‘সুলভে যৌক্তিক চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার সবার’ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আলমা আটা ঘোষণাপত্র, ১৯৭৮
ক. বাংলাদেশে চিকিৎসা অপচয়ের মূল কারণগুলো
বাংলাদেশে ব্যক্তি স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় হয়, যা পৃথিবীতে সর্বোচ্চ।
এত অধিক ব্যয়ের মূল কারণ বাংলাদেশে কোনোরূপ উন্নত মানের প্রাইভেট বা বেসরকারি স্বাস্থ্য বীমা (প্রাইভেট হেলথ ইন্স্যুরেন্স) কিংবা সরকার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা না থাকা।
১. রোগীরা চিকিৎসকদের কাছ থেকে ন্যূনতম ৫ মিনিট পরামর্শ সময় না পাওয়ায় রোগী ও তার আত্মীয়স্বজন চিকিৎসকের ওপর আস্থা হারায়, এমনকি নামিদামি চিকিৎসকের ওপরও। রোগীর উপসর্গগুলোর বর্ণনা শেষ করার আগেই চিকিৎসক রোগীকে একটি ব্যবস্থাপত্র ধরিয়ে দেন, কোন ওষুধ কোন উপসর্গ উপশমের জন্য দিয়েছেন, কখন সেবন করতে হবে খাওয়ার আগে না পরে তা চিকিৎসক বুঝিয়ে বলার আগেই পরবর্তী রোগী পরামর্শ কক্ষে প্রবেশ করে, কোনটা কোন রোগের ওষুধ এবং এসব ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মিথস্ক্রিয়া রোগী জানার সময় পায় না, রোগী ওষুধের ব্যবহার সম্পর্কিত পুরো তথ্য না জানার অসন্তোষ নিয়ে চিকিৎসকের চেম্বার ত্যাগ করে। সামান্য সমস্যা হলে রোগী ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং অনেক সময় অন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।
২. রোগীরা চিকিৎসকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে দামি ওষুধকে বেশি ভালো ওষুধ মনে করে। রোগী ও চিকিৎসক উভয়ে জানেন না যে দামি ওষুধ বেশি নকল এবং ভেজাল ও নিম্নমানের হয়। রোগী দামও বেশি দিল, আবার অকেজো খারাপ ওষুধও সেবন করল। রোগ না সারায় প্রতি বছর কয়েক লাখ বাংলাদেশী রোগী ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া এমনকি কতক আমেরিকা ও ইংল্যান্ড যাচ্ছে এবং বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে তাদের দুর্নীতি ও দরিদ্রতা বাড়ছে।
৩. চিকিৎসকরা বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা নিয়ে বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছেন। সোজা কথায়, ঘুষ নিচ্ছেন। তারা আর্থিক বিবেচনায় নির্ধারিত কোম্পানির ওষুধ লেখা ও অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় পরীক্ষা করানোর জন্য ক্লিনিক-ল্যাবরেটরি থেকে ৫০-৬০ শতাংশের বেশি কমিশন বাবদ পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ চিকিৎসকরা অতিরিক্ত দামি ওষুধ লিখছেন এবং অতিরিক্ত রোগ নির্ণয় পরীক্ষাও করাচ্ছেন। সব প্রাইভেট হাসপাতাল মালিক এবং দুর্নীতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে। উদাহরণ ছাড়া চরিত্র পরিবর্তন হবে না।
৪. চিকিৎসকের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রোগীরা আইসিইউ-সিসিইউর সন্ধানে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে, এমনকি নাম-গোত্রহীন ক্লিনিকে। কতক হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ভেন্টিলেটর, সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিফিব্রিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, ইসিজি ও ইকো এবং বিবিধ সিরিঞ্জ পাম্প থাকলেও আইসিইউ পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইসিসিউ বা সিসিইউ বিশেষজ্ঞ নেই। অথচ হাসপাতালের বিছানার চাদর, মাস্ক, পেপার গাউন, তোয়ালে, জুতার কভার ও বালিশের কভার পরিবর্তন এবং সময়ে অসময়ে বিভিন্ন চিকিৎসক রোগীকে পরিদর্শন করে রোগী থেকে ফি আদায় করছেন। আইসিইউ বা সিসিইউতে ভর্তি থাকার সময়ে ভেন্টিলেটর, কার্ডিয়াক মনিটর, পালস অক্সিমিটার, সিরিঞ্জ পাম্প, ওষুধের ডোজ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র প্রভৃতি ব্যবহারের জন্য আলাদা চার্জ আদায় করা হয়। এটা অনৈতিক ও দুর্নীতির অংশ। দৈনিক কত লিটার অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়েছে, তার হিসাব নেই, অথচ আইসিসিউ থেকে বিদায়কালে ৪০-৫০ হাজার টাকা অক্সিজেন চার্জ বাবদ রোগী থেকে আদায় করা হয়। দিনে দুপুরে ডাকাতি। দুদক কী করছে? উল্লেখ্য, রোগী বা তাদের আত্মীয়স্বজন এমনকি চিকিৎসকরা প্রতি হাজার লিটার অক্সিজেনের ক্রয়মূল্য জানেন না। তাই প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকরা রোগীদের ঠকায়, প্রতারণা করে। ফলে প্রতিদিন আইসিইউ বিল বাড়ে দ্রুতগতিতে, যা দৈনিক ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকাও হতে পারে।
