১৮ মে ২০২২ তারিখে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে উপস্থাপিত বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বিইআরসির কারিগরি কমিটির (টিসির) প্রস্তাব: (ক) লোডশেডিং মোকাবেলায় নির্ধারিত বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদা ৮ হাজার ৪১৬ কোটি ইউনিট, (খ) উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, (গ) রাজস্ব চাহিদা বা ব্যয় ৬৬ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা, (ঘ) রাজস্ব ঘাটতি ২৪ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা এবং (ঙ) ঘাটতি হার ২ টাকা ৯৯ পয়সা সমন্বয়ে ভর্তুকি ছাড়া মূল্যহার বৃদ্ধি ৫ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ৮ টাকা ১৬ পয়সা, অর্থাৎ ৫৮ শতাংশ। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী উৎপাদন হলে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ হবে এবং লোডশেডিং হবে না।

দুই. অন্যায়, অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় রাজস্ব চাহিদা বা ব্যয়ে সমন্বয় করা না হলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে উল্লিখিত আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ের পরও উদ্বৃত্ত রাজস্ব সমন্বয়ে বিদ্যুতের বিদ্যমান পাইকারি মূল্যহার কমানো সম্ভব।

তিন. বিইআরসির মানদণ্ডে বিদ্যুৎ উৎপাদন লাইসেন্সি বা বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে সার্বিক মুনাফা ৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। ইকুইটি ও ঋণের ওপর সুদ যথাক্রমে ৫ ও ৪ শতাংশ। বিইআরসির নির্ধারিত মানদণ্ড অপেক্ষা অধিক মুনাফা ও সুদ বিইআরসি আইনের ধারা ৩৪(২)-এর পরিপন্থী এবং প্রতিযোগিতা আইনের ধারা ১৫ ও ১৬ মতে লুণ্ঠনমূলক। এ বিবেচনায় বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহে অন্যায়, অযৌক্তিক তথা লুণ্ঠনমূলক ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। মূল্যবৃদ্ধি ছাড়া জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট ও আর্থিক ঘাটতি মোকাবেলায় বিকল্প প্রস্তাব প্রদান করছি।

চার. বিইআরসির কর্তৃত্ব খর্ব করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিইআরসি আইন লঙ্ঘন করে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল এবং বিপিসি জেট-ফুয়েল, ফার্নেস অয়েল ইত্যাদি পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের মূল্যহার নির্ধারণ করে। উচ্চ আদালতের আদেশে এলপিজির মূল্যহার এখন বিইআরসি নির্ধারণ করে। তাতে দেখা যায়, এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এলপিজি লাইসেন্সিরা সিলিন্ডারপ্রতি কমপক্ষে গড়ে ১৫০ টাকা হারে ভোক্তাদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুণ্ঠন করছে ।

পাঁচ. পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য তথা তরল জ্বালানির মূল্যহার শুনানির ভিত্তিতে বিইআরসি কর্তৃক বৈধভাবে নির্ধারিত হলে জানা যেত অবৈধ উপায়ে বিপিসি লিটারপ্রতি বাড়তি কত টাকা নিচ্ছে। ৪৩ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে আরো কত হাজার কোটি টাকা বিপিসি ভোক্তাদের কাছ থেকে লুণ্ঠন করেছে। লাইসেন্সিরা আর্থিক ঘাটতি সমন্বয়ে গ্যাসে ১১৭ ও বিদ্যুতে ৭৯ শতাংশ মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। কিন্তু গণশুনানিতে প্রতীয়মান হয়, গ্যাস ও বিদ্যুতে আর্থিক ঘাটতি যথাক্রমে ৬২ ও ৫৮ শতাংশ। ১১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েও গ্যাসের মূল্যহার বাড়ানো হয় প্রায় ২৩ শতাংশ। গণশুনানিতে ক্যাব তথ্যপ্রমাণাদিতে দেখিয়েছে, লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ১২ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব চাহিদায় সমন্বয় করা না হলে মূল্যবৃদ্ধি হতো না, ভর্তুকি ৬ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসত এবং বিদ্যমান মূল্যহারেই গ্যাসে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় হতো।

