বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে চিরায়ত বৃত্ত থেকে বেরোতে পারছে না বাংলাদেশ। অর্থবছরের শুরুর দিকে ঢিমেতাল, শেষের দিকে কোনোমতে তাড়াহুড়ো করে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা—এটিই যেন সাংবাৎসরিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। অব্যবহিত আগের অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার ও ব্যয়ে সরকার রেকর্ড করলেও গত অর্থবছরে এক্ষেত্রে বড় ধরনের ছেদ ঘটেছে। সংগত কারণে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে এডিপি বাস্তবায়ন হার কিছুটা কম হবে, তা প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবায়ন হার মার্চে ৪৫ শতাংশ থেকে এপ্রিলে বেড়ে হয়েছে ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসে মাত্র ৪ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছিল। মে মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ৫৭ শতাংশে উন্নীত হয়। আর বছর শেষে এডিপি বাস্তবায়ন হয় ৮০ শতাংশ। সে হিসাবে এক মাসে ২৩ শতাংশ টাকা খরচ হয়েছে। তার মানে শেষ মাসেই এডিপির এক-চতুর্থাংশ ব্যয় হয়েছে। এটি অর্থের অপচয় এবং কাজের নিম্নমানের বিষয়টি ফের নতুন করে সামনে এনেছে। প্রায়ই দেখা যায়, নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণের পর অর্থবছরের শেষের দিকে তড়িঘড়ি করে সরকারি কর্মসূচি ও প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করা হয়। ঠিকাদার ও সরবরাহকারীরা তখন অল্প সময়ে যেনতেন প্রকারে কাজ শেষ করেন কিংবা কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই বিল নিয়ে যান। কাজের গুণগত মানও তখন নিশ্চিত করা যায় না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, এতে ঠিকাদার, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের দিক থেকে বড় ধরনের দুর্নীতির সুযোগ রয়ে যায়। এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ২০১৯-২০ অর্থবছরেও একই রকম ঘটনারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বছরজুড়ে কাজে কোনো গতি নেই, হঠাৎ করে শেষের দিকে লক্ষণীয় মাত্রায় গতি বেড়ে গেছে। এক্ষেত্রে যথাযথ মান ও পেশাদারিত্ব কতটুকু বজায় থেকেছে, সেই প্রশ্ন উঠছে জনমনে। কাজেই আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে পুরো অর্থবছর, বিশেষ করে শেষের দিকের কাজের পেশাদারি অডিট হওয়া এখন সময়ের দাবি।
দেশে এডিপি বাস্তবায়নে শেষ মুহূর্তের তাড়াহুড়োর জন্য কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত দুর্বলতা বিরাজমান। এর একটি হলো ক্রয়সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা। অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর মতো বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের ক্রয়ের একটি প্রধান অংশ সম্পন্ন হয় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অনুমোদনকৃত ঋণ, অনুদান বা সহায়তার মাধ্যমে। কোনো কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া এবং দাতাদের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনে বিলম্ব হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ে। আরেকটি পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা হলো, ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থান নির্বাচনে সৃষ্ট জটিলতা। ভূমিপ্রাপ্তি ছাড়া যেকোনো নির্মাণকাজ শুরু করা সম্ভব নয়, ভূমি অধিগ্রহণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তাছাড়া ভূমি অধিগ্রহণ একটি জটিল ইস্যুও বটে। এর সঙ্গে আইনগত বিষয় যুক্ত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে অবাঞ্ছনীয় বিলম্ব হয়। দক্ষ ও পর্যাপ্তসংখ্যক প্রকল্প পরিচালক না পাওয়াও প্রকল্প বাস্তবায়নে অন্যতম বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন জেলায় বাস্তবায়িত অর্ধডজন বা আরো বেশি প্রকল্প তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব দেয়া হয় একজন প্রকল্প পরিচালককে। তদুপরি প্রকল্প পরিচালক পদে বারবার আনা হয় পরিবর্তন। স্বাভাবিকভাবে এভাবে যোগ্য প্রকল্প পরিচালকের ঘাটতি এবং তাদের উপর্যুপরি বদলি প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ব্যাহত করে। আরেকটি সমস্যা হলো, প্রভাবশালীদের প্ররোচনায় প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই না করে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রকল্প গ্রহণ। ব্যাপকতর অপর্যাপ্ত বার্ষিক বরাদ্দের কারণে এ ধরনের প্রকল্পগুলো অযাচিত বিলম্বের শিকার জয়। ফলে বাস্তবায়নও পিছিয়ে পড়ে। বাস্তবায়নে শ্লথতা দূর করতে রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, জনগণের চাহিদাচালিত প্রকল্প অনুমোদনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এটি আমলে নেয়া চাই।
বাস্তবায়নজনিত বিলম্বের ক্ষেত্রে অর্থবছরসংক্রান্ত একটি নীতিগত বিষয়ও যুক্ত। আমাদের দেশে অর্থবছর শুরু হয় জুলাইয়ে। তখন বর্ষার মৌসুম শুরু হয়ে যায়। ফলে অর্থবছরের প্রথম দিকে কাজ শুরু করা কঠিন। ভারতে অর্থবছর হিসাব করা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে। নিজস্ব আবহাওয়া-জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি রেখে আমাদের দেশেও অর্থবছর এগিয়ে আনা যেতে পারে। সুতরাং এডিপি বাস্তবায়নে উপর্যুপরি দীর্ঘসূত্রতা দূরে পূর্বোক্ত বিষয়গুলোর সুষ্ঠু সুরাহা জরুরি। এতে কাজের মান, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে বৈকি। দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট কতগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বরাবরই বেশি পিছিয়ে থাকে। এবারো এডিপি বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকার ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিসংখ্যান বিভাগ, খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ কিছু বিভাগের নাম উঠে এসেছে। তাদের কি সক্ষমতার অভাব, নাকি অন্য সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। একান্তই অভ্যাসগত কারণে বিলম্ব হলে সংশ্লিষ্টদের শাস্তির আওতায় আনা দরকার। আর সক্ষমতার অভাব থাকলে তা কীভাবে বাড়ানো যায়, তার উপায় খুঁজতে হবে। টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে এডিপির সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিতে এর বিকল্প নেই।