সৌভাগ্যবশত গণস্বাস্থ্য আইসিইউতে এমন একজন দায়িত্বে আছেন, যিনি অত্যন্ত নিবেদিত এবং কানাডা, ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। আইসিইউ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদ ২০০১ সালে ইউরোপিয়ান ডিপ্লোমা ইন ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন (ইডিআইসি) অর্জন করেছেন। সম্ভবত বর্তমানে বাংলাদেশে অধ্যাপক নজীবের চেয়ে অধিকতর জ্ঞানসম্পন্ন সিনিয়র কোনো আইসিইউ বিশেষজ্ঞ নেই। পরবর্তী সময়ে তিনি ক্রিটিক্যাল কেয়ার (ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট), লিভার আইটিইউ (আইসিইউ) ও মাল্টিডিসিপ্লিনারি আইসিইউতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত হাসপাতালগুলোয় এবং সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতাল ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং বিশেষ কর্মদক্ষতা অর্জন করে দেশে ফিরেছেন।
আইসিইউতে রোগী থাকলে তিনি দৈনিক ১৬-১৮ ঘণ্টা সময় হাসপাতালে কাটান। আইসিইউ বিশেষজ্ঞরা জুনিয়র চিকিৎসক বা নার্সদের ফোন পাওয়ার পর কত দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছেন, তার ওপর আইসিইউ রোগীর জীবন নির্ভরশীল। তাকে দ্রুত ডাকার জন্য তিনি হাসিমুখে সব জুনিয়রকে ধন্যবাদ জানান, তাদের সঙ্গে নিয়ে, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিয়ে রোগী দেখেন, রোগী পরীক্ষা করা শেখান এবং পরে আলাদাভাবে প্যারামেডিক, ওয়ার্ডবয়, ক্লিনার ও রোগীর আত্মীয়স্বজনকে সযত্নে রোগীর সমস্যা বুঝিয়ে বলেন।
৫. বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ একটিও আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নাল কিনে না পড়ায় তাদের জ্ঞানের পরিধি সীমিত হয়ে যাচ্ছে এবং সহজে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মিথ্যাচারে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, আস্থাহীনতায় ভুগছেন। চিকিৎসকরা ওষুধের মূল্য জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেন না। দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি। বাণিজ্যিক (ব্র্যান্ড/ট্রেড নেম) নামের ওষুধে দুই-তিনদিনের মধ্যে রোগের উপশম না হলে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক বদলে দেন। প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনীয়তাই নেই। চিকিৎসকরা ওষুধ লেখেন জেনেরিক নামে নয়, বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে। ফলে রোগী ওষুধের প্রকৃত নাম জানতে পারে না। অনেক সময় খেয়াল করেন না যে ওষুধ লিখছেন, তা মূলত একই জেনেরিক গোত্রের। তারা ওষুধের প্রকৃত দামও জানেন না বলে অপ্রয়োজনে বেশি মূল্যের অধিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সমন্বিত ওষুধগুলোর বিধি ব্যবস্থাপত্র লিখে থাকেন।
খ. বাংলাদেশের গ্রামে প্রথম স্বাস্থ্য বীমার প্রচলন
স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র সাভার এলাকায় একই দরের কিস্তিতে (প্রিমিয়ামে) গণস্বাস্থ্য বীমা চালু করে। স্থানীয় পরিবারপ্রতি মাসে ২ টাকার কিস্তি (প্রিমিয়াম) দিত। বিনিময়ে রোগী বিনা ফি-তে বিবিধ স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা পেত। যেমন প্যারামেডিক ও চিকিৎসকদের ফ্রি পরামর্শ ও ওষুধ এবং রক্ত, পায়খানা, প্রস্রাবের সাধারণ পরীক্ষাগুলোর সুবিধা পেত বিনা খরচে। দুর্ভাগ্যবশত এ নীতিতে না দরিদ্র পরিবার না ধনীরা খুশি ছিল। মধ্যবিত্ত ও ধনীরা লাইন করে দরিদ্র রোগীর পেছনে দাঁড়াতে অস্বস্তি বোধ করত। ধনী ও মধ্যবিত্তরা আলাদাভাবে প্রাইভেটে বাড়িতে ডাক্তার নিয়ে দেখাতে চায়। উপরন্তু, দরিদ্র রোগীরা মনে করত যে ধনীদের আয় যেহেতু অনেক বেশি, তাদের কাছ থেকেও মাসিক ২ টাকা চাঁদা ধার্য করা যৌক্তিক নয়, ‘গরিবের হক হরণ করা হচ্ছে, তাদের প্রতি অন্যায় করা হচ্ছে, অবস্থাপন্নদের বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে, খাতির করা হচ্ছে।’