ছয়. ২০২০ সালে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার বৃদ্ধির আদেশে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের মূল্যহার ধরা হয় যথাক্রমে ৬৫ ও ৪২ টাকা। জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি কর্তৃক অবৈধভাবে নির্ধারিত বিদ্যমান মূল্যহার যথাক্রমে ৭৭ টাকা ২১ পয়সা ও ৭৪ টাকা। বিইআরসি আইনের পরিপন্থী বিধায় তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের রাজস্ব চাহিদায় বর্ধিত জ্বালানির মূল্যহার সমন্বয় বিইআরসির এখতিয়ারবহির্ভূত। অতএব বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত তরল জ্বালানি বাবদ ৬ হাজার ৭১৯ কোটি টাকরা বর্ধিত ব্যয় রাজস্ব চাহিদায় সমন্বয় করা বৈধ নয় এবং বিইআরসির এখতিয়ারবহির্ভূত।

সাত. গণশুনানির সূত্রে ২০২০ সালের বিইআরসির আদেশে বলা হয়েছিল, মেয়াদ শেষে তেলভিত্তিক রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যাবে না। পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে বিদ্যুৎ বিভাগ বিইআরসির অনাপত্তি চায়। গণশুনানি ছাড়া সিদ্ধান্ত প্রদানে বিইআরসি অপারগতা প্রকাশ করে। তা সত্ত্বেও সে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ ক্রয় বিইআরসি আইন লঙ্ঘনের শামিল এবং ওই আইনের ৪৩ ধারামতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অতএব নিজের আদেশ লঙ্ঘন করে ওই বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ ১ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা রাজস্ব চাহিদা বা ব্যয়ে অন্তর্ভুক্ত কিংবা সমন্বয় করার কোনো সুযোগ বিইআরসির নেই।

আট. বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত তরল জ্বালানির মূল্যহার অবৈধ বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ অবৈধ ক্রয় বাবদ ব্যয় বিদ্যুতের মূল্যহারে সমন্বয় সুযোগ না থাকায় এ বাবদ ঘাটতি ৮ হাজার ১০২ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকিতে সমন্বয় হবে। কারণ এ অবৈধ ঘাটতি বৃদ্ধির দায় সরকারের। তাই বিইআরসি আইন লঙ্ঘনের দায়ে জ্বালানি সচিব ও বিপিসির চেয়ারম্যান অভিযুক্ত। গণশুনানিতে বিইআরসি আইনের ৪২ ও ৪৩ ধারামতে ক্যাব তাদের বিচার চেয়েছে। তবে বিপিসি কর্তৃক আমদানীকৃত ফার্নেস অয়েলের মূল্যহার ৭৪ টাকা, ব্যক্তি খাতে ৯২ টাকা। বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত প্রায় ৫০ লাখ টন ফার্নেস অয়েলের মধ্যে ৪৫ লাখ টনই আমদানি হয় ব্যক্তি খাতে। ব্যক্তি খাতের পরিবর্তে বিপিসির মাধ্যমে ফার্নেস অয়েল আমদানি হলে ঘাটতি কমবে ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা।

নয়. মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, পাইকারি বিদ্যুৎ ক্রয়ে নতুনভাবে ৬ শতাংশ করারোপে ঘাটতি বেড়েছে ২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। আবার আমদানি পর্যায়ে ফার্নেস অয়েলে শুল্ক ও করাদি অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করায় ঘাটতি বেড়েছে ৬ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা। আমদানীকৃত কয়লায় ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপে ঘাটতি বেড়েছে ৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ অরোপিত কর প্রত্যাহার, শুল্ক-করাদি অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখা এবং আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার করা হলে ঘাটতি কমবে ৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা।

দশ. সরকারের শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। এখন প্রায় ৫৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আরইবির এলাকায় ভর্তুকিতে বিতরণ হচ্ছে। তাতে ঘাটতি বেড়েছে ১৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকা। ১৯টি পিবিএসের ভোক্তা মিশ্রণ ডিপিডিসি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিডিবির অনুরূপ। ওইসব পিবিএসের জন্য বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক করে ঘাটতি ১১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা কমানো সম্ভব। আরইবির বিদ্যুতে অবশিষ্ট ঘাটতি ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা সরকারি ভর্তুকিতে সমন্বয় হতে হবে। শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমে ঘাটতি সরকারের পলিসিজনিত। ফলে এ ঘাটতির সমন্বয়ের দায়দায়িত্ব সরকারের।

