গত অক্টোবরে কমিউনিস্ট পার্টির ২০তম কংগ্রেস আরো পাঁচ বছরের জন্য চীনের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শি জিনপিংকে অনুমোদন দেয়। এর মধ্য দিয়ে দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্সি সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা শেষ হয়ে যায় খুব সফলভাবে। তাছাড়া এর ফলে সৎতরের দশকের শেষের দিকে গড়ে ওঠা সমন্বিত নেতৃত্ব গঠনের ধারাও ভেঙে যায়, যেটা মাও সেতুংয়ের এককেন্দ্রিক শাসনের সমাপ্তির পরে গড়ে উঠেছিল।

ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদের ক্ষেৎরে সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণের নাম চীন, কিন্তু খুব বেশি দিন আগের ঘটনা নয়, যখন দক্ষিণ কোরিয়ার ‘উন্নয়নমূলক একনায়কত্বের’ নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। বিশ শতকের বেশির ভাগ সময় কোরিয়ান নেতারা বর্তমানের চীনের মতোই গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের তুলনায় বাণিজ্যবাদী বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। 

সহজভাবে বলা যায়, কোরিয়ার গল্পটি এমন যেখানে রাজনৈতিক কর্তৃৎববাদ গিয়ে অলৌকিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। সেটাই পরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নেতৃৎবে গণতান্ত্রিক প্রভাবের বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে গড়ে উঠেছে। চীনও কি সেই পথ গ্রহণ করবে?

১৯৬১ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পার্ক চুং-হি যখন দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষমতায় এলেন, তখন বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি ছিল এটি। তারপর কয়েকটি নির্বাচনের পর ১৯৭২ সালে তিনি সংবিধান বদলে দেন। যেন তিনি পরোক্ষভাবে সরকারপন্থী প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত একটি বিশেষ সংস্থা দ্বারা নির্বাচিত হতে পারেন এবং পরপর কয়েকবার তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন। নাগরিকের স্বাধীনতা সেখানে ছিল পরবর্তী লক্ষ্য, কিন্তু ১৯৭৪ সালে জাতীয় জরুরি ডিক্রিতে সব ধরনের জমায়েত ও সভা নিষিদ্ধ করা হয়, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবদমিত করা হয় এবং শ্রমিক ধর্মঘট নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। 

পার্কের এসব কৌশলের কারণে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় দেশে। দেশটির অর্থনীতি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, কিন্তু রাজনৈতিক দমন-পীড়ন গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনকে দমিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। সে সময়ে বেশ রাজনৈতিক সংকট ও অশান্তির মুখে পড়ে কোরিয়া। আর ১৯৭৯ সালে পার্ক হঠাৎ মৃত্যুবরণ করায় তা চূড়ান্ত রূপ নেয়, কিন্তু পার্কের মৃত্যুর কারণে বড় কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সূত্রপাত হয়নি, বরং সাবেক সেনাপ্রধান চুন ডো-হোয়ান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং সেনাশাসন ঘোষণা করেন।   

কিন্তু আশির দশকের মধ্যভাগে চুনের নেতৃত্বে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশে উঠে আসে। তার পরই ক্রমাগত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি শক্তিশালী মধ্যবিৎত শ্রেণী গড়ে ওঠে, যারা গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার জন্য রাজপথে আন্দোলন ত্বরান্বিত করে। ১৯৮৭ সালে কায়িক শ্রমের সঙ্গে নিযুক্ত নয় এমন ব্যক্তি, শিল্প-কারখানার শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও অ্যাক্টিভিস্টরা মিলে এক গণবিক্ষোভের ডাক দেন। সেটাই পার্কের ১৯৭২ সালের সংবিধান বাতিল নিশ্চিত করে। জনগণ আরো একবার তাদের নেতাকে বেছে নিতে চায়।

কিন্তু এর পরই যে গল্পটি উত্ফুল্ল মনে শেষ হয়ে গিয়েছিল, তা নয়। পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের পথে অগ্রগতি ছিল খুবই ধীর। বেসামরিক ও গণতন্ৎরপন্থী যোদ্ধা কিম ইয়ং-স্যামকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করতেই লেগে যায় অনেক বছর। কিমের সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ৪০ শতাংশে পৌঁছে। ফলে দেশটি ১৯৯৬ সালে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (ওইসিডি) যোগ দেয়ারও সুযোগ পায়। 

