সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানের শিখা প্রজ্বালন দেখলেই প্রাচীন মানুষের কথা মনে পড়ে। আহা! প্রাচীন মানুষকে আগুন জ্বালাতে কত কষ্টই না করতে হতো! শেষে তারা বুদ্ধি করল যে আগুনকে নিভতে দেয়া যাবে না। ব্যস, আগুন একবার জ্বালানোর পর তা আর নিভতে দিত না। খুব ছোটবেলায় আমিও দেখেছি রাতে রান্না শেষে নানি/দাদিরা মাটির চুলায় কাঠ/বাঁশ গুঁজে রাখতেন। ভোরে সেই ছাইচাপা আগুন থেকে ফুঁ দিয়ে ফুঁ দিয়ে আগুন ধরাতেন।

জ্বালানি হিসেবে আগুনের ব্যবহার মানুষের প্রথমদিককার বৌদ্ধিক প্রচেষ্টার ফসল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আগুনের উৎস পাল্টে গেছে। কয়লা, গ্যাস ও বিদ্যুতের পর নতুন উৎস খুঁজছে মানুষ। যন্ত্রসভ্যতার উন্নতির ফলে শক্তির রূপান্তর সহজ হয়েছে। রাতে ঘর আলোকিত করার জন্য আগুন জ্বালাতে হয় না। আগুন না জ্বালিয়ে আরো অনেক কাজ করা যায়। যেমন পানি গরম করতে ওয়াটার হিটারকে আগুন জ্বালাতে হয় না। মাইক্রোওভেনে খাবার গরম করতে আগুন জ্বালাতে হয় না। এমনকি প্রেসার কুকারে ভাত বা মাছ/মাংস রান্না করতেও আগুন জ্বালাতে হয় না। কিন্তু এসব করতে একটা জিনিস অত্যাবশ্যক, তা হচ্ছে জ্বালানি। বাঁশ/কাঠের যুগ অনেক আগে শেষ হয়েছে। কয়লা/গ্যাসের মজুদও শেষ হওয়ার পথে। বাকি রয়েছে বিদ্যুৎ। এ বিদ্যুৎ তৈরি করতেও লাগে জ্বালানি। আমরা এতদিন কয়লা বা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা শুনে এসেছি। অনেক আগে থেকে ছিল বায়ু বা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। সম্প্রতি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কথা শোনা যাচ্ছে। এতদিন আমরা যে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখতাম তা ছিল মূলত স্রোতবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এখন বলা হচ্ছে জলকণা ভেঙে বিদ্যুৎ তৈরির কথা।

চাঁদে বিকল্প জ্বালানির সন্ধান একেবারে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এক দল বিজ্ঞানী চাঁদে মানুষের কলোনি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেন। তখন সেখানে হিলিয়াম-৩ খনি তৈরির পরিকল্পনাও নেয়া হয়। একই ধরনের প্রকল্প নেয়ার পরিকল্পনা করছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি। চাঁদে খুবই কম মাত্রায় কার্বন এবং নাইট্রোজেন রয়েছে। প্রচুর ধাতু (মেটাল) ও অক্সিজেন রয়েছে। পরাশক্তি দেশগুলোর মধ্যে চাঁদের এসব সম্পদের দখলদারত্ব পেতে এক ধরনের কাড়াকাড়ি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ধরনের অন্তত ১০টি মহাকাশ প্রকল্পের নাম শোনা যায়। এর মধ্যে ভারতের চন্দ্রযান প্রকল্পের কথা কিছুদিন আগেও আমরা পত্রিকায় পড়েছি। চন্দ্রযান প্রথমে চাঁদের পানি ও খনিজ সম্পদের একটি ম্যাপ তৈরি করেছে। তবে এসব গবেষণায় এগিয়ে চীন।

চীনা কোম্পানি শিমিজু করপোরেশনের একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা বেশ চমকপ্রদ। নাম ‘লুনা রিং’ (চাঁদের আংটি)। উদ্দেশ্য চাঁদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করা। চাঁদের বুকে আংটির মতো গোলাকার সৌর প্যানেল বসানো হবে। সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা মাইক্রোওয়েভ বা লেজার বিম ট্রান্সমিশন টেকনোলজির মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হবে। চাঁদে এ বৃহৎ আকারের সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা হবে সেখানকার উপাদান ব্যবহার করে। এর মধ্যে রয়েছে সিরামিকস, কংক্রিট, গ্লাস, সোলার সেল, অক্সিজেন ও পানি।