এগারো. ১৩২ কেভি থেকে তার ঊর্ধ্বের ভোল্টেজ লেভেলে সরবরাহকৃত পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যহার ন্যায্য ও  যৌক্তিক করার লক্ষ্যে ভর্তুকিমুক্ত করে বিতরণ লাইসেন্সি ভেদে ওই ভোল্টেজ লেভেলে নিজ নিজ ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যহার সমতা নিশ্চিত করা হলে পিডিবির আয় বাড়বে এবং ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা।

বারো. ফার্নেস অয়েল প্লান্টগুলোয় ২৪ শতাংশ প্লান্ট ফ্যাক্টরে (পিএফ) চালানো হলে কম-বেশি ৪২১ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হবে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে ঘাটতি ৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা কমবে। আইপিপি ও এসওসির ডিজেল প্লান্টগুলোয় ৫ শতাংশ ও ১০ শতাংশ পিএফে চালানো হলে ৫০ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমবে এবং জ্বালানি সাশ্রয়ে ঘাটতি কমবে ৬৮৮ কোটি টাকা। কম্বাইন্ড ও সিঙ্গেল সাইকেল প্লান্টগুলোয় গ্যাস-বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ব্যয়হার যথাক্রমে ১ টাকা ১ পয়সা ও ১ টাকা ৫ পয়সা। সিঙ্গেল সাইকেল প্লান্টগুলোয় গড়ে ১০ শতাংশ পিএফে উৎপাদন হলে ৪০৫ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে এবং ৪ হাজার ৩৬২ কোটি সিএফটি গ্যাস সাশ্রয়ে ঘাটতি কমবে ৫৯৮ কোটি টাকা। কম্বাইন্ড সাইকেল প্লান্টগুলোয় গড়ে ৭০ শতাংশ পিএফে উৎপাদন হলে ওই ডিজেল ও সিঙ্গেল সাইকেল প্লান্টগুলো থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো হবে তা সমন্বয়ের পরও ৪১২ কোটি ইউনিট বাড়তি বিদ্যুতে ফার্নেস অয়েল থেকে উৎপাদন কমানো বিদ্যুৎ সমন্বয় হবে। অন্যদিকে নিট গ্যাসের চাহিদা বাড়বে ২ হাজার ৩০৮ কোটি সিএফটি অর্থাৎ ৬৩ এমএমসিএফডি। যা চুরি ও অপচয়কৃত গ্যাসে সমন্বয় হওয়া সম্ভব। অতএব নিট জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয়ে ঘাটতি সমন্বয় হবে ৬ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা।

তেরো. বিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্টগুলোয় ইকুইটি বিনিয়োগের ওপর সুদ বা মুনাফা: (ক) পিডিবি ৩ শতাংশ, (খ) পাবলিক কোম্পানি ১২ শতাংশ, (গ) যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানি ১৬ শতাংশ এবং (ঘ) ধারণা করা যায়, ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে ১৮ শতাংশ। বিইআরসির মানদণ্ডে কোনো ক্ষেত্রেই মুনাফা বা সুদের হার ৫ শতাংশের অধিক হবে না। পিডিবি ছাড়া সব ধরনের প্লান্টে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা বিদ্যমান।

চৌদ্দ. বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে পণ্যাদি আমদানির জন্য পাঠানো অর্থসংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অবচয় বা ক্যাপাসিটি চার্জ অত্যধিক এবং লুণ্ঠনমূলক। বিশেষ করে পায়রা কয়লা ও খুলনা ডুয়েল-ফুয়েল বিদ্যুৎকেন্দ্র উল্লেখযোগ্য। তা ছাড়া লাইসেন্সিদের মুনাফা থেকে করপোরেট কর ও ডব্লিউপিএফের অর্থ সমন্বয় না করে রাজস্ব চাহিদায় অন্তর্ভুক্ত করে ঘাটতি বৃদ্ধি করায় এ ব্যয় ও ওই মুনাফা উভয়ই লুণ্ঠনমূলক। অতএব বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি লাইসেন্সিদের লুণ্ঠনমূলক পুঞ্জীভূত মুনাফা এবং অবচয় বা ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দ্বারা ঘাটতি সমন্বয় করার প্রস্তাব করেছে ক্যাব। যেমনটি সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর পুঞ্জীভূত মুনাফা থেকে গ্যাসে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতি সমন্বয় করা হয়েছে।

