গ্যাসের চাহিদা মেটাতে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) সাম্প্রতিক সাফল্য জ্বালানি বিভাগের জন্য স্বস্তিদায়ক। প্রকৃতপক্ষে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে পেট্রোবাংলা জ্বালানির সংস্থান করতে পারছিল না। এর বিপরীতে স্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্সকে দিয়ে গ্যাস অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম চালানোর ফলে গত এক বছরে আশাতীত সাফল্য এসেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বাপেক্স যে আটটি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপে কাজ করেছে, তার সব ক’টিতেই গ্যাসের সন্ধান ও সরবরাহ বেড়েছে। এ সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করার জন্য বাপেক্স দৈনিক অন্তত ১৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎস বাড়িয়েছে। 

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনের পরিমাণ কম হলেও চলমান সংকটের সময় জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া এ গ্যাস বড় আকারে ভূমিকা রেখেছে। এমনিতে উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছরের জুলাই থেকেই স্পট মার্কেটে গ্যাস কেনা বন্ধ রয়েছে। এ সময় গ্রিডে আমদানি চ্যানেল দিয়ে এলএনজির মাধ্যমে বাড়তি কোনো গ্যাস যোগ হয়নি। অথচ এলএনজি আমদানিতে বছরজুড়ে জ্বালানি বিভাগের তত্পরতা ছিল। 

এছাড়া চলতি বছরের শুরু থেকেই বিশ্ববাজারে এলএনজির উচ্চমূল্য ছিল। তারপর ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এলএনজির দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এরপর অর্থ সংকট ও রিজার্ভ ডলারের সংকট দেখা দিলে এলএনজি আর কেনা যায়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিভাগ স্থানীয় উৎস থেকে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। এক্ষেত্রে বাপেক্স সক্ষমতার সঙ্গেই দেশের গ্যাসের চাহিদা মেটাতে পেরেছে।

বাপেক্সের সাম্প্রতিক কার্যাবলি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, বাপেক্স বিভিন্ন কূপ খনন, সংস্কার ও ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাপেক্সের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যক্রমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর সংস্থাটি আটটি গ্যাসকূপে কাজ করেছে। এর মধ্যে কয়েকটি কূপের গ্যাস এরই মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বাকি কূপগুলোর গ্যাসও দুই-তিন মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। 

এদিকে স্থানীয় অনুসন্ধান কূপের পাশাপাশি বাপেক্সের মাধ্যমে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন কোম্পানিগুলো পুরনো কূপেরও সংস্কার করছে। এরই মধ্যে মোট চারটি কূপের ওয়ার্কওভার করা হয়েছে। এসব কূপ ওয়ার্কওভার করার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে আরো ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হয়েছে।  পেট্রোবাংলার লক্ষ্য হলো ২০২৫ সাল নাগাদ জাতীয় গ্রিডে ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করা।

বিশ্ববাজার থেকে গ্যাস কেনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়টিতে বাপেক্সের জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ভূমিকা সত্যিকার অর্থে প্রশংসনীয়। অথচ আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণ গ্যাস সম্পদ থাকার পরও মাস্টারপ্ল্যানে নিজস্ব গ্যাসের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে এলএনজি-নির্ভরতা তৈরির পাশাপাশি বাপেক্সকে অকার্যকর করে রাখার অভিযোগ উঠেছিল। কয়েক বছর আগে বাপেক্স দেশের ১০৮টি গ্যাস ফিল্ড খনন করার পরিকল্পনা করেছিল। অথচ জ্বালানি মন্ত্রণালয় বাপেক্সকে বাদ দিয়ে গ্যাসফিল্ডগুলো রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমের হাতে তুলে দেয়। বাংলাদেশে ২০১০-এর দশকে এলএনজি-নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন থেকেই এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়। এক্ষেত্রে কাতার ও ওমান এলএনজি আমদানির জন্য বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি দুটি উৎস ছিল। 

বর্তমানে বাপেক্সের ওপর পেট্রোবাংলার নির্ভরশীলতা বাড়লেও কাতার থেকে গত দুই অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, গত ১৩ বছরে বাপেক্স তার এক-চতুর্থাংশ অর্থ পেয়েছে।

কিন্তু বিদেশী কোম্পানিগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানা অক্ষুণ্ন রেখে স্থল ও জলভাগে গ্যাস উত্তোলন করতে বাপেক্সই যথেষ্ট। বিশেষজ্ঞরা এমন দাবি করলেও বাপেক্সের জন্য বাজেট বরাদ্দ না করে বরং বিদেশী কোম্পানির ক্ষেত্রে অতীতে আগ্রহ দেখানো হয়েছে। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাপেক্স দীর্ঘদিন গ্যাস উত্তোলনের কাজ পায়নি। এক্ষেত্রে বাপেক্সের সক্ষমতা নেই, এমন অভিযোগকে ভুল প্রমাণ করে বাপেক্স কার্যত দেখিয়ে দিয়েছে সুযোগ দিলে বাপেক্স জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই বাপেক্সের যে সক্ষমতা রয়েছে তা আরো বৃহৎ আকারে কাজে লাগাতে পারলে রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে। আর গ্যাস সংকট যেহেতু চলমান রয়েছে এবং এলএনজি আমদানির সুযোগ বর্তমানে বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাই বাপেক্সের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলনের বিকল্প নেই। 

বৈশ্বিক ধাক্কার ফলে জ্বালানি খাতে সৃষ্ট চলমান সংকট সহসা যে কাটবে না সেটি খুব সহজেই অনুমেয়। এজন্য যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দূরদর্শী পরিকল্পনা জরুরি। এক্ষেত্রে পরিত্যক্ত কূপগুলোয় গ্যাস অনুসন্ধানসহ বাপেক্সকে আরো যতভাবে কাজে লাগানো সম্ভব সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। এরই মধ্যে যে উন্নয়ন কূপগুলো পরিত্যক্ত বা শেষ হয়ে গিয়েছে সেগুলো থেকে আরো কিছু গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ রয়েছে। সারা দেশে এমন ৪০-৫০টি কূপ রয়েছে। গ্যাসের দ্রুত সরবরাহ বাড়াতে এগুলোয় ওয়ার্কওভার বা সংস্কার খনন করা হলে অনেকখানি গ্যাস পাওয়া যাবে। এগুলোর পাশাপাশি স্থল এবং সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে, কিন্তু সেদিকে সরকার প্রকৃতপক্ষে জোর দিচ্ছে না। দেশের যে ভূ-গঠন তাতে স্থলভাগে এখনো গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে মাত্র ৬৮টি অনুসন্ধান কূপ খনন করা হয়েছে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতের ত্রিপুরা তার স্বল্প আয়তনে কূপ খনন করেছে ১৬০টি। ত্রিপুরা ১৬০টি কূপ খনন করে মাত্র ১১টি গ্যাসফিল্ড আবিষ্কার করেছে। গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সফলতার হার উচ্চ হলেও এখন সেই তিমিরেই রয়ে গিয়েছে গ্যাস অনুসন্ধান। ১৯৯৫ সালের জ্বালানি নীতিমালায় বছরে চারটি অনুসন্ধান কূপ খননের কথা বলা হলেও কোনো সরকারই তা মেনে চলেনি। বিশাল সমুদ্রসীমা অর্জন করলেও সেখানে কোনো কাজ করা যায়নি। এজন্য স্থলভাগের পাশাপাশি সমুদ্রেও গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।  

জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার অন্যতম সবার জন্য টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধান, উত্তোলন ও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে আরো বৃহৎ আকারে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।