একক শ্রেণীর স্বাস্থ্য বীমার পরিবর্তে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার জনসাধারণের সঙ্গে একাধিক আলোচনা সভা করে সাভারসহ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সব কর্ম এলাকায় জনসাধারণকে ছয়টি সামাজিক শ্রেণীতে বিন্যাস করে সামাজিক শ্রেণীভিত্তিক গণস্বাস্থ্য বীমা চালু করা হয়: (১) অতিদরিদ্র (২) দরিদ্র (৩) নিম্নমধ্যবিত্ত (৪) মধ্যবিত্ত (৫) উচ্চমধ্যবিত্ত (৬) ধনী/উচ্চবিত্ত। স্বাস্থ্য বীমাহীনরা ৭ নম্বরে নিবন্ধিত হয়। দরিদ্ররা নগণ্য প্রিমিয়াম দিয়ে বেশি সুবিধা পায়, ওপিডিতে পরামর্শ ফ্রি। কিন্তু অবস্থাপন্ন উচ্চবিত্ত পরিবাররা দেয় অনেক বেশি প্রিমিয়াম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখাতে অবস্থাপন্নরা বেশি ফি দেয়। অধূমপায়ী দরিদ্র পরিবার দেয় বছরে ২০০ টাকা, অন্যদিকে উচ্চবিত্ত ধনী পরিবার স্বাস্থ্য বীমা দেয় বছরে ২ হাজার ৮০০ টাকা, উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার দেয় ২ হাজার ৪০০ টাকা এবং অধূমপায়ী মধ্যবিত্ত পরিবার দেয় মাত্র ১ হাজার ৮০০ টাকা। প্রতি দুই বছর পর পর্যালোচনা করে স্বাস্থ্য বীমার প্রিমিয়ামের বিহিত করা হয়। এত কম প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্য বীমা পৃথিবীর কোথাও নেই। কিন্তু এ বিষয়ে পর্যালোচনা বা প্রচারে সরকারি আগ্রহ কোনোটাই নেই।
ঢাকা শহরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাত্র ৪ হাজার ৯৮২ পরিবারের গণস্বাস্থ্য বীমা আছে। অন্যদিকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের গ্রামীণ কর্ম এলাকায় প্রায় ১৫ লাখ লোকের ২ লাখ ২৮ হাজার ৭৬২ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৪৭ হাজার ৬০৪ পরিবার গণস্বাস্থ্য বীমা নিবন্ধিত। প্রকৃতপক্ষে যথেষ্ট প্রচার-প্রচারণার অভাবে পল্লী এলাকায় গণস্বাস্থ্য বীমার প্রসার হয়নি। ফলে জনসাধারণ একটি আধুনিক জনসেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
গ. কভিড-১৯ রোগের সংক্রমণ এবং চিকিৎসা
চীনের সবচেয়ে বড় শিল্পাঞ্চল উহান প্রদেশে ২০১৯ সালের নভেম্ব্বরে কভিড-১৯ ভাইরাস আত্মপ্রকাশ করে এবং দ্রুত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে কভিড-১৯-এর কারণে প্রথম মৃত্যু ঘটে গত ১৮ মার্চ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৬ মার্চের সতর্কবাণীকে বাংলাদেশ সরকার গুরুত্ব দেয়নি। ফলে রোগটি বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। করোনার চিকিৎসা সম্পর্কে মাগুরার চিকিৎসক ডা. খলিলুর রহমান (ফোন ০১৭১২৮১৯৪০৫, ০১৯৬০৪৬৩৭৩৫) তার অভিজ্ঞতার আলোকে তিন পর্যায়ে ভাগ করে করোনা রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে একটি ছোট লেখা লিখেছিলেন, তা শিক্ষণীয় বলে কিছু অংশ আমি উল্লেখ করছি।
কভিড-১৯ একটি স্পর্শকীয় ভাইরাস, যা আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশি থেকে কিংবা আশপাশের ৩-৬ ফুটের মধ্যে অবস্থিত বস্তু থেকে ব্যক্তিদের অসতর্কতার কারণে ছড়িয়ে পড়ে। স্টেফাইলোকক্কাস, স্ট্রেপটোকক্কাস, নিউমোকক্কাস প্রভৃতি ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। সাধারণত ৩-১৪ দিনের মধ্যে কভিড-১৯ উপসর্গ প্রকাশ পায় (Incubation Period) তিন পর্যায়ে।
প্রথম পর্যায়ে ১-৩ দিন: শুরু হয় সাধারণ জ্বর, গায়ে-মাথায় সামান্য ব্যথা ও শুষ্ক কাশি দিয়ে, যোগ হয় নাক দিয়ে হালকা পানি পড়া, হাঁচি-কাশি ও তৃতীয় দিনে মৃদু শ্বাসকষ্ট। চুলকানি ও হাঁচি-কাশি অ্যালার্জির লক্ষণ।
দ্বিতীয় পর্যায় ৪-৬ দিন: হঠাৎ জ্বর বেড়ে ১ হাজার ২০ থেকে ১ হাজার ৪০ ফারেনহাইট ওঠে, শুকনা কাশির সঙ্গে শ্লেষ্মা যুক্ত হয়। সর্বত্র মৃদু ব্যথা, বিশেষত গলায়। শ্বাসকষ্ট ক্রমান্বয়ে বেড়ে যায়, শ্লেষ্মাসহ হাঁচি-কাশি বৃদ্ধি এবং খাওয়ায় অরুচি ও অনিদ্রা যোগ হয়। নিউমোনিয়ার লক্ষণ প্রকাশমান এবং রোগীর অস্বস্তি বোধের সঙ্গে ভীতিসঞ্চারও লক্ষণীয়।
