২০২২ সালজুড়ে উন্নত অর্থনীতি ও উদীয়মান বাজারগুলোয় মূল্যস্ফীতির তীব্র উত্থান ঘটেছে। এক্ষেত্রে কাঠামোবদ্ধ প্রবণতা সমস্যার ক্ষণস্থায়িত্বের চেয়ে সাধারণ হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে অনেক দেশ এখন বিভিন্ন যুদ্ধে লিপ্ত। এর মধ্যে কিছুটা বাস্তব, কিছুটা রূপক, যা বড় রাজস্ব ঘাটতি, ঋণ হালনাগাদ এবং উচ্চমূল্যস্ফীতির দিকে ধাবিত করছে।  

বিশ্ব এখন ভূ-রাজনৈতিক বিষণ্নতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে পশ্চিম এবং শ্রেণীবদ্ধ (যারা মিত্র নয়) চীন, রাশিয়া, ইরান, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তানের মতো শোধনবাদী শক্তির মধ্যে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা সূচ্যগ্রে অবস্থান করছে। এক্ষেত্রে শীতল ও উষ্ণ যুদ্ধ বেড়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার নিষ্ঠুর আক্রমণ এখনো বাড়তে পারে এবং এখানে ন্যাটোর জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে। ইসরায়েল এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র হওয়ার প্রান্তিক সীমায় থাকা ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষের পথেই রয়েছে। এদিকে বিস্তৃতভাবে মধ্যপ্রাচ্য চূর্ণ ব্যারেলে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও চীন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে যে এশিয়ায় কে কর্তৃত্ব করবে? যেখানে তাইওয়ানকে ভবিষ্যতে জোরপূর্বক মূল ভূমির সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত করার বিষয়টি রয়েছে।

এমন প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ন্যাটো পুনরায় সশস্ত্র ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, এর মধ্যে জাপানও রয়েছে। দেশটি কয়েক দশক ধরে বৃহত্তম সেনাবাহিনী নির্মাণ শুরু করেছে। প্রচলিত ও অপ্রচলিত অস্ত্রের জন্য সর্বোচ্চ ব্যয় করেছে (যার মধ্যে পরমাণু, সাইবার, বায়ো এবং কেমিক্যাল অস্ত্র রয়েছে)। নিশ্চিতভাবে এসব ব্যয় জনগণের অর্থ থেকেই করা হয়েছে।

অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক যুদ্ধ সরকারি ও বেসরকারি খাতের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন এবং অভিযোজনের ক্ষেত্রে আগামী দশকে প্রতি বছরের জন্য ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। এটা ভাবা খুব অর্থহীন ব্যাপার যে এসব বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি বাড়াবে। প্রকৃত যুদ্ধের পর একটি দেশের অবকাঠামোগত পুঁজি যেভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, বিনিয়োগ প্রবাহ তখন অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে। তবু সে দেশটি সম্পদের বৃহৎ অংশ হারিয়ে ফেলায় অত্যধিক দরিদ্র হয়ে পড়ে।

এটি জলবায়ু বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সত্য। বিদ্যমান মূলধনের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিস্থাপিত করার প্রয়োজন হবে। কারণ এটি পুরনো হয়ে গেছে অথবা জলবায়ুকেন্দ্রিক ঘটনায় বিলীন হয়েছে। 

আমরা বর্তমানে ভবিষ্যৎ মহামারীর বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল যুদ্ধে লিপ্ত। বিভিন্ন কারণে এর কিছু জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে মহামারী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এমন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘন ঘন দেখা দেবে। ফলে দেশগুলো রোগ প্রতিরোধে বিনিয়োগ করছে অথবা রোগ প্রকাশের পর ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সন্ধিক্ষণে স্থায়ী ভিত্তিতে উচ্চমূল্যে প্রতিষেধকে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে। সত্য প্রকাশের পর এ সবকিছুই ক্রমবর্ধমান বোঝা হিসেবে যুক্ত হচ্ছে যা সামাজিক বার্ধক্য এবং স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে সেবা পাওয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এরই মধ্যে এ অন্তর্নিহিত চলতি ঋণের বোঝা অধিকাংশ উন্নত অর্থনীতিতে স্পষ্ট আন্তর্জাতিক ঋণ মাত্রার অতি নিকটে অবস্থান করছে বলে ধরে নেয়া হচ্ছে।

অধিকন্তু গোঁড়ামিপূর্ণ ঐক্যনাশক প্রভাবের বিরুদ্ধে আমাদের অভিন্নতা সন্ধান বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বিশ্বায়ন এবং স্বয়ংক্রিয়তা (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিকসও অন্তর্ভুক্ত) নীল এবং সাদা কলারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার ভীতি প্রদর্শন করছে। এক্ষেত্রে যারা পেছনে পড়বে তাদের সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে সরকারগুলো চাপের মধ্যে থাকবে, যা মৌলিক উপার্জন স্কিম, বৃহৎ রাজস্ব স্থানান্তর অথবা ব্যাপক বৃদ্ধি পাওয়া সরকারি সেবার মাধ্যমে প্রকাশ পাবে।

