করোনাকালেও ২০২১ সালে দেশের ১৬৭টি চা বাগান ও ক্ষুদ্রায়তন চা বাগান থেকে রেকর্ড পরিমাণ মোট ৯৬ দশমিক ৫০৬ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদন হয়েছে, যা গত বছরের (২০২০) চেয়ে ১০ দশমিক ১১২ মিলিয়ন কেজি বেশি। চায়ের উৎপাদন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চা শিল্পের গোড়ার দিকে তাকালে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলাদেশের বর্তমান ভূখণ্ডের মধ্যে চট্টগ্রামেই প্রথম চা চাষের সূচনা হয়। ১৯৪০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামের পাইওনিয়ার বাগানে (বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাব ও আশপাশের পাহাড়ি এলাকা) চা চাষ শুরু হয়। ১৮৪০ সালে চট্টগ্রামের তত্কালীন কালেক্টর স্কোনস আসাম থেকে চায়ের বীজ এবং কলকাতার বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে চীনা চারা সংগ্রহ করেন। তিনি এসব চারা ও বীজ পাইওনিয়ার বাগানে রোপণ করেন এবং পাইওনিয়ার চা বাগান গড়ে তোলেন। জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম কার্যালয়ের অনার বোর্ডে উল্লিখিত জেলা প্রশাসকদের তালিকা থেকে জানা যায়, স্কোনস ১৮৪০ থেকে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত কালেক্টর হিসেবে চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান বাংলাদেশ অংশে প্রথম চা চাষের শুরুটা এ বাগান দিয়েই। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে, চিটাগং চা চাষের এ রকম তথ্যই পাওয়া যায়।

১৮৪৩ সালে পাইওনিয়ার বাগানের পাতা থেকে প্রথম চা বানানো হয়। বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাবের চারদিকে যেসব পাহাড় রয়েছে, সে সময় তা ছিল চা বাগান। বর্তমান চট্টগ্রাম ক্লাবটি ছিল পাইওনিয়ার বাগানের ব্যবস্থাপকের বাসা। এটিই ব্রিটিশ ভারতের বাংলাদেশ অঞ্চলের প্রথম চা বাগান। ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে যে ২২টি চা বাগানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে পাইওনিয়ার চা বাগানের নামও রয়েছে। তবে শহর বড় হতে থাকলে ধীরে ধীরে এ বাগান বিলুপ্ত হয়। বর্তমানে চট্টগ্রাম ভ্যালির চট্টগ্রাম ও রাঙ্গামাটি জেলায় চা বাগান রয়েছে মোট ২৩টি। চট্টগ্রাম ভ্যালিতে ২০২১ সালে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন কেজি।

দুই. ১৮৫৫ সালে সিলেটের চাঁদখানি টিলায় দেশীয় জাতের চা গাছের সন্ধান মেলে। একই সময়ে খাসিয়া ও জৈন্তা পাহাড়েও বন্য প্রজাতির চা গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। সিলেটের তত্কালীন জেলা কালেক্টর টি.পি লারকিন্স (১৮৫৬-১৮৫৭) বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাছে লেখা এক রিপোর্টেও উল্লেখ করেন, চাঁদখানি টিলায় প্রাকৃতিকভাবেই প্রচুর চা গাছ জন্মায়। ১৯০৫ সালে প্রকাশিত আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারস, সিলেটে বলা হয়, ‘In 1955, wild tea was discovered in the surma valley and the first garden was opened in sylhet at Malnichara in 1857 (page135-136)।’ সিলেটের মালনিছড়ায় প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ শুরু হয় ১৯৫৪ সালে এবং বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু হয় ১৮৫৭ সালে। মূলত মালনিছড়াই দেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান। উনিশ শতকের শেষে সিলেট চা শিল্পে অন্যতম প্রধান স্থান দখল করে নেয়। ১৮৯৩ সালে সিলেটে  ৯ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন কেজি চা উৎপাদিত হয়। বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে (২০২১ সালে) উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৪৪ মিলিয়ন কেজি। ১৯০৪-০৫ সালে সিলেটে মোট ১২৩টি চা বাগান ছিল। বর্তমানে সিলেট অঞ্চলে চা বাগানের সংখ্যা ১৩৫। ২০১২ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মৌলভীবাজারে দেশের দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা বাস্তবায়নে ২০১৭ সালের ৮ ডিসেম্বর দেশের দ্বিতীয় চা নিলাম কেন্দ্র উদ্বোধন হয় এবং ২০১৮ সালের ১৪ মে থেকে নিলাম কার্যক্রম চালু হয়।