তৃতীয় পর্যায়: রক্তে অক্সিজেন সংমিশ্রণ বিভ্রাটে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ ও কফ-শ্লেষ্মা বৃদ্ধি পেয়ে বুকের ভেতর গড়গড় শব্দ শোনা যায় এবং স্বাভাবিকভাবে শুয়ে থাকায় অসুবিধা হয়, রোগী ক্রমে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
ঘ. করোনা রোগীর চিকিৎসা ও ব্যয়
প্রথম পর্যায়ে রোগীকে আলাদা ঘরে রেখে আলাদাভাবে দেখাশোনা করাই মূল কাজ। এলাকার একজন চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শ নিলে ভালো হয়। ৭০-৮০ শতাংশ রোগী নিরাময় হয় নিজ বাড়িতে স্বল্প খরচে, স্বল্প সময়ে ও স্নেহ-ভালোবাসায়। বোকামি করতে হবে না একই ওষুধ অকারণে বেশি দামে কিনে, এতে ভালোর চেয়ে অন্য সমস্যাও সৃষ্টি হতে পারে।
দিনে একটা বা দুটো করে ৫০০ মিলিগ্রামের প্যারাসিটামল ট্যাবলেট এক থেকে তিনবার সেবন যুক্তিসংগত। প্যারাসিটামলের সঙ্গে অন্য উপাদান যেমন ক্যাফেইন বা ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত না থাকা ভালো, এতে অন্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের প্যারাসিটামল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশ মতো উত্পাদিত, জেনেরিক নাম জি-প্যারাসিটামল, প্রতি ট্যাবলেটের মূল্য ৭০ পয়সা, অর্থাৎ ৭ টাকায় ১০টি জি-প্যারাসিটামল কিনতে পাওয়া যায়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক নামে বাজারজাত নাপা, নাপা প্লাস, নাপা এক্সট্রা প্রভৃতি এবং অপ্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উপাদানসহ প্রস্তুত প্রতি ট্যাবলেট দুই থেকে আড়াই টাকায় বিক্রি হয়। এতে রোগ দ্রুত সারে না, কিন্তু অর্থের অপচয় হয়।
হাঁচি-কাশি অর্থাৎ অ্যালার্জি নিবারণের অ্যান্টিএলার্জি ওষুধ ৪ মিলিগ্রামের ক্লোরোফেনারামিন (Chloropheneramine / G-Antihistamine Tablet) দিনে একটি করে খেলে ভালো উপকার হয়। প্রতি ট্যাবলেটের দাম মাত্র ২৫ পয়সা (অর্থাৎ ১ টাকায় চারটি অ্যান্টিহিস্টামিন ট্যাবলেট কিনতে পাওয়া যাবে)। গরম চা, মধু ও আদায় গলায় আরাম পাওয়া যায়। চুষে চুষে জি-ভিটামিন সি-২৫০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট দিনে ৩-৪টা খাওয়া যেতে পারে, প্রতি ট্যাবলেট জি-ভিটামিন সির দাম ১ টাকা ৩০ পয়সা (১০টি ট্যাবলেটের মূল্য ১৩ টাকা) অনেকে প্রতিদিন ২০ মিলিগ্রামের একটা বা দুটো জিংক ট্যাবলেট (G-Zinc) গ্রহণের পরামর্শ দেন, খরচ প্রতি ট্যাবলেট ১ টাকা, অর্থাৎ ১০টি জিংক ট্যাবলেটের মূল্য ১০ টাকা।
কোয়ারেন্টিন রুমে (একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথক থাকা) অবশ্যই এক বোতল ১০০ মিলিলিটারের জাইনানল বা জি-ক্লোরোহেক্সাডিন (5-Chlorohexidine) থাকা দরকার। জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহারের জন্য। ১০০ মিলিলিটারের দাম ১০০ টাকা। সাবানও ব্যবহার করবেন।
ভালো উপকার পাওয়া যায় গরম পানিতে কয়েক ফোঁটা টিংচার আয়োডিন কিংবা ইউক্যালিপটাস তেল মিশিয়ে গরম বাষ্প নিলে।
অন্য সমস্যা যেমন পেট বা বুক জ্বালাপোড়া বা অ্যাসিড ভাব লাগলে দিনে একটি বা দুটি ২০ মিলিগ্রামের জি-ওমিপ্রাজল ক্যাপসুল সেবন করলে নিরাময় নিশ্চিত। খরচ প্রতি ক্যাপসুলে ৩ টাকা (১০ ক্যাপসুলের মূল্য ৩০ টাকা)।
প্রথম পর্যায়ে নিরাময়ে ব্যর্থ ২০ শতাংশ রোগীকে অবশ্যই নিকটবর্তী সরকারি বা বেসরকারি ক্লিনিক হাসপাতালের আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তি হতে হবে। তবে ভর্তির আগে নিশ্চিত হতে হবে যে সেখানে ছোট অক্সিজেন পালস অক্সিমিটার যন্ত্র এবং রোগীকে প্রয়োজনমাফিক সরাসরি অক্সিজেন দেয়ার সুবিধা আছে। রক্তে পরিমিত অক্সিজেন সংমিশ্রিত না হলে রোগীকে মুখ বা নাক দিয়ে অক্সিজেন কিছুক্ষণ দিতে হয়। দেখতে হবে অক্সিজেন সংমিশ্রণ ৯২-৯৫ শতাংশের মধ্যে যেন থাকে। অতিরিক্ত অক্সিজেন দেয়া অপচয় তো বটে, অনেক সময় ক্ষতিকরও।