এ খরচগুলো বড় আকারেই থাকবে, এমনকি স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রবাহে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা রাখে। উদাহরণ হিসেবে ন্যূনতম সর্বজনীন মৌলিক উপার্জন প্রতি মাসে ১ হাজার ডলার হওয়াকে সমর্থন করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশের সমান হবে।

সর্বোপরি আমরা অবশ্যই উপার্জন এবং সম্পদের অসমতা বৃদ্ধি পাওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করব, এটি জরুরি এবং সম্পর্কিত। অন্যথায় যুবসমাজের কষ্টদায়ক অস্থিরতা ও অনেক মধ্য এবং শ্রমিক শ্রেণীর কাজ উদার গণতন্ত্র এবং মুক্তবাজার পুঁজির বিপক্ষে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করবে। ক্ষমতায় আসা ও বেপরোয়া অনুসরণ, অস্থিতিশীল আর্থিক নীতি, উদার গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদের মুক্তবাজার থেকে জনপ্রিয় শাসনকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে যুবকদের সামাজিক নিরাপত্তাজাল শক্তিশালী করার জন্য ভাগ্য অতিবাহিত করা প্রয়োজন, যা অনেকে এরই মধ্যে করছে। 

এ পাঁচটি যুদ্ধ ব্যয়বহুল হবে, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণ সরকারের সক্ষমতাকে উচ্চ করের মধ্যে সীমাবদ্ধ করবে। কর থেকে জিডিপি অনুপাত এরই মধ্যে অধিকাংশ অগ্রসর অর্থনীতিতে উচ্চ-অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলোয় কর ফাঁকি দেয়া, পরিহার ও সালিশি অধিক উপার্জন এবং পুঁজির ওপর কর বৃদ্ধি পাওয়ার পরবর্তী প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলবে। (কল্পনা করা যায় এ পরিমাপটি লবিস্টদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছিল এবং মধ্য ডান পক্ষের কাছ থেকে লেনদেন নিরাপদ করেছিল)

যদিও এসব প্রয়োজনীয় যুদ্ধ সরকারের খরচ বাড়িয়েছে এবং জিডিপির অংশ হস্তান্তর করছে এবং সামঞ্জস্যপূর্ণতা ছাড়াই কর আদায় বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে কাঠামোগত বাজেট ঘাটতি যা এরই মধ্যে যে অবস্থানে রয়েছে, পরবর্তী সময়ে সে অবস্থানের তুলনায় বৃহৎ আকারে বৃদ্ধি পাবে। সম্ভাব্যভাবে এটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিকূল অনিবার্য প্রভাবের সঙ্গে অস্থিতিশীল ঋণ অনুপাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা ঋণের মূল্য বৃদ্ধি ও ঋণ সংকটকে চূড়ান্ত করবে। 

এক্ষেত্রে সে দেশগুলোর জন্য যারা তাদের নিজস্ব মুদ্রা ধার করে, তাদের জন্য উচ্চতর মূল্যবৃদ্ধি অনুমোদনের উপযুক্ত উপায় হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি নির্দিষ্ট মূল্যের নামমাত্র ঋণের প্রকৃত মূল্য হ্রাস করা। এ পন্থা সঞ্চয়কারী ও ঋণ প্রদানকারীর বিপক্ষে এবং ঋণগ্রহীতা এবং দেনাদারের পক্ষে পুঁজি ধার্য করার মতো কাজ করে। এটি সম্পূরক, অর্থনৈতিক নিগ্রহের মতো কঠোর পরিমাপ, পুঁজির ওপর কর এবং পুরোদস্তুর ত্রুটির ক্ষেত্রে সমন্বিত হতে পারে (যে দেশগুলো বিদেশী মুদ্রা থেকে ধার করে অথবা যাদের ঋণ ব্যাপকভাবে স্বল্পমেয়াদি কিংবা মূল্যস্ফীতির দায়ে সূচিত)। কারণ করারোপের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতির কর সূক্ষ্ম এবং গোপনীয়। এক্ষেত্রে আইনানুগ এবং নির্বাহী অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। এটি ন্যূনতম প্রতিরোধের ত্রুটিযুক্ত পথ, যখন ঘাটতি এবং ঋণ অস্থিতিশীলভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আমি প্রাথমিকভাবে চাহিদার কারণের প্রতি মনোযোগ আকৃষ্ট করতে চাই, যা উচ্চতর ব্যয়, ঘাটতি, ঋণ নগদীকরণ এবং মূল্যস্ফীতির দিকে ধাবিত করবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সমষ্টিগত সরবরাহে অনেক মধ্যমেয়াদি নেতিবাচক ধাক্কা রয়েছে, যা বর্তমানের মূল্যস্ফীতিমূলক চাপ, মন্দার ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং ঋণ সংকটের প্রবাহে নতুন সংযুক্তি ঘটাবে। সব মিলিয়ে বলা যায় সংযমের মহৎ গুণ মৃত্যুবরণ করার পর সমাধিস্থ হয়ে গেছে, তাই বিরাট মূল্যস্ফীতির বোঝা আমাদের ওপর চেপে বসেছে। 

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]


নওরিয়েল রৌবিনি: নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং অ্যাটলাস ক্যাপিটাল টিমের প্রধান অর্থনীতিবিদ    

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: তৌফিকুল ইসলাম