গত এক দশকে দেশের অর্থনীতি বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। গড় প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি থাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতি এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক ‘টাইগার’ হিসেবে আখ্যা পেয়েছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে পূর্ণতা পাওয়া একদল উদ্যোক্তা-শ্রেণী আর শ্রমের সহজলভ্যতার সংমিশ্রণে দেশে ব্যাপক শিল্পায়ন ঘটেছে। আশির দশকে পোশাক খাতের মাধ্যমে ধীরে ধীরে শিল্পায়নের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে দেশের অর্থনীতি। এরপর গড়ে ওঠে পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বস্ত্র খাত, যা মূলত রফতানিমুখী শিল্পের ভিত গড়ে দিয়েছে। এ সবকিছুর পেছনে শক্তি জুগিয়েছে সহজলভ্য প্রাকৃতিক গ্যাস। সে গ্যাস ক্রমে ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এর পেছনে কারণ সরকারের অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভরতা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে আমদানীকৃত গ্যাসের দাম বেড়ে ওঠা এবং ডলার সংকটের কারণে তা কিনতে না পারায় দেশে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা মিলছে না। দেশের শিল্প খাতের সম্প্রসারণ ঘটছে অনেকটা গ্যাসের ওপর নির্ভর করে। জ্বালানি পণ্যটির টেকসই সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে সামনের দিনগুলোয় নানা বিড়ম্বনা আরো বড় হয়েও দেখা দিতে পারে। এ অবস্থায় দেশেই গ্যাসের অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি লাভজনক আমদানির পথও নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি সরকারের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে সরকার জ্বালানির দাম পুনর্নির্ধারণ করবে।

বাংলাদেশ আগে নিজস্ব গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু ক্রমাগত গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া ও চাহিদা বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। কিন্তু এলএনজি আমদানির খরচ জোগাতে এরই মধ্যে পেট্রোবাংলাকে বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অথচ দেশে উৎপাদিত গ্যাসের দাম পড়ে ২ থেকে ৩ ডলার। বর্তমানে এলএনজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখিতা লাগামহীন হয়ে উঠছে। উচ্চমূল্য থাকায় জুলাইয়ে এক অনুশাসনের মাধ্যমে তা স্থগিত করা হয়। এরপর থেকে এতদিন এলএনজির আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ সংকট আরো বেড়েছে। বিপাকে পড়েছে বিদ্যুৎ খাত। উৎপাদন ঠিক রাখতে কখনো আবাসিক, আবার কখনো শিল্পে গ্যাসের সরবরাহ কমানো হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনার ভিত্তিতে বর্তমানে প্রতিদিন ৪ ঘণ্টা করে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখা হচ্ছে। এ পরিস্থিতি যে আসবে, তা অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। এ ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই বলা হয়েছে, সরকারকে সতর্কও করা হয়েছে যে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাবে। নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে হবে। খুলনায় এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন ল্যান্ডবেজড হওয়ার কথা। সেটাও বহুদিন হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে হবে। বর্তমানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত শেষ করলে গ্যাসের চাপ কমে আসবে।

গত তিন দশকে দেশের অর্থনীতিতে বড় রূপান্তর ঘটেছে। ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি। বেড়েছে মাথাপিছু আয়ও। অর্থনীতির নানা সূচকে এ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে শিল্পায়ন। শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করে দ্রুত সময়ে কর্মসংস্থান তৈরি করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে সরকার ১০১টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে। আর এসব শিল্প-কারখানা চালু করতে সাশ্রয়ী জ্বালানি হিসেবে দিন দিন চাহিদা বাড়ছে গ্যাসের। প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান এ চাহিদার তুলনায় গ্যাসের জোগান বাড়ছে না। উল্টো গ্যাস সংকটে চাপে পড়ছে শিল্প খাত আর চাপ বাড়ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের। বিদ্যুতের নিশ্চয়তা না থাকলে শিল্প গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রথম ধাপে সস্তায় বিদ্যুৎ পেয়েছিলেন উদ্যোক্তারা। এর পেছনেও ভূমিকা ছিল গ্যাসের। সস্তায় গ্যাস পাওয়ার ফলে কারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা (ক্যাপটিভ) গড়ে তুলতে পেরেছেন ব্যবসায়ীরা। গ্যাসের দাম বাড়লে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের দামও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন সাড়ে ২৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। জাতীয় গ্রিডবহির্ভূত উৎপাদন সক্ষমতা সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো, যার মধ্যে ক্যাপটিভের সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮ মেগাওয়াট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন না হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে আস্থা পাচ্ছে না শিল্প খাত। নিজস্ব বিদ্যুৎ নির্ভরতাও তাই ক্রমে বাড়ছে।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পর্যাপ্ত থাকলেও শিল্প মালিকরা তাতে খুব একটা আগ্রহী হন না। আবার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গুনতে হয় দ্বিগুণেরও বেশি। এসব কারণে জাতীয় গ্রিডের চেয়ে ক্যাপটিভেই এখনো নির্ভরতা শিল্প মালিকদের, কিন্তু সে ক্যাপটিভ এখন গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিচ্ছে। একদিকে গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন যেমন নয়, আবার ক্ষেত্রবিশেষে বন্ধও থাকছে। অন্যদিকে আবার গ্যাসের দামও বহুগুণ বেড়েছে। ফলে শিল্পের লাইফলাইন ক্যাপটিভ হলেও এ ব্যবস্থার সুফল পাওয়া থেকে ক্রমেই দূরে সরে যেতে হচ্ছে উদ্যোক্তাকে। সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ক্রমে বাড়লেও সরবরাহ ও সঞ্চালন ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। এজন্যই ব্যয়ভার, গ্যাসের চাপজনিত সমস্যা থাকলেও ক্যাপটিভ বিদ্যুতে ভরসা রাখছে শিল্প খাত, কিন্তু বর্তমানে ক্যাপটিভে উৎপাদনও কঠিন হয়ে পড়ছে। বর্তমানে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ব্যয় যে পর্যায়ে গেছে শিল্প সংকুচিত হওয়া ছাড়া পথ থাকবে না। তবে গ্রিড বা ক্যাপটিভ শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে জ্বালানি লাগবেই। কেননা গ্রিডের বিদ্যুতের দাম অনেক বেশি। তাছাড়া বিদ্যুতের সরবরাহও নিরবচ্ছিন্ন নয়।

শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ পেতে হলে সরকার যে দামে গ্যাস আমদানি করে, শিল্প মালিকদের সে দাম পরিশোধ করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এখানে ভর্তুকি দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বাস্তবতা স্বীকার করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির বিরোধিতা করছি না, কিন্তু গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না করে দাম বাড়ানো অন্যায়ই বটে। গত বছর গ্যাসের দাম বাড়ানোর সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনা হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। সরকার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে, তা বলা যাবে না। সংকট নিরসনে উচিত ছিল আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা। কিন্তু সেদিকে অগ্রগতি শ্লথ। দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর না দিয়ে সরকার আমদানির দিকে ঝুঁকেছে। এ আমদানিনির্ভরতাই সংকট তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হলেও এর প্রভাব সর্বস্তরের গ্রাহক পর্যায়ে পড়বে। সরকার বিশেষ করে জ্বালানি বিভাগ বাস্তবানুগ মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করবে বলেই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিগুণের বেশি দাম বাড়ানো হয়েছে শিল্প গ্যাসের। এতে সরকারের কিছুটা সাশ্রয় হবে হয়তো। কিন্তু এতে গ্যাস সরবরাহের উন্নতি হবে কি? আগেও সরবরাহে উন্নতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে দাম বাড়ানো হয়েছিল কিন্তু সরবরাহ বাড়েনি, বরং কমেছে। এবারো যে একই পরিণতি হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ এলএনজি আমদানির মতো যথেষ্ট পরিমাণ ডলার সংগ্রহের সুযোগ এখনো কম। দাম বাড়ানোর কারণে গ্যাসভিত্তিক শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে যার মধ্যে রয়েছে ইস্পাত শিল্প, বস্ত্র, চা, সিরামিক ও গ্লাস কারখানা। গ্যাসের দাম বাড়ায় বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শিল্পোদ্যোক্তাদের কেউ কেউ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহে বাড়তি মূল্য দিতে ইচ্ছুক থাকলেও, তারা এত বিশাল মূল্যবৃদ্ধি আশা করেননি। শিল্প খাত করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ডলারের দাম বাড়ায় কাঁচামালের দামও বেড়েছে, আবার ঋণপত্রও ঠিকমতো খুলতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিজনিত পণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে উঠলে রফতানি বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়ানো হলেও তার প্রভাবে পণ্যমূল্য বেড়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সংকট আরো বাড়িয়ে দেবে। অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার নতুন মেয়াদে বেসরকারি খাতের আরো প্রসার চায়। অথচ গাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে বেসরকারি পর্যায়ের শিল্পোদ্যোগ কতখানি বেগবান হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তে নিঃসন্দেহে বাড়বে পণ্য উৎপাদন ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়বে দেশী শিল্প। আর দেশীয় শিল্পের প্রসার না ঘটলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হবে না। সুতরাং গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতাগুলো আরো বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন ছিল, যা করা হয়নি।

জ্বালানির এ বিশাল মূল্যবৃদ্ধি কি দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? এক অর্থবছরেই জ্বালানি, কৃষি ও শিল্পের ব্যবহূত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির হার যদি বাজেটের প্রাক্কলিত অন্য সংখ্যাগুলোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ থেকে যায় অথবা উৎপাদন অর্থনীতির গাণিতিক হিসাবে অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে থেকে যায়, তাহলে মূল্যস্ফীতির হার কি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাখা যাবে? বিশ্বের দুর্নীতিমুক্ত দেশগুলোর আদলে যেকোনো প্রাথমিক জ্বালানির দাম নির্ধারণের স্থায়ী গাণিতিক মডেল তৈরি করতে হবে। তবেই তা টেকসই ও বোধগম্য হবে। এক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে দেশীয় চাহিদা, আন্তর্জাতিক দর, বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন, মূল্যস্ফীতি, বিকল্প সবুজ জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহদান কিংবা সহযোগী অন্য জ্বালানির দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার ব্যবস্থা।