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক তারিক আলম করোনা পজিটিভ দ্বিতীয় পর্যায়ের রোগীদের প্রতিদিন একটি অ্যান্টিহেলমিনথিক আইভারম্যাকটিন, যার প্রতি ট্যাবলেটের দাম ৫ টাকা এবং ১০০ মিলিগ্রামের ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড ট্যাবলেট দিনে দুবার পাঁচদিন সেবন করিয়ে রোগ নিরাময় লক্ষ করেছেন।
হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিটে ভর্তির প্রথম দিনে ইনজেকশন মিথাইল প্রেডনিশোলন ২৫০ মিলিগ্রাম দুটি কিংবা ইনজেকশন ডেক্সামেথাসন ৪ মিলিগ্রাম (G-Dexamethasone 4 mg Injection), মূল্য প্রতি ইনজেকশন মাত্র ১৫ টাকা, দিনে দুবার তিনদিন। খরচ ৯০ টাকা।
নিউমোনিয়ার চিকিৎসার জন্য কো-এমক্সিক্লেভ ১-২ গ্রাম দিনে তিনবার কিংবা এরিথ্রোমাইসিন/এজিথ্রোমাইসিন অথবা ক্যাপসুল সেফেক্সিম (G-Cefixime 20 mg, মূল্য ২০ টাকা) পাঁচদিন সেবনের জন্য দেয়া হয়।
দিনে কয়েকবার গরম জলের বাষ্প বা মেশিনের মাধ্যমে সালবুটামল (৫ এমজি) মূল্য প্রতি ভায়াল ৮০ টাকা কিংবা বুডিসোনাইড (শূন্য দশমিক ৫ এমজি) অথবা এন-এসিটিল (Injection N-Acetyl Cysteine-NAC) সংমিশ্রণে নেবুলাইজার ব্যবহারে শ্লেষ্মা বের করায় খুব উপকার পাওয়া যায়।
ব্যয়বহুল অ্যান্টিভাইরাল রেমডিসিভির ব্যবহার নিরাময়ে তিনদিন সাশ্রয় করায়। অন্য অ্যান্টিভাইরালের ব্যবহারে সুফলের প্রমাণ নেই। অর্থের অপচয় মাত্র। শিক্ষিত পেশাজীবীও প্রতারিত হচ্ছেন অপ্রমাণিত বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় কিনে। তাদের জ্ঞানচক্ষু কবে উন্মোচন হবে?
আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৮-১০ দিন ভালো নার্সিং সেবা ও নিয়মিত চিকিৎসা পেলে দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রায় সব রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যায়, অনধিক ১০ শতাংশ রোগী বিভিন্ন জটিলতা ও একাধিক বিকল অঙ্গের সমস্যা নিয়ে তৃতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করে।
তৃতীয় পর্যায়ের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মূলত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে চিকিৎসা করাতে হয়। করোনায় মৃত্যুহার ২-৩ শতাংশে সীমিত।
ঙ. অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন
সারা পৃথিবীতে এমনকি উন্নত বিশ্বের চিকিৎসকরা সহজে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সুলভ ওষুধ থাকা সত্ত্বেও অযাচিতভাবে অধিকতর মূল্যের ওষুধ লেখেন। নতুন ওষুধের ভুল প্রয়োগ প্রায়ই লক্ষণীয় ঘটনা। এ সমস্যা রহিত করার লক্ষ্যে প্রায়ই পরামর্শ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক পরামর্শক কমিটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড কেয়ার এক্সিলেন্স (এনআইসিই)। সময়মতো চিকিৎসা না হলে বা চিকিৎসাবিভ্রাট হলে কভিড-১৯ রোগের মূল সমস্যা হাসপাতালে ভর্তির সময় বা ভর্তির ৪৮ ঘণ্টা আগে বাড়ি ও এলাকার পরিবেশ থেকে অর্জিত নিউমোনিয়া অথবা হাসপাতালে অন্য কারণে আসা রোগীদের হাসপাতালের পরিবেশ থেকে অর্জিত সংক্রমণ দ্রুত ফুসফুসের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। সে সমস্যার দ্রুত চিকিৎসার জন্য গত মে মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ কমিটি এনআইসিইর সুপারিশগুলো বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। অ্যান্টিবায়োটিক সাধারণত পাঁচদিন সেব্য। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষত ফুসফুসের সমস্যায় দুই-তিন সপ্তাহ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
চ. স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে অর্জিত পরিমিত ও তীব্র নিউমোনিয়ার চিকিৎসায়
মুখে ডক্সিসাইক্লিন ২০০ মিলিগ্রাম প্রথম দিনে এবং দ্বিতীয় দিন থেকে ১০০ মিলিগ্রাম করে বা কো-এমক্সিক্লেব ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে তিনবার, সঙ্গে ক্লেরিথ্রোমাইসিন ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে দুবার সেবন করতে হবে। রোগের তীব্রতা বেড়ে গেলে লেভোফোক্লাসিন ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে একবার বা দুবার পাঁচদিন সেব্য। মুখে সেব্য অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্তঃশিরায় পদ্ধতিতে উল্লিখিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছেন।
