গত ছয় বছরে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ব্যাংকিং খাতে সম্পদের আয় সবচেয়ে বেশি কমেছে বাংলাদেশে, একই সময়ে দেশের ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যয়ও কমেছে ২ শতাংশের বেশি। আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারক সংস্থা মুডি’সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সন্দেহ নেই, গেল কয়েক বছরে দেশের ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিসহ অন্যান্য অব্যবস্থাপনার প্রভাব এটি। প্রকৃত অর্থে ব্যাংকিং খাত নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে থেকেই বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল। নতুন করে এ সংকট তৈরি হওয়ায় অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। করোনার কারণে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বন্ধ আছে। ফলে ঋণের প্রবাহ নেই। কারণ উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে কী করবেন? আর ঋণপ্রবাহ না থাকায় ব্যাংকের আয় কমে যাবে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাতে সমস্যা আরো প্রকট হবে। তাছাড়া করোনার কারণে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার অবস্থা এখন নেই। ফলে নতুন করে কোনো ঋণ আদায়ও হবে না। এতে ব্যাংকের আয়ে আরো এক ধাপ প্রভাব পড়বে। এছাড়া ব্যাংকের ডিপোজিট অনেক দিন ধরেই কমছে, এটা আরো কমে যাবে। এখন কেউ ব্যাংকে টাকা রাখতে যাচ্ছে না; বরং যাচ্ছে টাকা ওঠাতে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাত অদূরভবিষ্যতে এক ধরনের তারল্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ব্যাংকভিত্তিক। ব্যাংকিং খাত বিপর্যস্ত হলে অর্থনীতির জন্য করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে উঠে দাঁড়ানো অত্যন্ত কঠিন হবে। উন্নত দেশগুলোর মতো নয়, বরং বাংলাদেশের বেসরকারি পর্যায়ের বিনিয়োগ সম্পূর্ণরূপে ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি খাতও ব্যাংকিং খাতকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ঋণের উৎস হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। সারা বিশ্বে শেয়ারবাজারের ধস আর্থিক খাত বিপর্যয়ের প্রাথমিক সংকেত। বাংলাদেশের ছোট আকারের আর্থিক বাজার এবং এর দরপতনের প্রভাব অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ মনে না হলেও সার্বিক পরিস্থিতি মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকিং খাতে এ ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা ও বিপর্যয়ের প্রভাব একটু দেরিতে প্রকাশিত ও প্রতিফলিত হয়। সুতরাং বিশ্ব ও বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য এ পরিস্থিতি শুধু শুরুর ধাক্কা। করোনা পরিস্থিতির সমূহ ভয়াবহতা ব্যাংকিং খাতকে বড় ধরনের বিপর্যয় মোকাবেলা করাতে বাধ্য করতে পারে। ঋণঝুঁকি মোকাবেলাসংক্রান্ত পরিস্থিতিতে সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো বেশ নাজুক সময় অতিবাহিত করছে। এ খাত সংশোধন ও পরিবর্ধন প্রচেষ্টার মাঝেই করোনা পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক খাত থেকে করোনা প্রতিরোধে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে বাধ্য করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টতা উন্নত দেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়, যেখানে দেশের আর্থিক খাত বলতে মূলত ব্যাংকিং খাতকে বোঝানো হয়। এ পরিস্থিতিতে সংবেদনশীল এ খাতটিকে আগলে রেখে করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলে উঠবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, এমনটাই কাম্য।

আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের হার, মূলধনের জোগান, সুদহার, তারল্য পরিস্থিতি, মুদ্রার বিনিময় হার—এই পাঁচটি সূচকে দেশের ব্যাংকগুলোর অবস্থান আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেকটা দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ব্যাংকিং খাতের এই দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য বাড়তি ফি দিতে হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি, মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ, তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, সুদহার ও মুদ্রা বিনিময় হারে ব্যাপক ওঠানামায় সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাই ফুটে ওঠে। আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণের হার থাকতে হবে কমপক্ষে সাড়ে ১২ শতাংশ। আন্তর্জাতিকভাবে খেলাপি ঋণের হার ৩ শতাংশের নিচে হলে ঝুঁকিপূর্ণ আওতার বাইরে ধরা হয়। বাংলাদেশে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি। আন্তর্জাতিকভাবে সুদহার কমানো বা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিকতা রাখতে হয়। খুব সামান্য হারে কমাতে বা বাড়াতে হয়। ঋণ ও আমানত ব্যবস্থাপনা এমনভাবে করতে হয়, যাতে তারল্য পরিস্থিতি সবসময় স্বাভাবিক থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বেশির ভাগ সময়ই এটি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকছে না। ব্যাংকিং খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনার এই প্রবণতাকে বড় ধরনের ঝুঁকি বলে মনে করা হয়। মুদ্রার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, রফতানি আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা, রেমিট্যান্সপ্রবাহের গতি স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব হয়; যা পুরো অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়-ব্যয়ে ভারসাম্য রক্ষিত হয়। কয়েক বছর ধরে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার অতিরিক্ত মাত্রায় ওঠানামা করছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এসব ক্ষেত্রে ভারসাম্যহীন হলে ব্যাংকের সম্পদের বিপরীতে আয় কমে যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে মুনাফায়। ফলে শেয়ারহোল্ডারদের মুনাফা কমে যায়। আমানতকারী ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিদেশী ব্যাংকগুলো যেকোনো দেশের ব্যাংকের এলসি গ্রহণের ক্ষেত্রে বা বৈদেশিক কোনো লেনদেনের বিষয়ে গ্যারান্টি দিতে গেলে এসব বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়। এগুলো কোনোটায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে বিদেশী ব্যাংকগুলো এলসি গ্রহণ করতে চায় না; কোনো ব্যাংক গ্রহণ করলেও তৃতীয় কোনো ব্যাংকের গ্যারান্টি চায়। এতে ব্যবসার খরচ বেড়ে যায়। একটি দেশের ব্যাংকিং খাত ভেঙে পড়লে অর্থনীতি সচল থাকার সুযোগ নেই। নভেল করোনাভাইরাস-পূর্ববর্তী অবস্থা ভালো ছিল না মোটেই। তখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল দেশের ব্যাংকিং খাত। এখন করোনার আচমকা আঘাতে সঙ্গিন ব্যাংকিং খাতও। এ অবস্থা থেকে বের হতে হলে টাকার প্রবাহ যেমন লাগবে, তেমনি খেলাপি ঋণ আদায় করাসহ নতুন ঋণ যেন খেলাপি না হয়, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিতে হবে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিদ্যমান আইনের সংস্কার প্রয়োজন এবং তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি আরো জোরদার করতে হবে।

ব্যাংকিং খাত আজ সমস্যায় জর্জরিত। সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম সুশাসনের ঘাটতি। ব্যাংকিং খাতে কারসাজি, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, পরিচালকদের মধ্যে আন্তঃব্যাংক ঋণ আদান-প্রদান, ব্যাংক পরিচালনা থেকে শুরু করে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে ব্যাংকিং খাতে। এসব সমস্যা সমাধানে ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রত্যাশা করে সবাই। ব্যাংকিং খাতের জন্য যেসব নীতিমালা, আইনকানুন, আন্তর্জাতিক রীতি আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পালন করা হচ্ছে না। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাংকি খাত জড়িত। ভুললে চলবে না, ব্যাংকিং খাতে সৃশৃংখলা প্রতিষ্ঠা ছাড়া মহামারী মোকাবেলা করে অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা যাবে না। আর্থিক কাঠামো দুর্বল হবে। ব্যাংকিং খাতের এই দুর্দশা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। সঠিক ব্যবস্থাপনার মধ্যে এ সেক্টরকে নিয়ে আসা এখন খুবই জরুরি।