পনেরো. পিডিবির মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব মূল্যায়নে টিসি আর্থিক ঘাটতি বিবেচনায় নিয়েছে ২৪ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। জ্বালানি তেলের  মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় পিডিবির বিবেচনায় গণশুনানির সময় সে ঘাটতি ছিল প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। উল্লিখিত বিবরণাদিতে দেখা যায়, ঘাটতি বিশেষভাবে বেড়েছে: (ক) বিপিসির পরিবর্তে ব্যক্তি খাতের মাধ্যমে ফার্নেস অয়েল আমদানির কারণে ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা, (খ) শুল্ক-করাদি অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করায় ৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা, (গ) আরইবিতে বিদ্যুৎ বিতরণে লোকসান হওয়ায় ১৭ হাজার ১২৭ কোটি টাকা এবং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস-বৃদ্ধিতে তা কম-বেশি হতে পারে। অর্থাৎ গণশুনানির সময় মোট ঘাটতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।

ষোল. অতঃপর ঘাটতি সমন্বয় হতে পারে: (১) ৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা যদি ফার্নেস অয়েল ব্যক্তি খাতের পরিবর্তে বিপিসির মাধমে আমদানি করা হয়, (২) ১১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা যদি সচ্ছল পিবিএিসগুলোকে প্রদত্ত বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার ন্যায্য ও যৌক্তিক করা হয়, (৩) ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা, যদি আরইবিতে সরকারি পলিসিজনিত লোকসান সরকারি ভর্তুকিতে সমন্বয় করা হয়, (৪) ৯ হাজার ৭৯ কোটি টাকা যদি শুল্ক-করাদি অব্যাহতি সুবিধা বহাল রাখা হয়, (৫) ৬ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা যদি চুরি ও অপচয়কৃত গ্যাস সমন্বয়পূর্বক গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি এবং সিঙ্গেল সাইকেল প্লান্ট, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল প্লান্টগুলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে কম্বাইন্ড সাইকেল প্লান্টগুলো থেকে ওই পরিমাণ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করা হয় এবং (৬) ১ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা যদি বিতরণ লাইসেন্সি ভেদে সঞ্চালন ভোল্টেজ লেভেলে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার ভর্তুকিমুক্ত ও মূল্যহারে সমতা নিশ্চিত করা হয়, তাহলে ঘাটতি সমন্বয় হতে পারে মোট ৪২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। তা ছাড়া লাইসেন্সিদের লুণ্ঠনমূলক পুঞ্জীভূত মুনাফা এবং অবচয় বা ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে ভর্তুকি দ্বারা ঘাটতি সমন্বয় সুযোগ তো রইলই।

সতেরো. অতএব উল্লিখিত প্রস্তাব মতে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা লোডশেডিং মোকাবেলা ও বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার পরিবর্তন না করার নিমিত্তে কম-বেশি ৫ হাজার ২২২ কোটি টাকা ভর্তুকি দ্বারা কম-বেশি ৪২ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি সমন্বয় করা যেতে পারে।

লোডশেডিং মোকাবেলা ও লুণ্ঠনমূলক ব্যয় প্রতিরোধে ১১ দফা বিদ্যুৎ খাত সংস্কার প্রস্তাব:

১. পাইকারি বিদ্যুতে চলতি বছরে আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তা সমন্বয়ে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার বৃদ্ধি না করে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যায়, অযৌক্তিক ও লুণ্ঠণমূলক ব্যয় যথা : (ক) বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগ কর্তৃক তরল জ্বালানির অবৈধ বৃদ্ধিজনিত মূল্য এবং ভাড়া বিদ্যুতের অবৈধ ক্রয়মূল্য বিদ্যুতের মূল্যহারে সমন্বয় না করে ঘাটতি কমাতে হবে, (খ) সরকারের পলিসির কারণে আরইবিকে লোকসানে বিদ্যুৎ দেয়ায় পাইকারি বিদ্যুতে ঘাটতি, সে ঘাটতি সরকারি ভর্তুকিতে সমন্বয় হতে হবে, (গ) দেশী গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি করে এবং সিঙ্গেল সাইকেল প্লান্ট, ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল প্লান্টে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে জ্বালানি ব্যয় সাশ্রয় করে ঘাটতি কমাতে হবে, (ঘ) শুল্ক-করাদি অব্যাহতি সুবিধা বহাল রেখে ঘাটতি কমাতে হবে, (ঙ) ব্যক্তি খাতের পরিবর্তে বিপিসির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহূত ফার্নেস অয়েল আমদানি করে ঘাটতি কমাতে হবে, (চ) বিতরণ লাইসেন্সি ভেদে সঞ্চালন ভোল্টেজ লেভেলের ভোক্তা পর্যায়ে বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার সমতা ও ভর্তুকিমুক্ত নিশ্চিত করে ঘাটতি কমাতে হবে, (ছ) সরকারি লাইসেন্সিদের অযৌক্তিক ও লুণ্ঠনমূলক পুঞ্জীভূত মুনাফা এবং অবচয় বা ক্যাপাসিটি চার্জ ন্যায্য ও যৌক্তিক করে ঘাটতি কমাতে হবে এবং (জ) অযৌক্তিক ব্যয় সাশ্রয়ী অর্থে বিদ্যুতে আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় হতে হবে।

