বিশ্বে রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় মূল লড়াইটা অর্থ, সম্পদ ও ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। প্রতিটি রাষ্ট্রে সব সময়ই বিভিন্ন শক্তির মধ্যে সব স্তরে ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্য সংঘাত-লড়াই চলতে থাকে। রাষ্ট্রের চরিত্রের ভিন্নতায় ও সমাজের কাঠামোগত এ রূপ বিন্যাস চিহ্নিত করে তাকে সংঘাত বা ‘সন্ত্রাস’ হিসেবে অভিহিত করেছেন নোবেল বিজয়ী আমেরিকান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডগলাস সি. নর্থ। তার ‘Violence and Social orders’ গ্রন্থে সমাজের কাঠামোগত এ রূপ অবস্থানকে রাষ্ট্রভেদে দুই ভাগে বিভাজন করা হয়েছে।

রাষ্ট্র ব্যবস্থার এ রূপ বিভাজনে ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ বা সুযোগের দিক থেকে একটিকে বলা হচ্ছে সীমিত সুযোগের বা ‘লিমিটেড এক্সেস অর্ডারের’, অন্যটি উন্মুক্ত সুযোগের বা ‘ওপেন এক্সেস অর্ডার’র।

ডগলাস নর্থের এ তত্ত্ব বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৌলিকভাবে ভিন্ন যুক্তি ও পদ্ধতিতে ওই ‘এক্সেস অর্ডার’ দ্বারা সামাজিক ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। দেখা যায়, সীমিত সুযোগ বা লিমিটেড এক্সেস অর্ডারের সমাজে বা রাষ্ট্রে দুর্নীতি-লুটপাট-উেকাচ-কমিশন এক ধরনের সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয় এবং এর জন্য লাভবান হওয়ার ও অর্থ-সম্পদ আহরণ করার একটা একচ্ছত্র আধিপত্য ও বোঝাপড়া তৈরি হয় রাজনৈতিক-সামাজিক এলিটদের মধ্যে। এ রূপ অভিজাত উচ্চবিত্তরা গড়ে তোলে একটা ডমিন্যান্ট কোয়ালিশন বা চক্র, তারা অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বনে যান এবং রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা ভাগাভাগি করে কম-বেশি সুফলভোগী হন এরা সবাই। পুঁজি, ধন-সম্পদ, ভূমি, ব্যবসা, ব্যাংক ব্যবস্থা, রাজনীতি, ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান, সংসদ, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, শ্রম, শিক্ষা, চাকরি, নির্বাচন প্রভৃতি এ এলিট চক্র নিজেদের দখলে রাখে। সে সব রাষ্ট্রে ও সমাজে এক ধরনের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সুফলভোগী এলিটরা সচেষ্ট থাকেন। কারণ এ ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে এ সুবিধাভোগকারী ডমিন্যান্ট কোয়ালিশন বা চক্রের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। তাদেরই স্বার্থে একটা দৃশ্যমান-বাহ্যিক ‘শান্ত’ দৃশ্য বা ভারসাম্য বজায় থাকে এসব লিমিটেড এক্সেস অর্ডার বা সীমিত সুযোগের রাষ্ট্রগুলোয়। সাধারণ মানুষ বা অধিকাংশ জনগণ অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও অশান্তি-সংঘাত দমিয়ে রাখার এক ধরনের কৌশল, যুক্তি ও পদ্ধতিতে এসব রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। লুটপাট, ভাগাভাগি, উেকাচ, কমিশন এগুলো অভিজাতদের জন্য প্রাপ্তি অব্যাহত রাখার স্বার্থে সামগ্রিক প্রতিযোগিতাগুলোও অধিকাংশ মানুষের জন্য অবারিত বা উন্মুক্ত রাখা হয় না। তবে অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা যাতে দানা বাঁধতে না পারে, সেজন্য একটা স্তর পর্যন্ত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা হয়। তারা মনে করে সাধারণ মানুষের আনুগত্য কমে গেলে বা বিশৃঙ্খলা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেলে এলিটদের নিজেদেরই ক্ষতির ফলে লুটপাটের সুযোগটা এরা হাতছাড়া হতে দেন না। সেজন্য যেকোনো মূল্যে এ ব্যবস্থা অভিজাতরা টিকিয়ে রাখতে চান। এমনকি এ এলিটরা নিজেদের মধ্যেও সংঘাত-বিরোধ দমনে সক্রিয় থাকেন।

অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ ‘লিমিটেড এক্সেস অর্ডারের’ রাষ্ট্রগুলোকে আবার তিনটি ধাপে ভাগ করেছেন।

সেগুলো হলো—১. ভঙ্গুর বা ‘ফ্রেজাইল’ ২. সাধারণ বা ‘বেসিক’ ৩. উন্নত বা ‘অ্যাডভান্স’।

ভঙ্গুর বা ‘ফ্রেজাইল’ রাষ্ট্র: এসব রাষ্ট্র মূলত ব্যর্থ রাষ্ট্র। সীমিত সুযোগের প্রথম ধাপের বা একেবারে নিম্নস্তরের এসব রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্যহীন প্রতিযোগিতায় সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেখানে নিয়ন্ত্রণের জন্য কার্যকর ও শক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান থাকে না, ডমিন্যান্ট কোয়ালিশন এ অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ক্রমাগত জনস্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে এ রাষ্ট্রগুলোয় প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান, বিচার ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, সংসদ, অর্থনীতি, শিক্ষা, নির্বাচন ব্যবস্থা, গণমাধ্যম, মানবাধিকার অতিশয় দুর্বল হয়ে পড়ে। দুর্নীতি-ঘুস-লুটপাট-অর্থ পাচার লাগামহীন পর্যায়ে পৌঁছে যায়। সংঘাত-সন্ত্রাস উচ্চমাত্রায় বিরাজ করে। লিবিয়া, সোমালিয়া, আফগানিস্তান এসব রাষ্ট্র বড় উদাহরণ। আরো বেশ কিছু রাষ্ট্র এখন এ পথে ধাবিত হচ্ছে।

সাধারণ বা ‘বেসিক’: এসব রাষ্ট্রে বেসিক বা সাধারণ পর্যায়ে মানুষ কিছু স্বাধীনতা ভোগ করে। মানুষরা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না তাদের বঞ্চিত হওয়ার মাত্রাটা বা স্বাধীনতার মাপকাঠিটা ঠিক কোন পর্যায়ে। তবে এখানেও নিয়ন্ত্রণ সেই ডমিন্যান্ট কোয়ালিশনেরই; দুর্নীতি-লুটপাট, প্রশাসন-প্রতিষ্ঠান সব তাদের হাতেই থাকে। মানুষ হয়তো মনে করে একেবারে ভঙ্গুর বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির চেয়ে এমনটি মন্দ নয়। এটা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বলা হয়ে থাকে ভারত, বাংলাদেশসহ বেশকিছু রাষ্ট্র এ স্তরের দৃষ্টান্ত।

উন্নত বা ‘অ্যাডভান্স’: লিমিটেড এক্সেস অর্ডার বা সীমিত সুযোগের ব্যবস্থায় কিছু রাষ্ট্র ওপরের দিকের বা উন্নত সারির রাষ্ট্র। ডমিন্যান্ট কোয়ালিশন এখানে নিজেদের স্বার্থমুখী নিয়ন্ত্রণটা পুরোপুরি নিতে পারে না। অর্থ-সম্পদ আহরণসহ অন্যান্য সামাজিক অধিকার ও সুযোগগুলোয় সাধারণ মানুষমুখী একটা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ ব্যবস্থা থাকে এসব রাষ্ট্রে। বিচার ব্যবস্থাসহ প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে মোটামুটি শক্তিশালীই থাকে। দক্ষিণ কোরিয়াসহ কিছু দেশ এ রূপ রাষ্ট্রের উদাহরণ।

অন্যদিকে ‘ওপেন এক্সেস অর্ডার’ বা উন্মুক্ত অর্থাত্ অবারিত সুযোগের রাষ্ট্রে ধাপ বা স্তর একটিই। সেখানে ধন-সম্পদ আহরণে সব মানুষের সমান অধিকার থাকে। সব সুযোগ সমভাবে বণ্টনের জন্য নাগরিকরা, রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক এলিটরা একটা সামাজিক ইতিবাচক সমঝোতা বা চুক্তিতে পৌঁছে। এখানে সামাজিক প্রতিযোগিতা ন্যায্যতা ও নাগরিকের মেধা, শিক্ষা, সক্ষমতার ভিত্তিতে সাম্যতার ও নীতিতে নিশ্চিত করা হয়। সম্পদের বৈষম্য এক্ষেত্রে একেবারেই নগণ্য। বিচার ব্যবস্থা, আইনি সহায়ক প্রতিষ্ঠানসহ অন্যসব সংস্থা শক্তিশালী, ন্যায়ানুগ, মানুষের জন্য কল্যাণমুখী ও নিরপেক্ষ থাকে। সেসব রাষ্ট্রে দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার, দুর্বৃত্তায়নের অনুপস্থিতিতে সব মানুষ নির্বিঘ্ন জীবনযাপনের অধিকার লাভ করে। মেধার বিকাশ, শিক্ষালাভের অধিকার, ধন-সম্পদ আহরণসহ সব ক্ষেত্রে মানুষ ন্যায্যতা ও সমতা ভোগ করে।

