বছর এ ধরনের সেতুর নির্মাণ বা সংস্কার সম্ভব নয়। সুতরাং কমপক্ষে ১০০ বছরের পরিকল্পনা করে এক্ষেত্রে এগোনো উচিত, যাতে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে নতুন করে সেখানে আর কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করা না লাগে। কিন্তু নির্মাণের শুরুতে আলোচ্য অবকাঠামো নকশায় ত্রুটি ধরা পড়ায় এর মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো ব্রিজ ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ড নেই। তাই বড় বা মাঝারি আকারের সেতু বানাতে কখনো অনুসরণ করা হয় জাপানের স্ট্যান্ডার্ড, কখনোবা যুক্তরাজ্যের স্ট্যান্ডার্ড। আবার যুক্তরাষ্ট্রের বা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ব্রিজ ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডও অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ ধার করা ডিজাইন স্ট্যান্ডার্ডে সেতু বানাচ্ছে বাংলাদেশ। একেক দেশের স্ট্যান্ডার্ড একেক রকম হয়ে থাকে। সেটি তৈরি করা হয় সংশ্লিষ্ট দেশের আবহাওয়া-জলবায়ু, মাটি-পানি-বাতাস-ভূমিকম্প প্রভৃতি বিষয় আমলে নিয়ে। এসব বিষয় বিভিন্ন দেশে ভিন্ন হয়ে থাকে। এ কারণে সেতুর স্ট্যান্ডার্ডও ভিন্ন হয়। আমাদের উপযোগী করে দ্রুত একটি সেতু স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করা আবশ্যক।

বিনিয়োগের পরিপূরক ও সহায়ক পরিবেশ গড়ে তুলতে উন্নত মানের যোগাযোগ অবকাঠামোর বিকল্প নেই। কিন্তু গৃহীত প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা ও মানে যে ধরনের ঘাটতি ধরা পড়ছে, তাতে উন্নত মানের অবকাঠামো ও এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন। এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না। তাই ভবিষ্যৎ যেকোনো প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন সব পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত মান বজায় রাখতে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রদর্শন জরুরি। এটি নিশ্চিত করতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় যথাযথ দায়িত্ব পালন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। পরিকল্পনা ত্রুটির কারণে অনেক সেতু নির্দিষ্ট সময়ের আগে ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে, যা কাম্য নয়। এমন প্রবণতা দূর করতে প্রকল্প গ্রহণের সময়েই আরো সতর্ক থাকতে হবে।