এ পর্যায়ে আমরা চীনের কাছে ফিরে আসতে পারি। এ দেশটিরও এখন মাথাপিছু জিডিপি যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ শতাংশ এবং সাত বছর ধরে প্রতি বছর গড়ে এক শতাংশ হারে এ ব্যবধান পূরণ করছে। যদি এ ধারা চলতে থাকে তাহলে আগামী ১০ বছরে চীন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ৪০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছবে। তা না হলেও অন্তত ২০৩০ সালের মধ্য নাগাদ এ লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হবে। 

কিন্তু যখন চীনের অর্থনৈতিক গতিপথ অনেকটা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থাকেই প্রতিফলিত করছে সেই সময়ে গণতন্ত্রায়নের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি দেখা যায়নি। আশির দশকের মাঝামাঝির মতো চীনেও এখন একটি বড় মধ্যবিত্ত শ্রেণী গড়ে উঠেছে। আর মূল বিষয়টা হচ্ছে, লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভের কারণে চীনের সরকার শূন্য কভিড নীতির নানা বিষয় বাতিল করে যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাতে বোঝা যায় মধ্যবিত্ত চাইনিজদের ক্ষমতা, সেই সঙ্গে এর মধ্য দিয়ে টপ-ডাউন নীতির সীমাবদ্ধতাও বোঝা যায়। 

যদিও চীন কখনো নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার দেবে এমন সম্ভাবনা খারিজ করে দেবেন নিন্দুক পর্যবেক্ষকরা। যদি বিষয়টি এমনই ঘটে, তবে চীনের নেতাদের উচিত কোরিয়ার উদাহরণ থৎকেে শিক্ষা নেয়া।

কোরিয়ার অলৌকিকতার একটি কম লক্ষ করা দিক হচ্ছে, টানা কয়েক বছর রাজনৈতিক সংকট ও অশান্তি সত্ত্বেও সেখানকার অর্থনীতি বেড়েছে এবং পারিবারিক আয়ও বেড়েছে খুবই শান্তভাবে। এর কারণ সবচেয়ে বেশি গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভগুলোও খুব শান্তিপূর্ণ ছিল এবং অর্থনীতিতে মধ্যবিত্ত বিক্ষোভকারীদের অংশীদারত্বে সম্পদের অধিকার ঝুঁকিতে পড়েনি। আবার যেহেতু উভয় পক্ষই সংবিধানকে সম্মান করতে চেয়েছিল এবং নির্বাচনে জিততে চেয়েছিল, ফলে কোনো বিপ্লব না এসে বরং গণতন্ত্রে শৃঙ্খলা ফিরে আসে। 

গণতন্ত্র নিশ্চিত করা, অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ না করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করার জন্য গণতন্ত্রীকরণের সময়ে কোনো সহিংসতা না হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশের প্রধান নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে চীনকে আরো বেশি পরিষ্কার এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তাছাড়া স্থিতিশীল গণতন্ত্রে সবসময় অকৃত্রিম রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রয়োজন পড়ে। এসবের জন্যই তারা যা কিছু অর্জন করেছে, সেগুলো বদলানো উচিত। 

উচ্চ আয়ের অবস্থা অর্জন করার জন্য যে গণতন্ত্র অতি গুরুত্বপূর্ণ সেটা প্রমাণ করার জন্য মাঝে মাঝে দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ দেয়া হয়। এটা ঠিক যেকোনো ধরনের প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, এমনকি তাত্পর্যপূর্ণ উদারীকরণ ছাড়াই ২০৩০ দশকের মাঝ বরাবর চীন সে জায়গায় পৌঁছতে পারে। তবে ১৯৮০-৯০-এর দশকে কোরীয়রা যে ধরনের গণতন্ৎরীকরণের মধ্য দিয়ে গিয়েছে সেটার জানালা খুলে যেতে পারে আগামী ১০-১৫ বছরে। যদি তেমনটা হয়, তাহলে পুরো বিষয়টা চীনের নেতা ও জনগণের ওপর নির্ভর করবে—বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চায়নিজদের ওপর—কারা সুবিধা গ্রহণ করবে।  

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


কিউন লি: ন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল ফর দ্য প্রেসিডেন্ট অব সাউথ কোরিয়ার সাবেক ভাইস চেয়ার এবং সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: শর্মিলা সিনড্রেলা