হাসপাতালে অর্জিত প্রতিহত নিউমোনিয়া হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা না থাকলে উল্লিখিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো মুখে পাঁচদিন সেব্য নতুবা হাসপাতালে অর্জিত নিউমোনিয়ার তীব্রতা, প্রদাহ কিংবা ভেন্টিলেটর সম্পৃক্ত বা উদ্ভূত নিউমোনিয়া অথবা চিকিৎসা প্রতিহত হওয়ার অধিকতর সম্ভাবনা থাকলে নিম্নলিখিত অ্যান্টিবায়োটিকগুলো আন্তঃশিরায় দ্রুত ব্যবহার বাঞ্ছনীয়। অ্যান্টিবায়োটিকগুলো হচ্ছে—
* পিপারসিলিন মিশ্রিত টেজোব্যাকটাম, প্রতিবার ৪ দশমিক ৫ গ্রাম করে দিনে তিনবার ইনজেকশন দেয়া শুরু করে, প্রয়োজনে একই মাত্রায় দিনে চারবার দেয়া যেতে পারে।
* সেফটাডিজিম দুই গ্রাম করে দিনে তিনবার আন্তঃশিরায় ইনজেকশন।
* কোনো কারণে উল্লিখিত অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে লেভোফ্লোক্সাসিন ৫০০ মিলিগ্রাম দিনে দুবার বা ততোধিকবার আন্তঃশিরায় দেয়া যুক্তিযুক্ত।
* মেথিসিলিন প্রতিহতকরণে সমর্থ স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়স প্রদাহে অবশ্য দেয় ভ্যানকোমাইসিন। প্রতি কিলোগ্রাম ওজনে ২০ মিলিগ্রাম হিসাবে সর্বোচ্চ দুই গ্রাম দিনে তিনবার আন্তঃশিরায় বা (টাইকোপ্লানিন) প্রতি কিলোগ্রাম ওজনে ৬ মিলিগ্রাম দিয়ে শুরু করে দিনে তিনবার করে পরবর্তী সময়ে দিনে একবার দিলে কার্যকর হয়।
* লিনেজোলিড ৬০০ মিলিগ্রাম দিনে দুবার মুখে সেব্য কিংবা বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে একবার ইনজেকশন দেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ওষুধের মূল্যের প্রতি ক্লিনিশিয়ান/বিশেষজ্ঞদের নজর রাখা উচিত।
দুর্ভাগ্যের বিষয় যে এনআইসিইর মতো সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশগুলো দেশের ক্লিনিশিয়ান/বিশেষজ্ঞরা সতর্কতার সঙ্গে অনুসরণ না করায় দেশে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিহতকরণ জীবাণু প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে।
ছ. মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে আসা একজন আইসিইউ রোগীর চিকিৎসা ব্যয়
শরীরে করোনা রোগের প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলে ২৩ মে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ৭৮ বছর বয়সী বিকল কিডনি রোগী জাফরুল্লাহ চৌধুরী ২৪ মে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের GR-Rapid Antibody পরীক্ষায় কভিড-১৯ পজিটিভ প্রমাণিত হন। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে রিয়াল টাইম পিসিআরে (Polymerase Chain Reaction) করোনা পজিটিভ প্রমাণিত হয়। ৩০ মে রোগীর শ্বাসকষ্ট বাড়ে, মানসিক আচরণে বিশৃঙ্খলা ও আচ্ছন্ন ভাব দেখা যায়, রক্তে অক্সিজেন মিশ্রণ ৮৫ শতাংশে নেমে এলে রোগী তন্দ্রাছন্ন হয়ে পড়েন। রোগীকে এ অবস্থায় গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে করোনা নির্ধারিত আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। দুজন বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার মামুন মুস্তাফী এবং আইসিইউ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদ সার্বক্ষণিকভাবে দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা রোগীর পাশে বসে থেকে রোগীকে পর্যবেক্ষণ করেছেন, অক্সিজেন সংমিশ্রণ ৯৪-৯৬ শতাংশ নিশ্চিত করার জন্য প্রতি মিনিটে ন্যূনতম ৬ লিটার অক্সিজেন সরবরাহ এবং তারা নয় রকমের অ্যান্টিবায়োটিক ১০ দিনে বিধি ব্যবস্থা দিয়েছেন। এত ধরনের অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার অবশ্য প্রশ্নসাপেক্ষ। সম্ভবত নিজেদের ওপর আস্থার অভাব এবং গুরুত্বপূর্ণ বয়স্ক রোগী বিধায় রোগীর অবস্থার দ্রুত উন্নতির জন্য বিশেষজ্ঞরা ঘন ঘন অ্যান্টিবায়োটিক বদলেছেন। স্টেরয়েড ব্যবহার করেছেন। তার বুকের এক্স-রেতে উভয় দিকে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। তার রক্তের মৌলিক পরীক্ষা (সিবিসি) স্বাভাবিক ছিল, তবে সি রিঅ্যাকটিভ প্রোটিন সিআরপিও ডি-টাইমার