সময়ের বৃক্ষ থেকে আরো একটি পত্র ঝরে যাবে আজ। যবনিকা পতন হবে ২০১৯ সালের। শুরু হবে নতুন বছর ২০২০। পৃথিবীর ও বৃহত্তর মানবজীবনের পথপরিক্রমায় ৩৬৫ দিন নিশ্চিতভাবে পরমাণুসম ক্ষুদ্র, একটি দেশ বা সমাজের সার্বিক বিবর্তনেও একটি বছর তেমন কিছু নয়, একজন ব্যক্তিমানুষের পুরো জীবন বলয়েও হয়তো একটি বছরের সামগ্রিক গুরুত্ব তেমন একটা বড় নয়, তবু প্রতিটি বছরই তার নিজস্ব তাত্পর্যে ভাস্বর যেমন পুরো পৃথিবীর জন্য, তেমনি একটি দেশ বা সমাজের জন্য এবং সেই সঙ্গে একজন ব্যক্তিমানুষের জন্য।

এই যে ১৯৬৯ সাল। মানুষ প্রথম চাঁদে পা রাখল—ইতিহাস সৃষ্টি হয়ে গেল সারা পৃথিবী আর মানবসভ্যতার জন্য। আর কোনো বছর এই অভূতপূর্ব অর্জনের ওপর দাবি রাখতে পারবে না; ওটা শুধু ১৯৬৯-এর। তেমনি ১৯৮৯ বার্লিন দেয়ালের পতন। পূর্ব আর পশ্চিম জার্মানি মিলে অখণ্ড জার্মানি হয়ে গেল। অন্য কোনো বছর চিহ্নিত হবে না এ অভাবিত ঘটনার জন্য; ওটা ১৯৮৯-এর। তেমনি প্রতিটি ব্যক্তিমানুষের জীবনেও কোনো কোনো বছর হিরন্ময় স্মৃতি হয়ে থাকে সুখের কারণে অথবা ধূসর পর্দা হয়ে থাকে ‘পাতার নিচে, ছাতার মতো’ পরম ব্যাপ্ত দুঃখময় স্মৃতির কারণে।

প্রায়ই বহু মানুষকে বছরের শেষে বলতে শুনি, ‘হায়, আরো একটা বছর ঝরে গেল জীবন থেকে’—উক্তির সঙ্গে বেরিয়ে আসে বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। কেউ কেউ আবার এমনও বলেন, ‘মৃত্যুর দিকে আরো এক পা এগোলাম।’ এসব মানুষের জন্য চলে যাওয়া বছর একটি ক্ষয়। আমার জন্য শেষ হয়ে যাওয়া বছর একটি প্রাপ্তি। আমি ভাবি, ‘জীবন ভারি সুন্দর। ইস ভাগ্যিস বিগত বছরটা পেয়েছিলাম জীবনে। তা না হলে এতসব নতুন মানুষের দেখা পেতাম কি আমার জীবনে, নতুন করে জানা হতো কি পুরনো মানুষদের, যেতে পারতাম কি নতুন নতুন জায়গায়, জানতে পারতাম কি যা ছিল অজানা? কতটা দিয়ে গেল আমাকে পুরনো বছরটা!’

শেষ হয়ে এল ২০১৯। পৃথিবীতে কত বদল হয়েছে এ বছরে, ঘটেছে কত পরিবর্তন নানা দেশে, সমাজে। ওইসব পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মতো ভাবি, ব্যাখ্যা খুঁজি। জানি যে এসবের প্রভাব আমার জীবনেও পড়বে। কিন্তু বাইরের বৃহত্তর পৃথিবীর পরিবর্তনে ততটা আন্দোলিত হই না, যতটা হই আমার নিজস্ব পৃথিবীর বদলে।

এর কারণ হয়তো নানা রকম—বাইরের পৃথিবীর পরিবর্তন অনেক সময়েই নৈর্ব্যক্তিক দূরের জিনিস বলে মনে হয়, আমার পৃথিবীর বদলগুলো আমার ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে বাস্তব বিষয় বলে মনে হয়; বাইরের পৃথিবীর ঘটনাগুলো বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে অনুধাবন করতে পারি, আমার পৃথিবীর জিনিসগুলো হূদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পারি। তাই যেকোনো বছরকে আমি মূলত দেখি আমার পৃথিবীর আরশিতে।

কী নিয়ে আমার পৃথিবী? আমার অতি প্রিয়জনেরা, আমার কাজ, আমার পারিপার্শ্বিকতা—এ নিয়েই তো আমার পৃথিবী। আমার পৃথিবী আমাকে ধারণ করে আছে এবং আমিও আমার পৃথিবীকে ধারণ করে আছি।