তিন. দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। এ জেলার তিন দিকে দীর্ঘ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। পঞ্চগড়ের উত্তরে ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলা। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত পঞ্চগড়-তেঁতুলিয়া অঞ্চল জলপাইগুড়ির অধীনে ছিল। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর পঞ্চগড় সফরে এসে সমতল ভূমিতে চা চাষের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। ভারতের দার্জিলিংয়ে যদি চা চাষ হতে পারে, তাহলে পঞ্চগড়ে কেন নয়? পঞ্চগড় সফরে এসে এই সরল প্রশ্নটি করেছিলেন তিনি। পঞ্চগড়ের তত্কালীন জেলা প্রশাসক রবিউল ইসলাম এটাকে শুধুই একটি প্রশ্ন হিসেবে নেননি, পঞ্চগড়ের সমতল ভূমিতে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম চা চাষ শুরুর উদ্যোগ নেন। তিনি ভারত থেকে চারা সংগ্রহ করে প্রথমে তার বাসভবনের একটি টবে এবং পরে জমিতে চা চাষ করে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেন। কিছুদিনের মধ্যেই টবের চারা দ্রুত ডালপালা ছেড়ে বাড়তে থাকে। পরীক্ষামূলক চাষের সফলতা থেকে পঞ্চগড়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা উৎপাদন শুরু হয়। ২০০০ সালের দিকে তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি লিমিটেড ও কাজী অ্যান্ড কাজী পঞ্চগড়ে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে চা চাষ শুরু করে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে উত্তরাঞ্চলে (পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও নীলফামারী) ক্ষুদ্র পর্যায়ে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০০ হেক্টর জমি নতুন করে চা চাষের আওতায় আনতে সেপ্টেম্বর ’১৫ থেকে জুন ’২১ মেয়াদে ৭৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘Extension of small holding tea cultivation in northern Bangladesh’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চা বোর্ড। প্রকল্পের সমাপ্তি শেষে চা উৎপাদন বেড়েছে ২৫ দশমিক ২২ লাখ কেজি থেকে ১৪৫ দশমিক ৪ লাখ কেজি, যা প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শিতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ চা বোর্ডের প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান। তিনি ৪ জুন ১৯৫৭ থেকে ২৩ অক্টোবর ১৯৫৮ পর্যন্ত চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালনকালে চা শিল্পের সম্প্রসারণ, গবেষণা ও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখেন। তার অবদানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য চা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ ৪ জুনকে প্রতি বছর ‘জাতীয় চা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

পঞ্চগড়ে চা চাষের সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় ২০০১ সালে সেখানে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিটিআরআই) একটি উপকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ চা বোর্ড। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলে সমতলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলায় ক্ষুদ্র পর্যায়ে চা চাষ হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলে সমতলের চা বাগান ও ক্ষুদ্র চা চাষ থেকে এ বছর (২০২১) রেকর্ড পরিমাণ ১৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন কেজি চা জাতীয় উৎপাদনে যুক্ত হয়েছে, যা গত বছর (২০২০) ছিল ১০ দশমিক ৩০ মিলিয়ন কেজি। উত্তরাঞ্চলে ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ যথাক্রমে ৯ দশমিক ৬০, ১০ দশমিক ৩১ ও ১৪ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন কেজি। অন্যদিকে চট্টগ্রাম ভ্যালিতে ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ যথাক্রমে ১১ দশমিক ৭৫, ১১ দশমিক ২৩ ও ৯ দশমিক ৫২ মিলিয়ন কেজি। উত্তরাঞ্চলে বাণিজ্যিক চা চাষের বয়স ২১ বছর। শুরুর ২১ বছরের মাথায় পঞ্চগড় উৎপাদনে ছাড়িয়ে গেল ১৬১ বছর আগে শুরু হওয়া চট্টগ্রামকে। ২০০৫ সালে, অর্থাৎ ১৫ বছর আগেও উত্তরাঞ্চলের মোট চা উৎপাদন ছিল মাত্র ১ লাখ ৬০ হাজার কেজি। বর্তমানে যার পরিমাণ ১ কোটি ৪৫ লাখ কেজি।

দেশের উত্তরাঞ্চলে চা চাষ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। একসময়ের পতিত গো-চারণ ভূমি ও অনুন্নত অঞ্চলে এখন সবুজ পাতার সমাহার। সৃষ্টি হয়েছে চোখ জুড়ানো নৈসর্গিক সবুজ সৌন্দর্য। হিমালয়কন্যাখ্যাত সবুজ শ্যামলে ঘেরা দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ে চা চাষ শুরু হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী চিন্তার কারণে। এরই মধ্যে পঞ্চগড়ে তৃতীয় চা নিলাম কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অনুশাসনও দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর, ঢাকা বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, ঢাকা মেট্রোরেল নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু টানেল নির্মাণ, কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ নির্মাণ, এ-জাতীয় মেগা প্রকল্পগুলোর সবই তার সুদূরপ্রসারী চিন্তার ফসল। তার এ রকমই একটি চিন্তার ফসল হচ্ছে আজকের এই উত্তরাঞ্চলের চা বাগান। যে সুদূরপ্রসারী চিন্তায় পঞ্চগড়ের চা বাগান ও কারখানাগুলোয় কর্মরত প্রায় ২৫ হাজার শ্রমিকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে, পরিবর্তন হয়েছে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থার। 

 

মোহাম্মাদ রুহুল আমিন: সচিব, বাংলাদেশ চা বোর্ড