বৃদ্ধি পায়। সালবুটামল ও বুডেসোনাইড দিয়ে নেবুলাইজার শুরু করা হয়। অধ্যাপক তারিক আলমের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় অ্যান্টিহেলমিনথিক আইভারম্যাকটিন ও অ্যান্টিবায়োটিক ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড দিয়ে। স্লেড পদ্ধতিতে প্রতিদিন ডায়ালাইসিস করানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের হেমাটোলজির অধ্যাপক মহিউদ্দিন আহমদ খানের পরামর্শে তিনবার প্লাজমা ট্রান্সফিউশন দেয়া হয়। প্লাজমা ট্রান্সফিউশনে রোগী উজ্জীবিত হন, প্রাণশক্তি বৃদ্ধি পায়। শিশু হাসপাতালের অধ্যাপক হানিফও একই পরামর্শ দিয়েছিলেন।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী সপ্তাহে তিনবার হেমোডায়ালাইসিস নিচ্ছেন চার বছর ধরে। সঙ্গে পাচ্ছেন উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা। গত বছর রোগী হেপাটাইটিস-সির জন্য Sofosbuvir ও Daclatasvir দিয়ে তিন মাস চিকিৎসা করিয়ে হেপাটাইটিস-সি মুক্ত হয়েছেন। তার একটা পুরনো মাইয়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন (এমআই) রয়েছে।
করোনা আক্রান্ত সব গণস্বাস্থ্য কর্মী গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের খরচে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অন্যান্য স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনা খরচে সব পরীক্ষা ও ফ্রি চিকিৎসা পেয়ে থাকেন। কর্মীকে কেবল খাওয়া খরচ বহন করতে হয়।
এ প্যাকেজে সব ওষুধের মূল্য, অক্সিজেন, রোগ নির্ণয় বিল, আইসিইউ ভাড়া, যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ফি ধরা আছে। অতিরিক্ত কোনো খরচ নেই। বিশেষজ্ঞরা দিনে রাতে যতবারই রোগীকে পরিদর্শন করবেন ও পরীক্ষা করবেন, অতিরিক্ত কোনো ফি চার্জ হবে না।
রোগ নির্ণীত হওয়ার পর রোগীকে প্রথম ১০ দিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়, পরবর্তী সময়ে রোগীকে কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। রোগী করোনামুক্ত হন ১৩ জুন, তবে এখনো কভিড-উত্তর পরিশ্রান্তি রোগে ভুগছেন এবং হাসপাতালে আছেন।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় অত্যধিক, যা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে: যা আগে বলা হয়েছে, নিজ পকেট থেকে চিকিৎসার জন্য ব্যয় পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রয়োজনে প্রথম দুই সপ্তাহ গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যায় চিকিৎসা দেয়া হয়। পরে রোগীর আর্থিক বিবেচনায় হয় কেবিনে কিংবা দরিদ্র রোগীকে সরাসরি জেনারেল ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়, যার চার্জ খুবই কম।
ওষুধ ও অক্সিজেন বাবদ ব্যয়
বাংলাদেশে ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য দুটি নিয়ম প্রচলিত আছে। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতি অনুসরণ করে সব ওষুধের পরিবর্তে মাত্র ১১৭টি ওষুধের মূল্য স্থির করে দেয় সরকার, যা এমআরপি (ম্যাক্সিমাম রিটেইল প্রাইস) বলে পরিচিত। বাকি সব ওষুধের মূল্য ওষুধ কোম্পানিগুলো সরাসরি নির্ধারণ করে কোম্পানির মর্জিমতো অধিক মূল্যে, এটাকে ইনডিকেটিভ প্রাইস (আইপি) পদ্ধতি বলা হয়। এখানেই সব সমস্যা।
নিবিড় পরিচর্যার প্রধান প্রয়োজন দ্রুত পর্যাপ্ত শরীরের প্রয়োজনমাফিক অক্সিজেন সংমিশ্রণ, অর্থাৎ প্রতি মিনিটে গড়ে ৬-১০ লিটার অক্সিজেনের ক্রমাগত অবাধ অব্যাহত সরবরাহ, অর্থাৎ আইসিইউ। প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টাই একজন রোগীকে অক্সিজেন দিতে হবে, তাতে দৈনিক অক্সিজেন ব্যয় হবে ১০ থেকে ১৫ হাজার লিটার। গড়ে ১২ হাজার লিটার, ৭-১০ দিন পর কম অক্সিজেন খরচ হয়। প্রতি ঘনমিটার (১০০০ লিটার) অক্সিজেনের ক্রয়মূল্য ৪৭ টাকা। মেডিকেল গ্যাস হিসেবে ব্যবহার উপযোগী অক্সিজেনের জন্য উত্পাদক জার্মান বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডসে ফ্যাক্টরিতে যাতায়াত, খালি সিলিন্ডার অক্সিজেনে ভর্তি করা, শ্রমিক সেবা, মূসক প্রভৃতি খরচ যোগ করলে প্রতি এক হাজার লিটার অক্সিজেনের ব্যয় দাঁড়ায় ৭০ টাকা। আইসিইউতে ১০ দিনে ব্যয় ৮ হাজার ৪০০ টাকার অক্সিজেন এবং কেবিনে ৪৩ দৈনিক অক্সিজেন ব্যয় অনূর্ধ্ব ৩ হাজার লিটার, অর্থাৎ ২১০ টাকা প্রতিদিন।
দ্রুত কঠিন প্রদাহ নিবারণে ব্যবহূত হয় অ্যান্টিবায়োটিক।
ইনজেকশন মেরুপেনাম, টেজো ব্যাকটাম+পিপারিসিলিন, সেটেপাইন, ভ্যানকো মাইসন, মক্সিফ্লক্সাসিন নেভোফ্লক্সোসিন, মেট্রোনিডাজল, ট্যাবলেট ডক্সিসাইক্লিন হাইড্রোক্লোরাইড, ট্যাবলেট লিনেজোলিড প্রভৃতি
শেষের কথা: সরল কথা
১. নিজ বাসায় পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায় আলাদা ঘরে থেকে সাধারণ চিকিৎসায় প্রায় ১০০ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে ওঠে। খরচ খুবই কম। গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের জি-প্যারাসিটামল (মূল্য প্রতি ট্যাবলেটের ৭০ পয়সা, জি-অ্যান্টিহিস্টামিন ২৫ পয়সা, জি-ভিটামিন সি ১ টাকা ৩০ পয়সা) ও স্টিম বাষ্প দিনে কয়েকবার ব্যবহার করুন, মধুও খাবেন।
২. হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিলে হাসপাতালবিশেষে খরচ দৈনিক ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। তবে নিরাময়ের হার দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৯০ শতাংশ।
৩. আইসিইউতে চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ব্যয় দিনে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, নামিদামি অপ্রমাণিত ও ক্ষতিকর ওষুধ ব্যবহারে এবং অপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরীক্ষায়। দেশের সব আইসিইউতে পর্যাপ্ত সেবার ব্যবস্থা নেই। আইসিইউতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পর্যাপ্ত জুনিয়র চিকিৎসক ও নার্স নেই; ব্যবহূত ওষুধের কার্যকারিতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জ্ঞান সীমিত এবং তারা দ্রুত দৌড়ে সেবা দিতে অভ্যস্ত নন। দেশের সেরা আইসিইউ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজীব মোহাম্মদকে দ্রুত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা প্রচলনের জন্য দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে।
স্মরণ রাখবেন চিকিৎসক ও সেবিকাদের অক্লান্ত সেবার পরও আইসিইউতে মৃত্যুহার খুব বেশি। আইসিইউতে মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ অতিক্রম করতে পারে।
৪. ওষুধ কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত আইপি প্রথা অনতিবিলম্বে বাতিল করে সরকার ১৯৮২ সালের ‘জাতীয় ওষুধ নীতি ১৯৮২’-এর পুরো অনুসরণ করে এবং সুনির্দিষ্টভাবে রোগ নির্ণয় পরীক্ষা ও অপারেশনের দর স্থির করে দিয়ে পুরোপুরি কার্যকর করে ওষুধের সর্বোচ্চ ক্রয়মূল্য ধার্য করলে ক্রয়ে এবং বিভিন্ন পরীক্ষার চার্জ অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ কমবে।
৫. সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে এবং সব ক্লিনিকের রেজিস্ট্রেশনের নিয়মাবলি সহজ হওয়া প্রয়োজন। সরকার ন্যূনতম যন্ত্রপাতির তালিকা স্থির করে দেবে, কয়জন ডাক্তার, কয়জন ডিপ্লোমা পাস নার্স থাকতে হবে—এ নিয়ে সরকারের কাগুজে নির্দেশনা কেবল দুর্নীতি বাড়াবে, বহু রিজেন্ট সাহেদ তৈরি করছে এবং আরো নতুন করে তৈরি হবে, সঙ্গে দুর্নীতি। প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ফি চিকিৎসক নিজে স্থির করবেন। এক্ষেত্রে সরকারের নাক না গলানোই উত্তম।
৬. সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে সব নাগরিকের সুলভে সহজে উন্নত মানের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্যতা। বাংলাদেশে সামাজিক শ্রেণীভিত্তিক জাতীয় স্বাস্থ্য বীমা বিবেচনার সময় এসেছে। কয়জন চিকিৎসক, কয়জন নার্স (সেবিকা) টেকনিশিয়ান দিয়ে ক্লিনিক চালাবেন, তা বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক মালিকরা স্থির করবেন। ব্যক্তি মালিকরা লাভ ও সেবা দুটোই ভালো বোঝেন।
(সংক্ষেপিত)
ডা. জাফরুল্লাহ্ চৌধুরী: ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র
শরিফুল হক রুমি: মেডিকেল অফিসার, গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল










