২০১১ সালে প্রকাশিত নিয়াল ফার্গুসন রচিত Civilization: The West and the Rest বইটির মূল্যায়ন করতে গেলে দেখা যায়, পশ্চিমা সভ্যতার বৈশ্বিক আধিপত্যের উত্থান হলো পাঁচ শতাব্দীর প্রায় একক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা; অন্তত এমনটাই মনে হবে এই বইয়ের পাঠ শেষে।
পশ্চিম কীভাবে তার পূর্ব প্রতিদ্বন্দ্বীদের ছাড়িয়ে গেল তা দেখাতে গিয়ে বহুল প্রশংসিত এই লেখক যুক্তি দিয়েছিলেন যে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে পশ্চিম ছয়টি শক্তিশালী নতুন ধারণার জন্ম দেয় - প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞান, আইনের শাসন (মূলত সম্পদের অধিকার), আধুনিক চিকিৎসা, ভোক্তাবাদ এবং কাজের নৈতিকতার বিকাশ। এটি তাদেরকে অন্যদের থেকে আলাদা হতে সাহায্য করেছিল।
তবে চমকপ্রদ লাগবে যে এই পশ্চিম ধীরে ধীরে নিজেদের এই ধারণার ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতে থাকে, অপর দিকে অন্য শক্তিগুলো তাদের দেখানো পথে এগিয়ে বেশ সাফল্য অর্জন করে।
বাস্তবে কতটা এগিয়েছে সভ্যতা বা অন্য ভাষায় বললে কতটা মানবিক হয়েছে- তা এই করোনাকালে একটি প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে। যেই ছয়টি ভিত্তি ফার্গুসন দেখিয়েছেন যার ওপর মূলত দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমা সভ্যতা বা অন্যান্য আধুনিক বৈশ্বিক অবকাঠামো তা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন।
মানবতার জয়গান যাদের মূলমন্ত্র বলে এতদিন প্রচার পেয়েছে, নিজ দেশ থেকে বহুদূরের দুই দেশের মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব রাষ্ট্র এতদিন ব্যস্ত ছিল হঠাৎ এই কভিড- ১৯ বাস্তবতায় তারা দায়িত্ব এড়িয়ে চলেছে সেইসব বিষয়ের যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এব সমস্যার স্রষ্টা তারা নিজেরাই।
ছোট কিছু উদাহরণ দেয়া যাক। আন্তর্জাতিক শিক্ষা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছে, যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ৫ বিলিয়ন ডলার বেশি। বর্তমান করোনা পরিস্থিতির কারণে আগামী তিন বছরে তাদের অর্থনীতি শুধু বৈদেশিক শিক্ষার্থী আসা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে ৬০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এই অনুমান থেকে তাদের অর্থনীতিতে বৈদেশিক শিক্ষার্থীদের অবদান আঁচ করা যায়। এরকম অবস্থায় তাদের প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন গত ৩ এপ্রিল অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছাড়া আর কারো দায়িত্ব না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ডব্লিউএইচওর ২০২০ এবং ২০২১ সালের জন্য ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেটের তহবিলের বেশিরভাগ আসে সদস্য দেশগুলোর বার্ষিক অনুদান থেকে; ২০১৮-২০১৯ এর প্রতিবেদন অনুসারে যা প্রায় ৫১ শতাংশ। সদস্যদের পাওনা (মূল্যায়ন ফি) একটি দেশের জনসংখ্যা এবং সম্পদের ওপর ভিত্তি করে গণনা করা হয়। সদস্য দেশগুলোও স্বেচ্ছাসেবী তহবিলের মাধ্যমে অবদান রাখে যার পরিমাণ অবশ্য নির্দিষ্ট করা থাকে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএইচওর সিংহভাগ তহবিল যোগান দিয়ে থাকে।