চীনেরই আরেক দল বিজ্ঞানী ২০২২ সালে ঘোষণা করেন, চাঁদে নতুন ধরনের জ্বালানির সন্ধান পাওয়া গেছে। চায়না ন্যাশনাল স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং চায়না অ্যাটোমিক এনার্জি অথরিটি জানায়, এটা এক ধরনের খনিজ, যা ফিউশন ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার উপযোগী। এর নাম তারা দিয়েছেন চেঞ্জসাইট-(ওয়াই)। এছাড়া চাঁদের হিলিয়াম-৩ নিউক্লিয়ার জ্বালানি হিসেবে অধিক নিরাপদ। এর মধ্যে রয়েছে দুটি প্রোটন এবং একটি নিউট্রন। অতি তেজস্ক্রিয় যে বর্জ্য ইউরেনিয়াম থেকে তৈরি হয়, হিলিয়ামে তেমন ঝুঁকি নেই। ১ গ্রাম হিলিয়াম-৩ থেকে ১৬৪ মেগাওয়াট ডে বিদ্যুৎ তৈরি হতে পারে। যেখানে ১ গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে ১ মেগাওয়াট ডে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এরই মধ্যে ১ গ্রাম হিলিয়াম-৩-এর দাম উঠেছে ১৭ হাজার ৫৪০ ডলার। যেখানে ১ গ্রাম ইউরেনিয়ামের দাম ধরনভেদে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯২০ ডলার। বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, চাঁদের বুকে ১১ লাখ টন হিলিয়াম-৩ মজুদ রয়েছে। তবে হিলিয়াম-৩ ফিউশনের জন্য ৬০ কোটি ডিগ্রি টেম্পারেচার প্রয়োজন। ২০৩০ সালের দিকে এই নিউক্লিয়ার জ্বালানিকে ফিউশন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী প্রযুক্তি চীন বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন করতে পারে। চায়না ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার করপোরেশন একটি বিবৃতিতে জানায়, চাঁদের মাটি ও পাথরের নমুনা বিশ্লেষণ করে এবং পরমাণু বিজ্ঞান গবেষণা করে চাঁদে বিকল্প জ্বালানির উৎস সন্ধানে প্রকল্প এগিয়ে নেয়া হবে। যেকোনো গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রে অভিযানের খবর আমাদের আলোড়িত করে। আমরা এসব দেখি আর উদ্দীপ্ত হই। এটা ভেবে পরিতৃপ্ত হই যে একদিন এ পৃথিবীর বাইরেও মানুষের বসতি গড়ে উঠবে। বিজ্ঞানীরাও নিশ্চয় সেই লক্ষ্যে নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। মানুষের জীবনযাপনকে উন্নত করার জন্য তাদের অবদান আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাই আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের খবর দেখলেই আমরা উৎফুল্ল হই। একই সঙ্গে আমাদের মনে শঙ্কা জাগে। শেষ পর্যন্ত চাঁদের বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হবে না তো?

চাঁদের বুক থেকে যেসব জ্বালানি সংগ্রহ করা হবে, তা কি এ পৃথিবীর মানুষ সমানভাবে ভোগ করতে পারবে? নাকি সেগুলো কেবল ধনাঢ্যরাই টাকা দিয়ে কিনে নেবেন? চাঁদ যে হাজার হাজার বছর ধরে রাতের পৃথিবীকে আলো দিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোনো বৈষম্য করেনি। চাঁদের বুকে যে কলোনি তৈরি হবে, তা কি কেবল অর্থ-বিত্ত-জ্ঞানে এক দল অগ্রসর শ্রেণীর অভিজাত এলাকা হবে? চাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের ফলে তার পরিবেশের ভারসাম্য কি বিনষ্ট হবে? যদি তা কোনোভাবে ঘটে, তাহলে যে চাঁদ শৈশব থেকে আমাদের ঘুম পাড়ানির গান আর অসংখ্য মিথের অনুষঙ্গ হয়ে আছে, তা কি আর জোছনা বিলাতে পারবে? চাঁদের প্রভাবে যে জোয়ার-ভাটা হয়, ওর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হলে তা আর হবে কি? পৃথিবীতে যে প্রাণের স্পন্দন গড়ে উঠেছে, তা কি কেবল পৃথিবীর জল-হাওয়ার ফসল? চাঁদ-সূর্য কি প্রভাব রাখেনি? উন্মত্ত ভোগ আর ক্ষমতার যে নেশা পৃথিবীকে ক্রমে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে, চাঁদেও যদি একই রকম ঘটনা ঘটে, তাহলে আমাদের দুঃখের সীমা থাকবে না।

চাঁদের বুকে মানুষ পা রেখেছে। এবার যেন হাত না দেয়। কারণ চাঁদটিকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও মানুষের।

হানযালা হান: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, বণিক বার্তা