ভাটির দেশ হওয়ায় নদ-নদীর শাশ্বত ভাঙা-গড়ার খেলায় একদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা যেমন ব্যাপকভাবে ভাঙনকবলিত হয়, অন্যদিকে নদীর বুক চিরে জেগে ওঠে অনেক চর। নদ-নদীর অববাহিকায় দেশের নানা প্রান্তে রয়েছে এ রকম বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের উপস্থিতি। এমনই একটি অঞ্চল হলো তিস্তা অববাহিকাভিত্তিক চরগুলো। তিস্তার অব্যাহত ভাঙন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতায় অভাব-অনটনই ছিল উল্লিখিত চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু চরবাসীর কঠোর পরিশ্রম এবং শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বছরব্যাপী চাষাবাদে বদলে গেছে চিরায়ত দুস্থতার চিত্র; এসেছে আর্থিক সচ্ছলতা। নিঃসন্দেহে এটি এক বড় সাফল্যের গল্প। এ সাফল্যগাথা সবখানে ছড়িয়ে দিয়ে চরাঞ্চলগুলোকে অর্থনীতির মূল প্রবাহে সম্পৃক্ত করার সময় এসেছে।

বাস্তবতা হলো, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় চরাঞ্চলগুলো এখনো অনেকটা উপেক্ষিত। চরগুলোর উন্নয়নে যতটা গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল, ততটা দেয়া হয়নি। চরের জমিগুলো নিয়ে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ। অনেক চরই এখনো সরকারি হিসাবে যুক্ত হয়নি। সর্বাগ্রে এ কাজ করতে হবে। সঠিক পরিরসংখ্যান থাকলে যথাযথ পরিকল্পনা নিতে সহজ হয়। আছে বড় ধরনের যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতা। চরাঞ্চলগুলোকে দেশের মূল যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে গুণগত মানের অত্যাবশ্যকীয় যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়নি। ফলে বাড়ি থেকে কিছুদূর হেঁটে গিয়ে নৌকায় এসে পুনরায় স্থানীয়ভাবে ব্যবহূত যানবাহনে চেপে উপজেলা শহরে পৌঁছতে হয় চরবাসীদের। সময় ও পরিশ্রমের পাশাপাশি বেড়ে যায় ভ্রমণ ব্যয়ও। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনে খরচ বেশি পড়ছে, বাজারজাত করতেও সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালে পানি বেশি থাকায় নৌকাযোগে পণ্য পরিবহন নিশ্চিত করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে এটি বেশ চ্যালিঞ্জং। কাজেই এ সমস্যা সমাধানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

কেবল যোগাযোগ বাধা নয়, চরাঞ্চলে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ নদী শাসন। নদী বিধৌত পলি দিয়ে চরগুলো গড়ে ওঠায় অনেক ক্ষেত্রে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এটি মাথায় রেখে স্থানীয় পরিবেশ ও ভূগাঠনিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সংলগ্ন নদীগুলোয় নিয়মিত খননকাজ পরিচালনা করা জরুরি। নইলে চরগুলোর বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা ও প্লাবনের সমস্যা দেখা দেয়। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হয়। এছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগের ঘাটতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার সুবিধা না থাকাও চরাঞ্চলের আরেকটি বড় সমস্যা। অনেক জায়গায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোও গড়ে ওঠেনি। ফলে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত চরবাসী। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিতে তাদের সুদূর উপজেলায় যেতে হয়। এটি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এজন্য চরগুলোকে লক্ষ্য করে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় চরাঞ্চলের শিশুরা শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে সেখানে শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যাগুলোও প্রকট। এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষায় চরের শিশুদের অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে হবে। সরকারকে যেমন কাজটি করতে হবে, তেমনি এনজিওগুলোও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

কৃষি ও অকৃষি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদারের মাধ্যমে চরবাসীকে উন্নয়নের মূলধারায় আনা গেলে এর প্রভাব হবে বিপুল। এতে দেশের অর্থনীতি আরো বেগবান হবে। অধিক উর্বর হওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে চরের কৃষিজমির গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু কৃষির ক্ষেত্রে সেখানে সেচ একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। আপাতত নদীর ধারে শ্যালো মেশিন বসিয়ে পাইপ দিয়ে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে সেচকাজ সম্পন্ন করা হলেও এটি কোনো টেকসই সমাধান নয়। এর স্থায়ী সমাধান হিসেবে চরাঞ্চলগুলোয় সেচ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি আমলে নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া চাই। করেনাকালে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাংলাদেশও এ আশঙ্কার বাইরে নয়। সম্ভাব্য খাদ্য সংকট এড়াতে আমাদের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলগুলোর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে কৃষিকাজ জোরদার করে খাদ্যনিরাপত্তার স্থায়িত্বশীলতা আরো সংহত করা সম্ভব। শুধু কৃষি নয়, অকৃষি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। চরাঞ্চলের জীবনযাত্রা পাল্টে দিতে সেখানকার তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হবে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ৬২ শতাংশেরও বেশি চরবাসীর বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে। এই বিরাটসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে সামান্য প্রশিক্ষণ দিয়েই তাদের আরো উৎপাদনক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব। বিদ্যমান সম্পদ কাজে লাগিয়ে যুব উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। 

আশার কথা, চরের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এরই মধ্যে চরের মানুষের জন্য সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। তাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতের আওতায় আনা হয়েছে। এসব কর্মসূচি আরো বাড়াতে হবে। তবে লক্ষ্য হওয়া উচিত চরাঞ্চলগুলোর স্বয়ম্ভরতা নিশ্চিত করা। পর্যটনের অন্যতম কেন্দ্র হতে পারে চরগুলো। সেই নিরিখে কৌশল নিলে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ রয়েছে। চরের রূপান্তরমূলক পরিবর্তনের জাতীয় পর্যায়ে একটি চর ফাউন্ডেশন বা চর বোর্ড গঠন করা যেতে পারে, যারা চরের উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। সরকারের সর্বতো প্রচেষ্টায় চরাঞ্চলগুলো অর্থনৈতিক কর্মচঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠবে, এটিই প্রত্যাশা।