লেবাননের বৈরুত বন্দরে বিদেশী জাহাজের রাখা ২৭৫০ টন অ্যামোনয়িাম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে তছনছ হয়ে গেছে বৈরুত। বলা হচ্ছে জাপানে আনবিক বিস্ফোরণের পর এটা এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের ফলে ৩ দশমিক ৫ মাত্রার ভূ-কম্পন রেকর্ড করা হয়। বিস্ফোরণ এতটা শক্তিশালী ছিল যে ভূমধ্য সাগরের ওপারে ২০০ কিলোমিটার দূরে গ্রিসে পর্যন্ত কম্পন অনুভূত হয়। দশকের পর দশক ধরে গৃহযুদ্ধ, সিরিয়ার খবরদারি আর ইসরাইলির আগ্রাসনের মুখে বেঁচে থাকতে হয়েছে লেবাননবাসীকে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত ছাট দেশ লেবাননের সামনে এই বিস্ফেরণ বড় ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে আসতে যাচ্ছে। বিস্ফোরণের ফলে ১৫৪ জন নিহত, ৫ হাজার আহত ও তিন লাখ বাস্তুচ্যুত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। ১০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা করছে অর্থনীতিবিদরা।
কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষতির আলোচনার চেয়ে বেশী আলোচিত হচ্ছে সম্ভাব্য রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। বিস্ফোরণের পর প্রথম বিদেশী অতিথি হিসাবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাঁখো লেবানন সফর করেন। তিনি সফরে গিয়ে লেবানন সরকারকে রাজনৈতিক সংস্কারের নির্দেশ দেন। তার সফরের সময় সরকারের প্রতি ক্ষোভ জানিয়ে ফ্রান্সকে আগামী দশ বছরের জন্য লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে কিছু প্রতিবাদকারী। এই বিষয়ে ইতিমধ্যে একটি অনলাইন পিটিশনে ৫৫ হাজার জন স্বাক্ষর করেছে।
ফলে এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সাবেক উপনিবেশ ফ্রান্স কি ফের লেবাননের নিয়ন্ত্রণ নিবে! ফ্রান্স রাজনৈতিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে লেবাননে বেশ শক্তিশালী। ২০১৮ ফ্রান্স লেবাননে রফতানি করেছে ৯০০ মিলিয়ন ডলার আর আমদানি করেছে ৬৩ মিলিয়ন ডলার। এযাবকালে লেবানন নিয়ে হওয়া সবক’টি দাতা সম্মেলনের নিয়ন্ত্রণ করেছে ফ্রাস। দাতারা প্রতিশ্রুতি দিলেও হিজবুল্লাহর সাথে সরকারের সম্পর্ক থাকার অভিযোগে শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত অর্থ দেয় না।
লেবানন ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণে যায় ১৯১৬ সালের ‘সাইকেস পিকট’ নামক গোপন চুক্তির মাধ্যমে। ১৯৪৩ সালে স্বাধীনতা পেলেও লেবানন থেকে যায় নানা দেশের প্রক্সির যুদ্ধের স্থান। ১৯৮৩ সালে হরকাতুল জিহাদের বোমা হামলায় ফ্রান্স- যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা লেবানন ত্যাগ করে। কিন্তু চলমান গৃহযুদ্ধ থামেনি। যে গৃহযুদ্ধের একটি পক্ষ দক্ষিণীয় লেবানন আর্মির সহযোগী ছিল ইসরাইল। গৃহযুদ্ধ থামাতে তৎকালীন সাদ্দাম বিরোধী অক্ষ সৌদি, মিসর, সিরিয়া, ইরান, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র ১৯৮৯ সালে লেবানন নিয়ে ‘তায়েফ চুক্তি’ তৈরী করেন। এই চুক্তিতে বর্তমান ধর্মভিত্তিক কোয়ালিশন সরকারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। চুক্তি মতে লেবাননের প্রেসিডেন্ট হবেন একজন মারোনাইট খ্রিস্টান আর প্রধানমন্ত্রী হবেন একজন সুন্নি মুসলমান। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট হওয়া সত্ত্বে কোন ধরনের আদমশুমারি ছাড়া সংসদে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সমান আসন নির্ধারণ করা হয়।
গৃহযুদ্ধ থামাতে সবচেয়ে অবদান রাখা ব্যক্তি লেবানন ও সৌদি যৌথ নাগরিক রফিক হারিরি। পরবর্তীতে ধনকুবের রফিক হারিরি প্রধানমন্ত্রী হন। কিন্তু তাকে বোমা হামলায় হত্যা করা হয়। এই বোমা হামলার তীর উঠে হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে। তবে রফিক হারিরির আত্মদানের মধ্য দিয়ে লেবাননে সিরিয়ার ট্রাংকের ঝনঝনানির সমাপ্তি ঘটে। রফিক হারিরির মৃত্যুর পর সিরিয়ার বিরুদ্ধে লেবাননের জনগণ ‘সিডর বিপ্লব’ এর ডাক দিলে সিরিয়ার সামরিক বাহিনী লেবানন ছাড়ে।
সাবেক উপনিবেশ ফ্রান্স ও প্রভাবশালী সিরিয়ার পাশাপাশি সৌদি আরব আর ইরান লেবাননের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। ২০১৭ সালে হঠাৎ করে রফিক হারিরির ছেলে সা’দ হারিরি সৌদি আরবে একটি টিভি চ্যানেলে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। মূলত ইরান ও হিজবুল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখার অভিযোগে সৌদি চাপে তাকে পদত্যাগ করতে হয়। কিন্তু ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সা’দ হারিরিকে আশ্রয় দেন প্যারিসে। এই হস্তক্ষেপ মূলত লেবানন নিয়ে সৌদি ও ইরানের প্রভাব রুখে দেওয়ার চেষ্টা ফ্রার্ন্সে। সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ ফ্রান্সকে সে প্রভাব রুখে দেওয়ার সুযোগ হিসাবে এসেছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট লেবাননে যে ভাষায় কথা বলে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থার কেন্দ্রিয় সরকারও রাজ্য সরকারকে এই ভাষায় নির্দেশ দেয় না।
তবে লেবাননের রাজনীতিতে ইসরাইল এবং ইরানপন্থি হিজবুল্লাহও প্রভাবশালী। ২০০৬ সালে ইসরাইলের আধুনিক প্রযুক্তির সেনাবাহিনীকে হিজবুল্লাহ গেরিলারা লেবানন সীমান্তের নাস্তানুবাদ করে দেয়। আফগানিস্তানের তালেবানের মতো সরকারে না থেকে দেশের অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে হিজবুল্লাহরা। ইসরাইল তার নিরাপত্তার জন্য পার্শবর্তী দেশ জর্ডান, মিসর, সিরিয়া ও লেবাননে অনুগত সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মিসরে সেটা সম্ভব হয়েছে। সিরিয়ায় প্রচেষ্টা চলছে। এখন দৃষ্টি লেবাননে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইয়ের মতে, হিজবুল্লাহ বৈরুত সমুদ্রবন্দর দিয়ে অস্ত্র আমদানি করে ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ও সিরিয়ার শাসককে সরবরাহ করে। বৈরুত বন্দর ইসরাইলের হাইফা বন্দরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে এই বন্দর আদো সংস্কার হবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে যায়। বিস্ফোরণের পর প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে নিরুঙ্কুশ ক্ষমতা পেয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী মিশেল উন ইসরাইলের সাথে শান্তি আলোচনা ও জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথা বলছেন। তবে সে সরকারে হিজবুল্লাহকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা থাকবে ফ্রান্স-ইসরাইলের। অন্যদিকে ইরান ও সিরিয়ার আসাদ সরকারের জন্য ইসরাইল সীমান্তে হিজবুল্লাহকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরী। ২৭% শিয়া অধ্যুষিত লিবিয়াতে শিয়াকে বাদ দিয়ে কোন সংস্কার পরিকল্পনা করলে তা হিজবুল্লাহ, ইরান ও সিরিয়া অক্ষ মানবে না।
তবে লেবানিজরা সংস্কার চায়। লেবাননের ৮০% অর্থ কালো বাজারে। বেকারত্ব ছুঁয়েছে ৫০% এ। গতবছর থেকে চলা ‘অক্টোবর বিপ্লব’ আন্দোলনকারীরা নাজুক পরিস্থিতির জন্য সরকারের দুর্নীতি ও ধর্মভিত্তিক কোয়ালিশনকে দায়ি করছেন। বিস্ফোরণের কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় জর্জিয়া থেকে মোজাম্বিকগামী জাহাজ যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়লে বৈরুত বন্দরে নোঙর করে। পরে বৈরুতের কাস্টম বিভাগ জাহাজটি আটক করে বিস্ফোরক দ্রব্য বন্দরের গুদামে নেয়। কিন্তু এই নিয়ে কাস্টমস ও বন্দর কর্তপক্ষের মধ্যে বিতন্ডা শুরু হয়। এখানে কাস্টমন বিভাগ প্রেসিডেন্টের অনুসারী আর বন্দর কর্তপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর। কোয়ালিশন সরকারের রাজনৈতিক বিভাজনের দ্বন্দ্ব লেবাননের জনগণের জীবনে আসা এত বড় বিস্ফোরণের জন্য দায়ি করা যায়।
বিস্ফোরণ কোয়ালিশন সরকারকে ব্যর্থতার তকমা ও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিকে গতি দিচ্ছে। কিন্তু দেশে চলমান বিভাজনের সুযোগ নিতে চায় ইসরাইল-ফ্রান্সসহ অন্যান্য আন্তজার্তিক কুশীলব। জনগণের সংস্কারের দাবিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় তারা। কিন্তু লেবানিজরা যে সংস্কার চায় তা লেবাননের স্বার্থে না হয়ে ইসরাইল ও ফ্রান্সের স্বার্থে হলে লেবানন ফের গৃহযুদ্ধ ও প্রক্সিযুদ্ধের স্থান হয়ে উঠতে পারে।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










