ভোগের মোহ থেকে মুক্ত মানুষ-এ এক অসম্ভব কল্পকথা । কিন্তু জীবনটাই যদি ভোগসর্বস্ব হয়ে যায় মানুষের; তাহলেই বিপদ । এরুপ জীবনবোধের সহায়ক ও নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রব্যবস্থার সরকার-সমাজ-পরিবার কাঠামো ও আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তি মানস গড়ে উঠেছে পৃথিবীর প্রায় সবখানে । রাষ্ট্রগুলোর নীতি, বিধি-বিধান এবং সেগুলোর রাজনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক, সামাজিক চর্চা ও প্রয়োগের একটা কৌশলী ‘মানদন্ড’ তৈরী হয়ে গেছে ভোগবাদিতাকে মুখ্য করে ।
ভোগবাদিতার এই মনস্তত্ত্ব ও মানদন্ড আবির্ভাব বা আবিস্কারের মতো কোনো বিষয় নয়।এর জন্য রাষ্ট্রকাঠামোর দীর্ঘদিনের নিবিড় পৃষ্ঠপোষকতা ও সুনিপুণ পরিচর্যার প্রয়োজন হয় । সেটিই হয়েছে-হচ্ছে পৃথিবীজুড়ে পুঁজিতন্ত্রের বিকাশের মাধ্যমে বা বাজার অর্থনীতির চিত্তাকর্ষক ‘সমৃদ্ধিময়’ উপস্থাপন ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রচারণার মাধ্যমে। ভোগের মোহকে কেন্দ্র করে গন্তব্যহীন দৌড় ও প্রতিযোগিতার কায়িক ও মানসিক শ্রমের ঘোরে বৃত্তাবদ্ধ হয়ে গেছে মানুষ। সামষ্টিকতো বটেই, একেকটি জীবনের যাপন ও অবসানও হয়ে যায় অলক্ষ্যে এই ঘোরের বৃত্তের মধ্যে থেকেই ।
বাজার অর্থনীতির সমাজ ব্যবস্থা বা পুঁজিবাদের ধারক-বাহক-প্রচারক কলেবরের সকল বহুরুপী কুশীলবদের এটাই সার্থকতা ।
মানুষ জীবন কাটিয়ে দেয়, এই ভোগ নামক নগদ প্রাপ্তির আশায় । কদাচিৎ কোনোভাবে কারো এর প্রাপ্তি ঘটলে নিজেকে সফল, সৌভাগ্যবান ও সেই শ্রেণীভূক্তির কৌলিন্যের শ্লাঘায় গর্ববোধ করে এবং আচরণ-অভ্যাসেও বদল ঘটে । কিন্তু এই প্রাপ্তি ঘটে না বেশীরভাগেরই-তবু ছুটতে থাকে নিরবধি ও উপলব্ধিতে কিছু আসার আগেই অনেকে হাঁপিয়ে উঠে অদৃষ্টকে দোষারোপ করে অথবা অনেকের জীবনটাই ফুরিয়ে যায় ধুঁকতে ধুঁকতে। তবু বুঝে উঠতে পারে না এবং কেউ কেউ বুঝেও বলার সুযোগ বা অধিকারটাই পায় না যে - ‘চাপিয়ে দেয়া চর্চিত ব্যবস্থাটাই মিথ্যা, প্রতারণা, ভুল ও অকল্যাণকর’।
মানুষের চাহিদা নিবারণের প্রয়োজনীয়তাকে অবলম্বন করে দিনে দিনে তৈরী হয়েছে এই ভোগসর্বস্ব আত্মকেন্দ্রিক সমাজকাঠামো । এর বাইরে মানুষের সার্বিক সত্যিকারের কল্যাণ এবং মানুষের জীবনের মূল্যবোধ, জীবনযাপন মানের সমতা ও মর্যাদার মতবাদ-তত্ত্ব কিছু মহান মানুষ রেখে গেছেন। কিন্তু সমস্যা সেখানেও । সে সমস্যা চর্চায় ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ; ওখানেও প্রায়োগিক বাস্তবতা সাধারণ মানুষের জন্য কল্যাণমূখী মর্যাদাপূর্ণ সমতাভিত্তিক থাকে নি। সে ক্ষেত্রেও ক্ষমতাকেন্দ্রিক, সম্পদকেন্দ্রিক এলিট শ্রেণী তৈরী হয়েছিল ; বৈষম্য বঞ্চনার শিকার আবারও সেই সাধারণ মানুষ। ফলাফল, ব্যবস্থাগুলো টেকেনি। উদাহরণ, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন । ফলে অসাড়তার অপবাদ নিতে হয়েছে- হচ্ছে মতাদর্শকে , তত্ত্বকে ।
ভিন্ন উদাহরণ, ইরান- ধর্মীয় বিপ্লবের কঠোর শাসনতান্ত্রিক প্রয়োগও সেখানে মানুষের জন্য কোন সুফল বয়ে আনে নি। বর্তমানে সেদেশে ৭০% জনগণ দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে।
