সম্প্রতি পুলিশের সাবেক এক মহাপরিদর্শক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিপুল পরিমাণ আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে। তার ব্যাপক সম্পত্তি অর্জন, দুর্নীতি নিয়ে টেলিভিশনে টক শোসহ দেশের প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক লেখালেখি হচ্ছে। আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দেশব্যাপী সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় বা টক অব দ্য কান্ট্রিতে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ওই সাবেক মহাপুলিশ পরিদর্শক ও তার পরিবারের সদস্যদের অর্জিত স্থাবর, অস্থাবর সম্পদ বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশক্রমে ক্রোক ও অবরুদ্ধ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আদালত ক্রোক করা সম্পত্তি দেখভালের জন্য রিসিভার নিয়োগ করেছেন। এ বিষয়ে আলোচনায় যে বিষয়টি সামনে চলে আসে তা হলো, ওই কর্মকর্তার বাহিনীর শীর্ষ পদে থাকাকালে জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তি। সরকারি চাকরিরত থাকাকালে ওই কর্মকর্তা একাধিকবার বিপিএমসহ আরো অনেক পদক পেলেও সততার জন্য শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদানকে নিয়েই সর্বাধিক সমালোচনা করা হচ্ছে। এর আগে আরো একজন জেলা প্রশাসকের অনুরূপ শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তি এবং পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তার একজন নারীর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে পড়লে তৎকালে ওই কর্মকর্তার শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তিও মিডিয়ায় সমালোচিত হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত বা নৈতিক স্খলন ঘটেছে এমন কর্মকর্তার শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তি এ পুরস্কার প্রবর্তনের উদ্দেশ্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ২০১২ সালে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করে। এ কৌশল অনুসারে শুদ্ধাচার হচ্ছে, ‘সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ। এর দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদণ্ড, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্য বোঝায়। ব্যক্তি পর্যায়ে এর অর্থ হলো কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা’। একজন সরকারি কর্মচারীর সততা বলতে আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততাকে বোঝায়। আর এ তিনটির ন্যূনতম মানদণ্ড হচ্ছে একজন র্যাশনাল ব্যক্তি নিজস্ব সম্পদাদি আহরণ, ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে ধরনের মিতব্যয়িতা, নিয়মনিষ্ঠা, সতর্কতা, কৌশল অবলম্বন করে, একজন সরকারি কর্মচারী, সরকারি সম্পদাদি ক্রয়, বিক্রয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনুরূপ মিতব্যয়িতা, নিয়মনিষ্ঠা, সাবধানতা, কৌশল অবলম্বন করবে। শুদ্ধাচার কর্মকৌশলের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সুশাসন প্রতিষ্ঠা। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগের অতিরিক্ত হিসেবে সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক হিসেবে সরকার জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করেছে।
শুদ্ধাচার একটি বিস্তৃত বিষয়। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলকে ফলপ্রসূ করা তথা সরকারি কর্মচারীদের দৈনন্দিন কর্মে এর প্রতিফলন ঘটানোর জন্য সরকারি কর্মচারীদের প্রণোদনা ও পারিতোষিক প্রবর্তনের সুপারিশ এ কৌশলপত্রে রয়েছে। ওই সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মচারীদের শুদ্ধাচার চর্চায় উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে সরকার শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা ২০১৭ প্রণয়ন করে। এ নিবন্ধের পরিসর সীমিত রাখার জন্য শুধুমাত্র পুরস্কার প্রদান বিষয়ে আলোচনা সীমিত রাখা হলো। শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা ২০১৭-কে আরো বেশি কার্যকর ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ২০২১ সালে এটি সংশোধন করা হয়। সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী পুরস্কার প্রদানের জন্য শুদ্ধাচার চর্চার জন্য চারটি বৃহৎ পর্যায় নির্ধারণ করা হয়। প্রথম পর্যায়টি হচ্ছে, মন্ত্রণালয় বিভাগ/অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সচিব/সচিব। দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ পর্যায়ে রয়েছে, দপ্তর সংস্থা প্রধান থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত গ্রেড ২ থেকে গ্রেড ২০-ভুক্ত কর্মচারী। গ্রেড ২ থেকে গ্রেড ২০-ভুক্তদের আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। সেগুলো হলো গ্রেড ২-৯, গ্রেড ১০-১৬ ও গ্রেড ১৭-২০।
নীতিমালায় শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপক নির্বাচনের জন্য অর্থবছরভিত্তিক প্রতিটি পর্যায় ও পর্যায়ভুক্ত বিভিন্ন গ্রুপের জন্য ১০টি মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিটি মানদণ্ডের জন্য ধার্য নম্বর ১০।
একজন শুদ্ধাচারী কর্মচারী শুধু শুদ্ধাচারীই হবেন না, তাকে শুদ্ধাচারের প্যারামিটারের ভেতরে থেকে কর্মসম্পাদনে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে হবে। সুতরাং মূল্যায়নের মানদণ্ড এমন হওয়া উচিত, যাতে শুদ্ধাচার ও সক্ষমতার ভারসাম্য থাকে। কিন্তু ওপরে টেবিলে দেখানো দুটি পর্যায়ের ক্ষেত্রে ১০টি মানদণ্ডের মধ্যে একটি সরাসরি সততার জন্য, অন্য নয়টি মানদণ্ড কর্মসম্পাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রেড ২-৯-ভুক্ত কর্মচারী পর্যায়ের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ডের সততা ও নৈতিকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব পালন, সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবোধ, এগুলো কিছুটা পরিবর্তিতরূপে এসিআর বা বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের মানদণ্ডের অনুরূপ। সরকারি কর্মচারীদের কর্মসম্পাদন মূল্যায়নের জন্য বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন/এসিআর প্রদানের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদানের মানদণ্ড যেন বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনের সম্প্রসারিত অংশ না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ‘Re-inventing the wheel’ না হয়। অধিকন্তু পূর্বে উল্লিখিত টেবিলে দেখানো একক মানদণ্ডের নম্বর ১০। কোনো অবস্থায় একজন কর্মচারী কোনো মানদণ্ডের কতটুকু অর্জন করলে ১০, ৯, ৮, ৭, ৬ বা অন্য কোনো নম্বর পাবেন, তার কোনো বর্ণনা বা ব্যাখ্যা শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালায় অনুপস্থিত। ফলে মূল্যায়নটি জাজমেন্টাল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রবর্তনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে সরকারি কর্মচারীদের শুদ্ধাচার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করা। সুতরাং শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত কর্মচারী হবেন নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে একজন আইডল। তার আর্থিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, কর্মস্পৃহা, জানা আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জীবনযাপন, সেবা প্রাপকদের প্রতি মমত্ববোধ, ন্যায়নিষ্ঠা হবে অনন্য। শুদ্ধাচার পুরস্কার এ ধরনের অনন্য কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্রের বাইরে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তাদের কৃতকর্ম তথা সাফল্যকে হাইলাইটেড করার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অন্য কর্মচারীরা শুদ্ধাচার পুরস্কারপ্রাপ্তদের অনুসরণ করে নিজেদেরও অনুরূপ সৎ ও কর্মনিষ্ঠ হিসেবে গড়ে তুলবেন।