২. অবৈধভাবে নির্ধারিত ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলের বর্ধিত মূল্য এবং কুইক রেন্টালের বিদ্যুৎ অবৈধভাবে ক্রয়কৃত মূল্য বিইআরসি কর্তৃক পুনর্মূলায়ন ক্রমে পুনর্নির্ধারিত হতে হবে।

৩. আরইবিকে লোকসানে বিদ্যুৎ দেয়ায় যে আর্থিক ঘাটতি, সে ঘাটতি আর্থিকভাবে উন্নত পিবিএসগুলোকে প্রদত্ত বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার বৃদ্ধি ও সরকারি ভর্তুকি দ্বারা সমন্বয় হতে হবে।

৪. পিডিবি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়। পিডিবির রাজস্ব চাহিদায় মুনাফা ও করপোরেট ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত হবে না।

৫. সরকারি, যৌথ ও ব্যক্তিমালিকানাধীন প্লান্টগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট ব্যয়গুলো অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয় চিহ্নিত ও পরিমাণ নির্ধারণ এবং প্রতিকারের লক্ষ্যে পক্ষগণ প্রতিনিধি নিয়ে একটি স্বার্থসংঘাত মুক্ত কমিটি গঠিত হতে হবে এবং নওপাজেকোর খুলনা ডিজেল বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যৌথ মালিকানাধীন পায়রা কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে প্রযোজ্য।

৬. নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ বাজার লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতে হবে।

৭. পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যে পরিমাণ অর্থ বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল থেকে ইক্যুইটি বিনিয়োগ করা হয়, সে পরিমাণ অর্থের ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুপাতিক শেয়ার ভোক্তা পক্ষে পিডিবিকে দিতে হবে।

৮. বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিলের অর্থ কেবলমাত্র পিডিবির গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উন্নয়নে ইক্যুইটি হিসেবে ভোক্তাপক্ষের বিনিয়োগ বলে বিবেচিত হতে হবে।

৯. আরইবি ও সামিট পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যে সম্পাদিত অবৈধ সম্পূরক চুক্তি বাতিল হতে হবে।

১০. বিইআরসির কাছে পেশকৃত ক্যাবের সব অভিযোগ জরুরিভিত্তিতে নিষ্পত্তি হতে হবে; এবং

১১. বিদ্যুৎ খাতভুক্ত সরকারি লাইসেন্সিগুলোর প্রায় শতভাগ শেয়ারের মালিক পিডিবি। তাই এ খাতে সুশাসন, দক্ষতা ও সক্ষমতা উন্নয়নে ওইসব লাইসেন্সিদের ওপর পিডিবির কর্তৃত্ব এবং পিডিবি ও বিইআরসির কাছে তাদের জবাবদিহি এবং বিইআরসির কাছে পিডিবির জবাবদিহি নিশ্চিতকরণে লাইসেন্সিদের পরিচালনা বোর্ডগুলোকে আমলামুক্ত হতে হবে।

চলমান ভয়াবহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় কেবল আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দরপতন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে ভোক্তাদের সাশ্রয়ী হওয়াই যথেষ্ট নয়। ভোক্তার জ্বালানি অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যে ক্যাব কর্তৃক প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি ২০২২ এবং তা বাস্তবায়নে গৃহীত কর্মপরিকল্পনার আওতায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাত সংস্কার প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে এবং তারই আলোকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন নিশ্চিত হলে জ্বালানি জাস্টিস ও টেকসই জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

 

ড. এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা