‘ভয়াবহ দাবানল, বন্যা-সাইক্লোন ও ঘূর্ণিঝড় বেড়েই চলেছে। মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে। প্রকৃতির সঙ্গে যেমন আচরণ করা হবে, প্রকৃতিও ঠিক সেভাবেই ফিরিয়ে দেবে, এটা ইতোমধ্যে ভয়ংকরভাবে করে যাচ্ছে’। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত ২ ডিসেম্বর জলবায়ু বিষয়ক একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর এ কথাগুলো বলেছেন। প্রতিবেদনটি করেছে আবহাওয়া সংক্রান্ত জাতিসংঘের সহযোগী সংগঠন World Meteorological Organization (ডব্লিউএমও) বা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা। এর প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের অভিমত -জলবায়ু বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বিশ্ব।
জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তন সহনীয় পর্যায়ে রাখার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও কর্মপরিকল্পনা চলছে। ১৯৯৭ সালে জাপানে ‘কিয়োটা প্রটোকল’ এর মাধ্যমে তৎসময়ের গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু দেশকে ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ হ্রাসকরণে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কিয়োটা প্রটোকল থেকে কানাডা,আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশ নিজেদেরকে প্রত্যাহার করে নেয়। প্রটোকলে বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহিতার শর্ত না থাকায় ‘কিয়োটা প্রটোকল’ পরবর্তীতে কার্যকারিতা হারায়।
কার্বন নির্গমন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ভয়ানক পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালে জলবায়ু বিষয়ক ‘প্যারিস চুক্তি’ সম্পাদিত হয়। বিশ্বের ১৯৬ টি দেশ উক্ত চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। তবু থেমে নেই কার্বন নির্গমন বৃদ্ধি, প্রকৃতি, পরিবেশ ধ্বংসের বহুমুখী কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে।
প্রকৃতি বিনষ্টে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারা দুনিয়াতেই উল্লেখযোগ্য রকম ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তন্মধ্যে আমাজন জঙ্গলে সংঘটিত অজস্র দাবানল বিশ্ববাসীর জন্য সন্ত্রস্ত্র হওয়ার মতো বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।পৃথিবীর ফুসফুস খ্যাত এই বিশাল অরন্য কেবলই পুড়ছে। ব্রাজিলের মহাকাশ সংস্থা ‘ইনপে’ বলছে শুধু ২০১৯ সালেই আমাজনে দাবানলের ঘটনা ঘটেছে ৭২ হাজার ৮৪৩টি, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ বেশি।
আমাজন পৃথিবীর ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে আর পৃথিবীর কার্বন শুষে নেয় ২৫ শতাংশ। এই আমাজনে রয়েছে ১৬ হাজার প্রজাতির ৪ লক্ষাধিক উদ্ভিদ, আড়াই লক্ষ পতঙ্গ। ভয়াবহ এই সকল দাবানলে নানাবিধ প্রাকৃতিক সম্পদ ও আবহাওয়ার ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়ে চলেছে।
প্রকৃতি, পরিবেশ ও আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট গবেষণা বলছে, আমাজনের এরূপ অগ্নিকান্ডের জন্য বজ্রপাতসহ প্রাকৃতিক কারণ মাত্র ৫ শতাংশ। বাকীসব মানুষের দ্বারা সংঘটিত। মানুষেরা বৃক্ষ নিধন করছে, আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে—চাষাবাদ, বসতিস্থাপন, খনিজ আহরণ, শিল্প স্থাপন ও অন্যান্য জীবিকাধর্মী কর্মকান্ড চালনার জন্য। ফলে আমাজনের বনভূমি উজাড় হচ্ছে-বিনষ্ট হচ্ছে জীববৈচিত্র। সংশিষ্ট পরিবেশকর্মীরা ও সংগঠনগুলোর মতামত ব্রাজিলের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর পরিবেশ বিরুদ্ধ অবস্থান ও কথাবার্তা সেদেশের মানুষকে আমাজনের ক্ষতিসাধনে উদ্বুদ্ধ করছে। ফলে আমাজনের এরুপ দাবানলের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
তাছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকার পশ্চিম উপকুল ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তৃত অঞ্চলে বছরে ছোট-বড় অসংখ্য দাবানলের ঘটনা ঘটছে। গাছপালা, ঘরবাড়ি, ভূমিসহ বিভিন্ন ক্ষতিও সেক্ষেত্রে বিরাট হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস ও তাসমানিয়া অঞ্চলেও শতাধিক মারাত্মক দাবানলের ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপেও বহু অগ্নিকান্ড বা দাবানল হয়েছে এরই মধ্যে।
পরিবেশবাদিরা বলছেন অরণ্য বিধ্বংসী, জীববৈচিত্র বিনষ্টকারী এরূপ দাবানল অব্যাহত থাকলে পৃথিবীর কার্বন নির্গমন কমানো যাবে না, সম্ভব হবে না পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি রোধকরণ। ফলে উষ্ণতা চিরতরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং বিপর্যয় অনিবার্য হয়ে পড়বে।
দেখা যাচ্ছে,পৃথিবীর গড় উষ্ণতা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে । বরফ গলছে অস্বাভাবিক হারে পৃথিবীর উত্তরাংশে, এমনকি হিমালয় পর্বতমালার বরফও গলে যাচ্ছে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হারে।
দুনিয়াব্যাপী বহুস্থানে তাপমাত্রার রেকর্ড হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার তাসমানিয়া এলাকায়, দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া, পূর্ব কানাডা, আলজেরিয়া, নরওয়েতে এমনকি উত্তর মেরু(আর্কটিক), সাইবেরীয় অঞ্চলে, ওমানে, জাপানে তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড হচ্ছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিজনিত বহুবিধ সমস্যা মানুষ প্রত্যক্ষ করছে-ভুগছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
দাবানল বা অগ্নিকান্ডের ভয়াবহ ঘটনাবলী ছাড়াও পৃথিবীজুড়ে বন্যা, জলোচ্ছাস, ঘুর্ণিঝড়ের প্রকোপ বেড়েছে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যায় মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে-খাদ্য সংকটে পড়ছে। চীনের এবারের বন্যার ক্ষয়ক্ষতিও অন্য যে কোনো সময়ের তুলনায় ব্যাপক।
এদিকে বঙ্গোপসাগরের উষ্ণতা ও সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে আশংকাজনকভাবে। এমনিতেই বঙ্গোপসাগর খুবই উষ্ণ এক সাগর।বিশ্বের ইতিহাসে ভয়ঙ্কর ৩৫টি ঘূর্ণিঝড়ের ২৬টির উৎপত্তি বঙ্গোপসাগর থেকে।এই সাগর অববাহিকার দেশগুলো যেমন বাংলাদেশ ও ভারতে ঝড়, জ্বলোচ্ছাস, বন্যা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিকট অতীতের সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পানের ধ্বংসযজ্ঞ এ অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। ইউএনডিপির হিসাব মতে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেই শুধু ঘুর্ণিঝড়ের ক্ষতি প্রায় ১৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার।
হালসময়ে দেখা যাচ্ছে, বন্যা-জলাবদ্ধতায় ব্যাপ্তি, স্থায়ীত্ব ও ক্ষতি আরো অনেক বেশি। ফলে ঘুর্ণিঝড় ও বন্যাজনিত কারণে বঙ্গোপসাগর অববাহিকা ও এর সহিত সংশ্লিষ্ট বন্দর নির্ভরশীল দেশগুলো যেমন বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ, চীন আর্থিক ও পরিবেশগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আগের চেয়ে অধিকহারে।
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন। ১৮৭৮ সালেই এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে ঘোষিত হয়। তৎকালে এর আয়তনও ছিল বর্তমানের দ্বিগুণ। এখন যে ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তন রয়েছে সেটির ৬ হাজার ১৭ কিলোমিটার বাংলাদেশের সীমানায়। বাকীটা ভারতের অংশে। এখনও ৫০০ বাঘ, প্রায় ১৫ হাজার হরিণসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থল এই সুন্দরবন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে এই সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের নিকটবর্তী অঞ্চলে। ফলে বনাঞ্চলটির ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশংকা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ফলে কার্বন, ছাই, গ্যাস, বর্জ্য,কয়লাসহ ভারী ধাতুর প্রভাবে সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটার এলাকায় পরিবেশগত সংকট দেখা দেওয়ার শংকা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে এর ফলে বনটির গাছপালা ধীরে ধীরে মারা পড়বে, ভূমির উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে।