২০১৮-২০১৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডব্লিউএইচওর বাজেটে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবদান রেখেছিল। এই বছরের এই সংস্থার ৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বাজেটের এটি ছিল প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। বিবিসির মতে, তারা ২০১৮-১৯ বাজেটের ১৫ শতাংশ সরবরাহ করেছিল যা ৪০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০২০ সালের ৩১ মার্চের এক হিসাবে দেখা যায় এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেয়ার কথা রয়েছে যা অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প আটকে দেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাতার এয়ারওয়েজ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাকরি হ্রাস করার পরিকল্পনা করছে যেখানে কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে ফ্লাইট ব্যাহত হওয়ার ঘটনাকে।
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকবর আল-বেকার বিমানবালাদের জন্য দেয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আমাদের একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে অনেকগুলো সীমান্ত বন্ধ রয়েছে, আমাদের প্রচুর গন্তব্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং ফলস্বরূপ বিমানগুলো অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে, যেখানে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক পরিবর্তনের কোনও আশা নেই।’ মার্চ ২০১৯ এর এক আর্থিক বিবৃতি অনুযায়ী তাদের কর্মী সংখ্যা ৪৬ হাজার ৬৮৪ জন। অপরদিকে এয়ার এরাবিয়া ৫৭ জন কর্মী ছাঁটাই করেছে যখন এমিরেটস ও ইতিহাদ এয়ারওয়েজ কর্মীদের বেতন হ্রাস করেছে।
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব অব্যাহত থাকায় আমেরিকা এর বিস্তার কমিয়ে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি কিছু কর্মীদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেয় এই যুক্তিতে যে তারা অন্তত ঘরে থেকে কাজ করে অল্প আয়ের সুযোগ পাবে যেখানে বৈশ্বিকভাবে কর্মীরা চাকরি হারাবার ভয়ে আছে; করোনা প্রকোপ কমার সঙ্গে সঙ্গে এই বেতন আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলেই ব্যষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যার আপাত সমাধান দৃশ্যমান হবে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু এই সঙ্কটকালে আয় কমে যাওয়ায় বেশিরভাগ পরিবার দুর্ভোগের শিকার হবে। এই পারিশ্রমিক কর্তন কোনভাবে ফার্গুসনের মতবাদকে সমর্থন দেয় না।
সভ্যতা এগিয়েছে ঠিকই কিন্তু এর বিভিন্ন ক্রান্তিলগ্নে মানুষকে আদিম মানুষের মত শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষা করতেও দেখা গেছে। এই যেমন নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখতে বড় অর্থনীতিগুলোর বিভিন্ন পদক্ষেপ বেশ চোখে পড়ার মত।
মার্কিন হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ১২ মে প্রায় তিন ট্রিলিয়ন ডলারের করোনভাইরাস সহায়তা প্যাকেজ উন্মোচন করেছেন, যেখানে রাজ্য ও শহরগুলোর জন্য বরাদ্দ প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। প্রয়োজনীয় কর্মীদের জন্য ‘বিপত্তি বেতন’ এবং সাধারণ জনগণের মাঝে নগদ অর্থ প্রদানের জন্য নতুন করে এ বরাদ্দ বাড়ানো হয়। এর মাঝে শুধু কভিড ১৯ শনাক্তকরণ পরীক্ষার জন্য ৭৫ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে।
৭ এপ্রিল জাপানের মন্ত্রিসভা প্রায় ১০৮ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ৯৯৭ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা প্রকল্প ঘোষণা করে। যা পরবর্তীতে বেড়ে ১১৭ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ১ দশমিক ০৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে গিয়ে দাঁড়ায়।
চীনের পরিকল্পনা কিছুটা ভিন্ন। তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর জন্য তারল্যের বিপরীতে রিজার্ভের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করছে, এতে করে ব্যাংকগুলো ১৬৯ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেবার অনুমোদন পাবে।