চুন খেয়ে মুখ পুড়লে দধি দেখলে যেমন ভয় পায়, তেমনি প্রিন্ট, ইলেকট্রনিকস মিডিয়া, ইনফরমাল চ্যানেলসহ সর্বত্র অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিক স্খলনে জড়িত কর্মচারীদের নিয়ে ফলাও করে সংবাদ প্রচার, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে যে সত্যিকারের শুদ্ধাচারী লোকজন রয়েছে, তা কিয়দংশ লোক বিশ্বাস করতে চান না। যথাযথভাবে এ পুরস্কারের প্রাপক বাছাই ও তা প্রচার বিরূপ ধারণা অপনোদনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি কর্মচারীদের মনের গভীরে এ ধারণা প্রোথিত হবে যে, কর্মজীবনে সাফল্যের চাবিকাঠি অনিয়ম, অসততা, দুর্নীতির মধ্যে নয় বরং আর্থিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, কর্তব্যপরায়ণতা, জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ জীবনযাপন, সেবা প্রাপকদের প্রতি মমত্ববোধ, ন্যায়নিষ্ঠা প্রতিপালনের মধ্যে নিহিত।
প্রসঙ্গক্রমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত মানদণ্ড ও পর্যায়ের আলোকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন যে প্রক্রিয়ায় শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদানের জন্য প্রার্থী বাছাই করে তা উল্লেখ করা যায়। এ কমিশন সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি অর্থবছরে তিনটি ক্যাটাগরিতে (‘ক’ ক্যাটাগরি বেতন গ্রেড ২-৯, ‘খ’ ক্যাটাগরি বেতন গ্রেড ১০-১৫ এবং ‘গ’ কাটাগরি বেতন গ্রেড ১৬ -২০) এ পুরস্কার প্রদান করে আসছে। সত্যিকারের শুদ্ধাচারী কর্মচারীই যেন স্বীয় ক্যাটাগরিতে মূল্যায়নে প্রথম হতে পারেন, সেজন্যে কমিশন এক্ষেত্রে স্বীয় উদ্যোগে কর্মচারীদের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের জন্য প্রতিটি মানদণ্ডের জন্য নির্ধারিত ১০ নম্বরকে পাঁচটি ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে নিয়েছে। কোন কর্মকর্তা/কর্মচারী কোন মানদণ্ডে কী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হলে ১০ বা কী বৈশিষ্ট্য ধারণ করলে অন্য নম্বর পাবেন তা সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এরপর একটি ক্যাটাগরিভুক্ত প্রত্যেক সদস্য নিজেকে বাদে ওই ক্যাটাগরির অন্য সব সদস্যকে মূল্যায়ন করে থাকেন। ওয়েববেজড সফটওয়্যারের মাধ্যমে এ মূল্যায়ন করা হয়। এতে নিজেকে মূল্যায়নের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। এ পদ্ধতিতে মূল্যায়নকারীর গোপনীয়তা বজায় থাকে। ফলে প্রত্যেক কর্মচারী স্বীয় বিচার-বিবেচনা অনুযায়ী নির্বিঘ্নে অন্য সহকর্মীদের মূল্যায়ন করতে পারেন। যেহেতু সবার প্রদত্ত নম্বরের গড় বের করে কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ক্রম নির্ধারণ করা হয়, সেহেতু ২/১ জন কর্মকর্তা/কর্মচারী বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন না করলেও তা সামগ্রিক ফলাফলে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না মর্মে প্রতীয়মান হয়। কমিশনের ২০২১-২২ থেকে ২০২৩ -২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিতদের গ্রহণযোগ্যতাই তার প্রমাণ।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পক্ষে এভাবে সীমিত সংখ্যক কর্মচারীকে শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদানের জন্য বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন সম্ভব হলেও ব্যাপক প্রেক্ষাপটে এটি প্রবর্তনের জন্য পুরস্কার প্রদান নীতিমালায় বিশদ নিয়মাবলি উদাহরণসহ রাখা প্রয়োজন।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য ব্যাপক হারে শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রবর্তন সন্দেহাতীতভাবে সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ পুরস্কারটিকে অর্থবহ করার জন্য প্রতিটি পর্যায়ের মানদণ্ডে শুদ্ধাচারী নিরূপণের বৈশিষ্ট্যগুলো বিশেষভাবে আর্থিক, নৈতিক, বুদ্ধিভিত্তিক সততা, ন্যায়পরতা, জীবনযাত্রার মান, অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় গভীরভাবে পর্যালোচনা করে মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণ, ন্যূনতম ৫ রেটিং স্কেলে মূল্যায়নের ব্যবস্থাসহ স্কেলের প্রতিটি মানের বিশদ বর্ণনা নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
মো. আবদুল হালিম: সাবেক কমিশনার, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ও সাবেক সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়