‘প্যারিস চুক্তি’র উদ্দেশ্যই হচ্ছে কার্বন নির্গমন হ্রাসকরণ ও উষ্ণতা বৃদ্ধি সহনীয় পর্যায়ে রেখে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বকে বাসযোগ্য রাখা। কার্বন নিঃসরণ কমাতে হলে তেল, গ্যাস, কয়লার ব্যবহার বন্ধের দিকে যেতে হবে। বনাঞ্চল রক্ষা করতে হবে, নদী- জলাশয় বাঁচাতে হবে, জীববৈচিত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু সেলক্ষ্যে বিশ্ব্যব্যাপীই কাঙ্খিত পর্যায়ে কাজ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট রাষ্টগুলো ও কর্ণধারেরা ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ বাস্তবায়নে আন্তরিক নন। উপরুন্তু বিশ্বে অশুভের অন্যতম ‘মাস্টারমাইন্ড’ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালেই প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে তার দেশের বেরিয়ে যাওয়ার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা এবছরের নভেম্বরে কার্যকর হয়েছে। ব্রাজিলের বলসোনারোর মতো আরো বহু অনুসারী রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের, যারা জলবায়ু পরিবর্তন-পরিবেশ এসব বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা ও কর্মকান্ডে বিশ্বাসী ও কথিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নামে পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে আগ্রহী।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার রিপোর্ট বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ এই ৬ বছর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বিশ্বে নতুন রেকর্ড হয়েছে। তন্মধ্যে ২০২০ সাল ৩টি সবচেয়ে বেশি উষ্ণ বছরের একটি হতে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা, বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে উন্নত- স্বল্পোন্নত-উন্নয়নশীল কোন জাতি রাষ্ট্রই মুক্ত নয়। তবে বাংলাদেশের মতো দেশের সংকট বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- বঙ্গোপসাগর পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ এদেশের বৃহৎ অংশ তলিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এদেশের পোষাক শিল্প-প্লাস্টিক শিল্পের বর্জ্য, মেডিকেল বর্জ্যসহ নির্মাণ কাজের দূষণে বায়ু ও সামগ্রিক পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়ে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘এয়ার ভিজুয়াল’ এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী গত ৬ ডিসেম্বর ঢাকার বায়ুমান সূচক ছিল ২৫১, যা মন্দের দিক থেকে দ্বিতীয়। দিল্লী ছিল ৩০৫ নিয়ে প্রথম। মন্দের এই বায়ুমান সূচকে লাহোর ২৩২, কলকাতা ২০০, করাচি ১৮০,মুম্বাই ১৬৫।অর্থাৎ বায়ুদূষণে এই অঞ্চল এগিয়ে আছে।
সারা পৃথিবীব্যাপী অরন্য ধ্বংস হচ্ছে, সাগর-মহাসাগরের উষ্ণতা-উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বরফ গলছে, নদী-জলাশয়ের উপর আগ্রাসন চলছে, স্থলভাগে বায়ুদূষণ বাড়ছেই,জীববৈচিত্রের ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে।
সবই চলছে কথিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে। এই উন্নয়নকর্ম প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিনিময়ে চলছে সর্বত্র! প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিয়ে যাচ্ছে। আরো ভয়ংকর বিপর্যয়ের জন্য কী অপেক্ষা সকলের!
লেখক: নিবন্ধকার
ddc99bd@gmail.com