৩০ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের সরকার ঘোষিত ১৩০ বিলিয়ন ডলার সমর্থন প্যাকেজ অস্ট্রেলীয়দের চাকরিতে রাখার এবং কাজের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের সমর্থন করার লক্ষ্যে গৃহীত এক নজরবিহীন পদক্ষেপ। বাজেটের ওপর ব্যয় হিসাবে মোট ২১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পদক্ষেপ নেয়া হয় ফেডারেল সরকার কর্তৃক মার্চ মাসের শেষে, যেখানে রাজ্যগুলো থেকে ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং রিজার্ভ ব্যাংক এবং ফেডারেল সরকার থেকে ঋণ স্বরূপ ১০৫ বিলিয়ন ডলার দেয়ার ঘোষণা করা হয়েছিল। সবশেষ এই সাহায্য প্যকেজের পরিমাণ দারিয়েছে ৩২০ বিলিয়ন ডলার।
ফ্রান্স শুধু পর্যটন শিল্পে প্রণোদনা দিচ্ছে ১৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তাদের অর্থমন্ত্রী ব্রুনো লে মেইরের মতে সমগ্র অর্থনীতির ওপর মোট প্রণোদনা হতে পারে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ইউরো।
ইতালির সরকার ৫৫ বিলিয়ন ইউরো বা ৫৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ অনুমোদন করেছে যা মূলত ব্যাবসায় উন্নয়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সাহায্যের জন্য বরাদ্দকৃত।
২০০ বিলিয়ন ইউরো বা ২২০ বিলিয়ন ডলারের দেশটির গণতান্ত্রিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ । এটি দেশের জিডিপির প্রায় এক পঞ্চমাংশের সমান।
বেসরকারি খাতে ১৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারসহ মোট ৩১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প গ্রহণ করেছে সৌদি আরব।
কাতার ২৩ দশমিক ৩৫ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ৭০ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্যকেজের পরিমাণ ৫৪০ বিলিয়ন ইউরো বা ৫৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এর বাইরেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতিগুলো নিয়েছে নানা রকম প্রকল্প। তবে এত এত ট্রিলিয়ন ডলারের মাঝে বৈশ্বিক দক্ষিণ পিছিয়ে পড়বে এবং তাদের অর্থনৈতিক ধস ঠেকানোর মত প্রয়োজনীয় অর্থ, গঠনতন্ত্র ও অবকাঠামোর অভাব তাদের উন্নতিকে বাধাগ্রস্ত করবে এ অনুমান উড়িয়ে দেয়ার মত নয়। করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) অনুমান করছে যে এ মহামারীর জন্য বিশ্বব্যাপী ৪.১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে এবং ইউএনসিটিএডিডি পূর্বাভাস দিয়েছে যে বৈশ্বিক বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রবাহ ৪০ শতাংশ কমবে। বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর কাছ থেকে ছোট অর্থনীতিগুলোকে ঘিরে তেমন বড় কোন প্রকল্প এখনো গৃহীত হয়নি। তাই সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছে পিছিয়ে পড়া অর্থনীতিগুলোর আরও পিছিয়ে পরার সম্ভাবনা যেখানে কার্যত বৃহৎ শক্তিগুলো আপাত নির্বিকার।
জন লক , জেরেমি বেন্থাম কিংবা ইমানুয়েল কান্ট জীবন, স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি যখন কার্ল ডব্লিউ ডয়েস, জোসেফ নাঈ, রবার্ট কিউহেনরা নব্য উদারবাদ নিয়ে বাণিজ্যের জয়গান করছেন যেখানে সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে মানুষের যৌক্তিক সত্ত্বাকে কর্মকের গুরুত্ব দেয়া হয় তখন আদতে বর্তমান কভিড-১৯ পরিস্থিতির দরুণ মরগেনথুর মতের সঙ্গেই মানব চরিত্রের বেশি মিল পাওয়া যায়। যখন তার লেখা পরে বোঝা যায় যে চীন, ভারত এবং গ্রিসের ধ্রুপদী দর্শনগুলো বাস্তববাদী আইনগুলো আবিষ্কার করার চেষ্টা করার পর থেকে মানুষের প্রকৃতি (যা মূলত অযৌক্তিক ও আত্মকেন্দ্রিক- যেখানে রাজনীতির আইনগুলোর শিকড় রয়েছে) পরিবর্তিত হয়নি। এই কভিড- ১৯ আসলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বাস্তববাদী তাত্ত্বিকদের আপাত বিজয়।