এখন সারা পৃথিবীব্যাপী জেঁকে বসেছে পুঁজিতন্ত্র। খুব বাড়-বাড়ন্ত বাজার অর্থনীতির ।মানুষও সহজভাবে এই বিদ্যমান ব্যবস্থার মধ্যেই একধরণের মুক্তি বা লাভ খোঁজে । এই লাভ ভোগের, এই লাভ একেবারে আত্মকেন্দ্রিক-ভয়ানক স্বার্থান্ধ।
মানুষ ভাবে না অথবা ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, এই ব্যবস্থায় তার নিজের স্বার্থটাও নিশ্চিত করার কোনো পথ নেই। বেশীরভাগ মানুষেরই মৌলিক চাহিদাগুলোও পূরণ হয় না এই কারসাজির অর্থনীতি, পুঁজিবাদ, লুটতন্ত্র ও নগদ লাভমুখী ব্যবস্থায়। মহামারী-দুর্যোগে মানুষ আরো অসহায় হয়ে পড়ে এই ভোগ মোহগ্রস্ত প্রতারণার কাঠামোতে।
এই কাঠামোতে যেমন নগ্ন,দৃশ্যমান, সস্তা, লোকপ্রিয় কর্মকান্ড আছে তেমনি প্রকাশ্য ক্ষমতাকেন্দ্রিকতার আপাত: বাইরের সুধীজনদের অংশগ্রহণও আছে।এরা প্রচার মাধ্যমে- সর্বত্র সরব ও দাপুটে ; এদের মধ্যে অর্থনীতি-বাজার-ব্যাংক ব্যবস্থা-স্বাস্থ্য-শিক্ষা-খাবার- নিরাপত্তা-পরিবেশ- আইন কানুন শৃঙ্খলা-উন্নয়ন সহ বহুমূখী বিষয়ে গবেষক বিশেষজ্ঞরা আছেন, অনেকক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবেও আছেন। এই ‘বিদগ্ধ’ শ্রেণীর উপস্থিতি, আলোচনা, লেখালেখি সরলভাবে মনে হবে জনকল্যাণ মুখী । কিন্তু ভালো করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এরা বিদ্যমান বাজার অর্থনীতির ভোগসর্বস্ব সমাজ ব্যবস্থা জিইয়ে রাখার পক্ষের প্রবল সামাজিক শক্তি। এরা ক্ষমতার দৃশ্যমান রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও ভয়ানক। এরা নিত্য-নতুন কলাকৌশলে-তত্ত্বে-তথ্যে মানুষকে ভাবতে শেখাতে পারে-‘মন্দ কি, ভালোই তো, আমাদের কথাই তো বলা হচ্ছে’।
পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এই ফাঁদে পড়ে গেছে। এতে মানুষের ভোগের লালসাও পূরণ হয় না এবং সুস্থ মর্যাদাশীল স্বাধীন চিন্তার মানবিক জীবন সুদূর পরাহত রয়ে যায়। জীবন হয়ে যায় নতুন যুগের আধুনিক বঞ্চনা বৈষম্যের আখ্যান।
এরূপ পরিস্থিতির একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন এ সময়ের তুমুল আলোচিত রাজনৈতিক দার্শনিক-ভাষাবিদ নোয়াম চমস্কি—
“ রাষ্ট্রীয় প্রোপাগান্ডা যখন শিক্ষিত শ্রেণীর দ্বারা সমর্থিত হয় এবং সেই প্রোপাগান্ডার বাইরে কোনো স্বাধীন চিন্তাকে প্রকাশ করতে দেয়া হয় না তার প্রভাব হয় ভয়াবহ। হিটলার এবং আরো অনেক ডিক্টেটরের কাছ থেকে এই শিক্ষা নেয়া, যা এখন পর্যন্ত চলছে”।
পৃথিবীর মানুষের জন্য প্রয়োজন, সাম্যের মতাদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং সে ব্যবস্থা হতে হবে চর্চায়-প্রায়োগিকতায় সৎ ও কার্যকর । যাতে করে মানুষ এই প্রতারণার জাল ও অবিরত চর্চিত মিথ্যার ফাঁদ থেকে এবং বাজার অর্থনীতির সর্বনাশা ভোগসর্বস্ব জীবনের বুদবুদের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। গড়ে উঠে ন্যায্য, মর্যাদাপূর্ণ, সমতাভিত্তিক, স্বাধীন, কল্যাণকর,বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার সমাজ।
সেটি হতে হবে মানুষের সত্যিকারের মুক্তির জন্যই।
মোতাহার হোসেন চৌধুরী
ddc99bd@gmail.com










