ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ভর্তুকিহীন এলপিজি সিলিন্ডারের (১৪.২ কেজি) ৬২০ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি হলেও বাংলাদেশে ১২ কেজির দামই ৮০০-৯৫০ টাকা। বাজার অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী, বেশি কোম্পানি থাকলে সাধারণত প্রতিযোগিতার কারণে পণ্যের দাম কমে আসে অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে একেবারেই বিপরীত চিত্র বিদ্যমান। অধিক কোম্পানি হলেও দাম বাড়ছেই। সরকারি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করলেও বেসরকারি খাতের জন্য মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নীতিমালা প্রণীত হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় কয়েকবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকও করেছে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া যায়নি। তবে গ্রাহকদের স্বার্থে এবং এলপিজি ব্যবসায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ন্ত্রণ থাকা জরুরি। এক দশক ধরে বেসরকারি এলপি গ্যাসের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। বেসরকারি ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। সর্বশেষ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ এলপি গ্যাসের মূল্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে বিইআরসির কাছে সুপারিশ করেছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের শাখা আল কুদসের প্রধান কাশেম সোলাইমানি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। ওই ঘটনার পর পরই বাংলাদেশে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি কিনতে ঋণপত্র (এলসি) খুলে তা দেশে আনতে অন্তত এক মাস লাগার কথা। অথচ দাম বাড়তে একদিনও সময় লাগেনি। এসব দেখার কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। তাই প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো এলপিজিরও মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) শুনানির মাধ্যমে পদক্ষেপ নিতে পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোম্পানিগুলোকে অনুরোধ করা হয়েছিল, যাতে সর্বোচ্চ খুচরা দাম বোতলের গায়ে লিখে দেয়া হয়। তারা সহজেই এটি করতে পারে। এতে শেষ প্রান্তের গ্রাহক এলপিজি সঠিক দামে পেতে পারেন। দেশের প্যাকেটজাত সব পণ্যেই সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখা থাকে। কিন্তু এলপিজি সিলিন্ডারের গায়ে দাম লিখতে ব্যবসায়ীরা রাজি নন। তারা বলছেন, যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর বিষয়টি নির্ভরশীল, তাই এলপিজির মূল্য এভাবে লিখে দেয়া সম্ভব নয়।
কয়েক বছর ধরে গ্রাম ও শহরে বাড়ছে পরিবেশবান্ধব এলপি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম) গ্যাসের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়ছে এ গ্যাসের। যদিও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশেই এলপিজির দাম অনেক বেশি। বাংলাদেশের মতো শ্রীলংকা ও মালয়েশিয়ায় গ্যাস থাকলেও ভারত, নেপাল বা ভুটানে নিজস্ব গ্যাস নেই। অথচ ওইসব দেশে এলপি গ্যাসের দাম বাংলাদেশের চেয়ে কম। এছাড়া নেপাল ও ভুটানে নিজস্ব সমুদ্রবন্দর না থাকায় ভারতের কলকাতা বন্দর দিয়ে পণ্য খালাস করে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে নিয়ে যায় এসব এলপিজি। ফলে দেশ দুটিতে এলপিজির পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এদিকে ভারত এলপি গ্যাস জনপ্রিয় করতে ভর্তুকি দিয়ে এলেও বাংলাদেশ সরকার ভর্তুকি দেয় না। শুধু ভারত নয়, থাইল্যান্ডসহ বহু দেশে এই রান্নার গ্যাসে সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এ মুহূর্তে এলপিজি আমদানিতে ভর্তুকি দেয়ার কোনো চিন্তাভাবনা সরকারের নেই।
দেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ কমে আসছে। আবার ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও রয়েছে কেবল ৭ শতাংশ। এ পরিস্থিতিতে গ্রামগঞ্জে এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে পারলে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার কমবে এবং বনভূমি রক্ষা পাবে। এলপিজি সেবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বাজারীকরণ, মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদি নিয়ে কোনো নিয়ম-কানুন ও আইন নেই। এটা ফ্রি মার্কেটের মতো। তাই এ বাজারে শৃঙ্খলা আনতে তদারকির বিকল্প নেই। এজন্য একটা আইন লাগবে। আর সেটা রেগুলেটরি অথরিটির মাধ্যমে হতে হবে। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, আবাসিক খাতে আর কখনো পাইপলাইনে গ্যাসের নতুন সংযোগ দেয়া হবে না। সরকারের যুক্তি হলো, উন্নত বিশ্বে এভাবে কোনো বাসায় গ্যাস দেয়া হয় না। সেখানে রান্নায় ব্যবহার করা হয় সিলিন্ডারভর্তি এলপিজি বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস। তাছাড়া দেশে গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে আসছে। ফলে এলপিজির ব্যবহার সহজলভ্য করতে হবে। গ্যাসের সংযোগ বন্ধের সময়ে সরকার ঘোষণা করেছিল যে এলপিজি সহজলভ্য করা হবে, যাতে কম খরচে যে কেউ এটা ব্যবহার করতে পারে। বাস্তবতা হলো, এলপিজির দাম বাড়ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো কার্যকর ভূমিকাও দেখা যাচ্ছে না।
বাজার পুরো বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে। মোট চাহিদার ৯৮ শতাংশই সরবরাহ করছে তারা। সরকার শুধু লাইসেন্স দেয়ার মধ্যেই তার দায়িত্ব সীমাবদ্ধ রেখেছে। দাম নির্ধারণের এখনো কোনো নীতিমালা প্রণীত হয়নি। এলপি গ্যাসকে সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে পরিকল্পনা থাকলেও নেই কোনো কার্যকর উদ্যোগ। ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় আইনি কোনো কাঠামো নেই। যদিও সরকার চলতি বছরের মধ্যে দেশের ৭০ শতাংশ আবাসিক জ্বালানি চাহিদা এলপি গ্যাসের মাধ্যমে মেটানোর ঘোষণা দিয়েছিল। কোম্পানিগুলোর অভিযোগ ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে গিয়ে দাম বেড়ে যায় আবার ডিলারদের অভিযোগ কোম্পানি দাম বেশি রাখে। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করে দেয়া জরুরি। শুধু দাম নির্ধারণই নয়, সেটি বাস্তবায়নে বাজার তদারকিও জোরদার করতে হবে। প্রয়োজনে ভারতের মতো পরিবারপ্রতি ভর্তুকি মূল্যে গ্যাস প্রদানের উদ্যোগ নিতে হবে।










