দেশে প্রতি বছর মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে বিল অব এন্ট্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির অর্থের পরিমাণ ৯ বিলিয়ন ডলার। মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি), ৫৬ শতাংশ। অবশিষ্ট ওভারডিউ ব্যক্তি খাতের। এর অর্থ দাঁড়ায়, যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তার সমমূল্যের পণ্য দেশে আসেনি অথবা এলেও তা ব্যাংককে জানানো হয়নি। আবার পণ্য এলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে সংশোধন করেনি। তবে ব্যাংকিং বিধি অনুযায়ী যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে, তার সমপরিমাণ মূল্যের পণ্য আসেনি। লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খুলে পণ্য আমদানির নামে অর্থ পাচারের ঘটনা সবার জানা। সাধারণত বিল অব এন্ট্রিতে যে পণ্যের কথা উল্লেখ থাকে বাস্তবে তার চেয়ে কম মূল্যের পণ্য আমদানি করা হয়। ফলে পণ্যমূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়। এ কারণেও বিল অব এন্ট্রি মেয়াদোত্তীর্ণ হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা—এক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কিনা। অনিয়ম হলে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হিসাবে গরমিল ও অসামঞ্জস্য থাকলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।
মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির পেছনে বেশকিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পণ্য আমদানির আগের ঘোষণার সঙ্গে আমদানি পণ্যের পরিমাণ ও অর্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্য থেকে বিল অব এন্ট্রির সমস্যা তৈরি হতে পারে। এছাড়া ডলারের মূল্যের ওঠানামা থেকেও হিসাবের সমস্যা তৈরি হতে পারে। আমদানিকারকরা সাধারণত পণ্য আমদানির আগে বাংলাদেশ ব্যাংককে কত পরিমাণ অর্থের কী পণ্য আমদানি করছে তার একটি ঘোষণা দিয়ে থাকে। পণ্য আমদানির পর অর্থ পরিশোধের সময় কম পরিশোধ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে তার সমন্বয় না করায় বিল অব এন্ট্রিতে অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। অনেকে এর সঙ্গে অর্থ পাচারের কিছু অনুষঙ্গ থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। খবরে প্রকাশ মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রি সবচেয়ে বেশি বিপিসির। জ্বালানি পণ্যের প্রধান দুটি খাতের মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, পেট্রোলিয়াম, অয়েল ও লুব্রিক্যান্টস। আমদানির নিয়মকানুন প্রতিপালনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের মতো সরকারি খাতকেও আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা না গেলে আমদানি প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা থেকে যায়। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও বঞ্চিত হতে হবে সরকারকে। কাস্টমস অ্যাক্ট ১৯৬৯-এর ধারা ২৫(৩)-এ বলা হয়েছে, ট্যারিফ মূল্যের চেয়ে ইনভয়েস মূল্য বেশি হলে অবশ্যই ইনভয়েস মূল্যেই শুল্কায়ন করতে হবে। কিন্তু বিপিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তবে পণ্য চালান শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ইনভয়েস জমা না দেয়ায় বিল অব এন্ট্রিতেই উল্লেখিত মূল্যে শুল্কায়ন করতে হচ্ছে। মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রির বিদ্যমান জটিলতা নিরসনে সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ রিপোর্টিং ব্যবস্থা শক্তিশালী এবং এর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ তথ্য না মেলার ফলে আগামপত্র ওভারডিউ থেকে যাচ্ছে। কেউ সমন্বয়ও করছে না। এটি অবশ্যই রিপোর্টিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে অদক্ষতা। পণ্য এসেছে কিন্তু ম্যাচ করেনি বলে ওভারডিউ দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি সুরাহা করা প্রয়োজন। সঠিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, পাচার করা অর্থের বেশির ভাগ অর্থাৎ ৮০ শতাংশেরও বেশি বৈদেশিক বাণিজ্যের মাধ্যমে পাচার হয়। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হচ্ছে এ ধরনের প্রতিবেদন বাংলাদেশের বিভিন্ন গবেষণায় ও সংবাদমাধ্যমেও উঠে এসেছে। এছাড়া বিএফআইইউ, দুদক ও সিআইডির যৌথ উদ্যোগে প্রণীত ‘বাংলাদেশের মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন ঝুঁকি নিরূপণ প্রতিবেদনে’ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং ও বিদেশে অর্থ পাচারকে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) থেকে অর্থ পাচারবিষয়ক চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফাইন্যান্সিয়াল ফ্লোজ টু অ্যান্ড ফ্রম ১৪৮ ডেভেলপিং কান্ট্রিজ: ২০০৬-২০১৫’ প্রতিবেদন অনুযায়ী ট্রেড মিসইনভয়েসিংয়ের (ব্যবসায় আমদানি-রফতানি মূল্য বেশি বা কম দেখানো) মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ বাইরে চলে গেছে এমন প্রথম ২০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৮তম। একইভাবে ওই প্রতিবেদনে ট্রেড মিসইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ দেশে প্রবেশ করেছে এমন প্রথম ৫০টি দেশের তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম রয়েছে। এক্ষেত্রে আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যে তদারকি বাড়ানো প্রয়োজন।
আমদানিকারকের বিল অব এন্ট্রি বা পণ্য দেশে আসার প্রমাণপত্র মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে তাদের ক্ষেত্রে নতুন এলসি না খুলতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিয়ে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্মকর্তারাও এ নির্দেশনা মানছেন না। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বিল অব এন্ট্রি মেয়াদোত্তীর্ণ থাকা সত্ত্বেও এলসি খোলা থেকে বিরত থাকছে না সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা আছে, পরিশোধিত আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে অনিষ্পন্ন বিলের কেস নিষ্পত্তি করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানোর আগে অনুমতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিষ্পন্ন কেসের পক্ষে বিল অব এন্ট্রি কপিসহ অনুমতির পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হবে। বিদ্যমান বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন ব্যবস্থায় অনুসৃত পদ্ধতিতে পরিশোধিত আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে অনিষ্পন্ন বিল এন্ট্রি-সংশ্লিষ্ট কেস অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগে পাঠানো হচ্ছে। নিষ্পত্তির জন্য বিবেচনাধীন এসব অনিষ্পন্ন কেসের সপক্ষে বিল অব এন্ট্রি প্রাপ্তিসাপেক্ষ সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক শাখা থেকে ম্যাচিং সম্পাদন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে বিল অব এন্ট্রির কপিসহ বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগকে অবহিত করতে হবে। ১২০ দিনের ওপরে ওভারডিউ থাকলে পরের ঋণপত্র আর খুলতে পারে না। বিপিসি সরকারি সংস্থা বিধায় বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়, যা কাজে লাগিয়ে ওভারডিউ থাকলেও পরবর্তী সময়ে ঋণপত্র খুলতে পারে। মিসম্যাচটা দূর হলে ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিংয়ের জন্য সুবিধা হয়। আমদানির মোট পরিমাণটা হিসাব করা সুবিধা হয়। শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা যায়। আমদানি শৃঙ্খলা নিশ্চিতের জন্যই এখন কঠোরতা অবলম্বন করা হচ্ছে, যাতে তথ্যগুলো সঠিক থাকে। সময়মতো বিল অব এন্ট্রি জমা দেয়া না হলে হিসাবায়নে অসামঞ্জস্য থেকে যায়। এটা কমিয়ে আনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবিধা ও গতিশীলতা আনয়নের জন্য বিল অব এন্ট্রিতে শিথিলতা এনেছিল। ২০২০ সালে জারি করা এক নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, শুল্ক কর্তৃপক্ষের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বিল অব এন্ট্রি সংগ্রহ করবে আমদানিকারকের ব্যাংক। আমদানির বিপরীতে যে মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে, তা মিলিয়ে দেখবে। এক্ষেত্রে শুল্ক-কর পরিশোধ বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে ব্যাংকগুলোকে। আমদানি দায় পরিশোধের বিপরীতে পণ্য দেশে আসা নিশ্চিতে কাগুজে বিল অব এন্ট্রি দাখিলে ব্যবসায়ীদের বাধ্যবাধকতা এর মাধ্যমে শিথিল করা হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রি বৃদ্ধির পেছনে এর কোনো প্রভাব রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মেয়াদোত্তীর্ণ বিল অব এন্ট্রি সমন্বয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড তদন্তপূর্বক কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।










