আজকের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সূচনা হলো একটি নতুন বছরের। নব উদ্যমে যাত্রা করবে বাংলাদেশ। বৈশ্বিক মহামারীর ফলে সৃষ্ট সংকটের বিপরীতে নতুন সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অর্জনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার প্রত্যাশাকে পুঁজি করে সামনে অগ্রসর হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার হোক আমাদের।
কভিড-১৯-এর অপ্রত্যাশিত অভিঘাত বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। আক্রান্ত হয়েছি আমরাও। তবে সরকারের দূরদর্শিতা আর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। সাফল্যের তালিকায় যোগ হয়েছে পদ্মা সেতুর মতো অনন্য অর্জন। একলয়ে চলছে মেট্রো রেল, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা বন্দর নির্মাণের মতো বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও প্রত্যাশার অধিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে দেশের রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। চাঙ্গা আবহ তৈরি হয়েছে পুঁজিবাজারে, যা নতুন বছরকে ঘিরে আরো অর্জনের ইঙ্গিত দেয়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে গত বছর মার্চের শেষ দিকে দেশে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ শুরু হলে সরকারকে নতুন করে অনেক সমীকরণ মেলাতে হয়েছে। ভাবতে হয়েছে অনেক কিছু। কভিডের প্রভাবে কর্মহীন হয়ে পড়া মানুষ, থমকে যাওয়া শিল্প-কারখানায় গতি আনতে সরবরাহ করতে হয়েছে প্রণোদনা তহবিল। কার্যত ২০২০ সালজুড়েই অচলাবস্থা জারি ছিল নতুন বিনিয়োগে। সামলাতে হয়েছে রফতানি খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি। মহামারী বৈদেশিক শ্রমবাজারে যে ধাক্কা দিয়েছে তার প্রভাব পড়েছে আমাদের অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর। তাছাড়া কভিড এসে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে নতুন যে মাত্রিকতা যোগ করেছে তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের সক্ষম করে তোলার চ্যালেঞ্জও রয়েছে নতুন বছরে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চালু করা যায়নি। ফলে নারী শিক্ষা ও বাল্যবিবাহ রোধে আমাদের দীর্ঘদিনের সাফল্যগুলো নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ঘরবন্দি হয়ে থাকার ফলে গ্রামাঞ্চলের মেয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের পরিমাণ। নারী ও দরিদ্ররা যাতে শিক্ষা থেকে পিছিয়ে না পড়ে তার জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা জরুরি। সামনে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা; যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি সবার জন্য আজীবন শিক্ষার সুযোগ এবং নারী ও মেয়েদের লিঙ্গসমতা অর্জন ও ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। জোর দেয়া হয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীল কাজের সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়ে। এসব দিকে পিছিয়ে পড়া মানে সুযোগ হাতছাড়া হওয়া। এ পর্যায়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি সরকারি ও এর সমর্থক সংস্থাগুলোকে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
কৃষিতে আমাদের অগ্রগতির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সবজি উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি পোলট্রি, গবাদিপশু ও মত্স্য চাষেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কৃষিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণকেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে কভিডের পাশাপাশি হাওড়ে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধান উৎপাদন। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষক। চালের বাজারজুড়ে অস্থিরতার আশঙ্কাও রয়েছে। এদিকে লক্ষ রাখতে হবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে কৃষকের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি।
এছাড়া কৃষির অন্যান্য সেক্টরে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনগোষ্ঠী তৈরিতে জোর দিতে হবে। কভিডের কারণে বিশ্বব্যাপী ডিজিটালাইজেশনের বিস্তারটা অনেক তাড়াতাড়ি হবে। এ অবস্থায় টেকসই মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কৌশল গ্রহণ জরুরি। অর্থাৎ বিদ্যমান স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারকে নতুন দক্ষতার শ্রমবাজার ও কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে নিতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পাশাপাশি আইসিটি খাতভিত্তিক শিক্ষার ওপর আরো জোর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। নইলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অভিঘাত মোকাবেলা করা কঠিন হবে। আগামী বছরগুলোতে বিশ্বব্যাপী কী ধরনের কাজের চাহিদা বাড়তে পারে, কী ধরনের কাজের চাহিদা কমতে পারে, তা বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত ও শিক্ষাগত রূপান্তর করতে হবে।
কভিড একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। এর সুবাদে বাংলাদেশকেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে; এর প্রভাববলয়ের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হবে। নতুন বছরে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সুযোগগুলো কাজে লাগাতে অন্য দেশগুলো কী ধরনের পরিকল্পনা নিচ্ছে, সেগুলো পর্যালোচনা এবং সে অনুযায়ী অগ্রসর প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগী ভূমিকা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধু কিন্তু বঞ্চনা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। অথচ দেশের উন্নয়ন সুবিধা অধিকাংশই ধনিক শ্রেণীর দখলে চলে যাচ্ছে। ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান কমাতে হলে দেশে ন্যায্য গণতন্ত্রচর্চা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন তথা কর্মসংস্থানের জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা আছে তবে জোর দিতে হবে পারস্পরিক সহনশীলতার বিষয়টিতে। এ কাজে সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি ও ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনীয় কাঠামোগত রূপান্তরের মাধ্যমে উদীয়মান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলাই হোক নতুন বছরের প্রত্যয়।