সুইডেন, নরওয়েসহ মোট ১৪টি দেশকে অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ ‘উন্মুক্ত সুযোগের’ বা ‘ওপেন এক্সেস অর্ডার’-এর রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষের জন্য এ ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ অর্থাত্ সুযোগ বা অবাধ অধিকার সমাজে ক্রমাগত চর্চার মাধ্যমে উপরোক্ত স্তরগুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। লক্ষণীয়, এগুলোর দ্বিমুখী চর্চা রয়েছে রাষ্ট্রগুলোয় এবং এ রূপ চর্চার ক্রমান্বয়তা নির্ধারণ করে রাষ্ট্রটি কোন দিকে যাচ্ছে।

এ রূপ চর্চার ভালো দিক হচ্ছে, ‘সীমিত সুযোগের’ সমাজকাঠামোয় ‘ফ্রেজাইল’ থেকে ‘বেসিক’ এবং ‘বেসিক’ থেকে ‘অ্যাডভান্স’ রাষ্ট্র হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে সেক্ষেত্রে শাসকবর্গসহ এলিটদের সদিচ্ছা প্রয়োজন সব মানুষের ‘অ্যাকসেসিবিলিটি’ নিশ্চিত করা ও আরো প্রয়োজন শাসন ব্যবস্থায় কর্তৃত্ববাদিতার অবসান ঘটানোর।

ইতিবাচক এ চর্চায় উন্নয়ন ও উত্তরণের ক্ষেত্রে যেসব রাষ্ট্র সব ধাপ ক্রমানুসারে অতিক্রমে উত্তীর্ণ হতে পারে, তারাই ‘ওপেন এক্সেস’ বা উন্মুক্ত সুযোগের রাষ্ট্রে পরিণত হয়। যদিও বিশ্বে কর্তৃত্ববাদের আধিপত্যে সে সুযোগ অনেকাংশেই কমে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ মনে করেন একটি রাষ্ট্রে সব মানুষের জন্য সুযোগগুলো নিশ্চিত না হলে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ভালো হলেও, কর্তৃত্ববাদী শাসন চেপে বসলে, এলিটরাই শুধু লাভবান হলে, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নে জনগণ সম্পৃক্ত হয় না বরং ডগলাস নর্থ এ উন্নয়নকে উন্নয়ন না বলে অবনমন বলেছেন।

দেখা যাচ্ছে সুযোগ, অধিকার ও ন্যায্যতার চর্চায় নেতিবাচক পরিণতি বা ক্রমাবনতি ঘটছে অনেক রাষ্ট্রের। ‘অ্যাডভান্স’ থেকে ‘বেসিক’ এবং ‘বেসিক’ থেকে ‘ফ্রেজাইল’ হয়ে যাচ্ছে বহু রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

উপরে বর্ণিত সুযোগগুলোর সূচক এখন অনেক দেশেই নিম্নমুখী বা ভয়ানক উদ্বেগজনক। উল্লিখিত অল্প কিছু উন্মুক্ত সুযোগের রাষ্ট্র ছাড়া বাকিরা কথিত এলিটদের কোয়ালিশন দ্বারা মানুষকে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে লুণ্ঠন ও ধন-সম্পদ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগির ব্যবস্থা চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছে।

মেধা, যোগ্যতা, অধিকার, সাম্যতার নীতি ব্যবস্থা ক্রমে বিলীয়মান হয়ে যাচ্ছে। শাসন কাঠামোয় আধা কর্তৃত্ববাদ ও পুরো কর্তৃত্ববাদের চর্চা এ সংকটকে আরো গভীর করে তুলছে।

‘সীমিত সুযোগ’ বা সুযোগহীনতা ও অধিকারহীনতা সাধারণ মানুষের জন্য বিশ্বের বহু রাষ্ট্রে বাড়ছেই।