জাতিরাষ্ট্রের উত্থানের শুরু থেকেই রাষ্ট্রেগুলোর মাঝে বাস্তববাদী চেতনার বিকাশ প্রকটভাবে দেখা যায়। এ কারণেই মূলত নানা সময় নানা যুদ্ধ দেখা যায় আবার যুদ্ধ অবস্থা না থাকলেও বিভিন্ন দুর্যোগের সময় রাষ্ট্রগুলোকে নিজ স্বার্থ সবার আগে রক্ষা করতে দেখা যায়- কারণ তারা বিশ্বাস করতে থাকে , রাষ্ট্রই যেহেতু তাদের সার্বিকভাবে রক্ষা করে, তাই রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার জন্য যেকোনো পদক্ষেপই সমর্থনযোগ্য। তাই বলা যায় যে বাস্তববাদ তত্ত্বের প্রধান কর্মক হচ্ছে রাষ্ট্র। এখন এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা তা ঐতিহ্যগত বা অপ্রচলিত যাই হোক না কেন তা রক্ষার উদ্দেশ্যে নীতি প্রণেতারা যে সোচ্চার হবেন তা আর নতুন কি? আবার রাষ্ট্রই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাস্তববাদীদের কাছে তা বোঝার আরেকটি পথ হতে পারে থমাস হবসের নিরাপত্তার উভয় সঙ্কট বোঝা।
বাস্তববাদী চিন্তার আরেকজন তাত্ত্বিক থমাস হবস। তার মতে, প্রকৃতিররাজ্যে মানুষ যখন বসবাস করত তখন তাদের প্রত্যেকের ভেতরেই এক ধরনের নিরাপত্তা সঙ্কট ছিল। এটি থেকে মুক্তির জন্যই মানুষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে ঝুঁকে পড়ে, যেখানে প্রত্যাশা করা হয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র তাদেরকে নিরাপত্তা ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী (প্রকৃতিররাজ্যে) প্রতিষ্ঠার পর দেখা দেয় নতুন সঙ্কটের- কেননা এক রাষ্ট্রের অপর রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি নতুনভাবে সামনে আসে। ফলে দেখা যায় যে, দুটি পর্যায়েই নিরাপত্তা ঝুঁকি বিদ্যমান, যাকে হবস নিরাপত্তার উভয় সঙ্কট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে তিনি গোষ্ঠীকে (বর্তমান রাষ্ট্র) অধিকতর ভালো মনে করেন কেননা এটি বিশ্রাম নেয় না, ঘুমায় না। একারণেই একজন ব্যক্তি অপরজনকে নিরাপত্তা প্রদানে যতটা সক্ষম গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র তার থেকে কার্যকরভাবে তা নিশ্চিত করতে সক্ষম। বাস্তববাদী এসব চিন্তাধারা বুঝতে তার বিখ্যাত Leviathan গ্রন্থের সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
বাস্তববাদকে অনেকটা কাঠামোগত রূপদান করেন হান্স জে মরগেনথু। তিনি ‘Politics Among Nations’ গ্রন্থের মাধ্যমে বাস্তববাদের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে নতুন কিছু বিষয়ের অবতারণা করেন। যেমন মানব প্রকৃতি বা আচরণ। তার প্রবর্তিত বাস্তববাদকে নব্য ধ্রুপদী বাস্তববাদ নামে অভিহিত করেন রবার্ট জ্যাকসন ও জর্জ সরেন্সেন। তিনি নিম্নোক্ত ছয়টি মূলনীতির বিষয় উল্লেখ করেন,
১। রাজনীতির মূল, উৎপত্তিগতভাবেই অপরিবর্তনীয় মানব প্রকৃতির মধ্যে নিহিত, যা আত্মকেন্দ্রিক।
- খেয়াল করলে দেখা যাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের জন্য প্রণোদনা প্যকেজ ঘোষণা করেছে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলার অপরদিকে ডব্লিউএইচওর ব্যপারে বিভিন্ন হিসেব সামনে চলে আসছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দোষারোপ করার প্রবণতাও এখানে লক্ষণীয়।
২। রাজনীতি একটি স্বতন্ত্র বিষয়, এটিকে অর্থনীতি বা নীতিবিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত করা যাবে না। রাজনীতিবিদদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে রাজনীতি পরিচালনা করতে হবে।
- বৈশ্বিকভাবে এমনকি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে লকডাউন থাকবে কি থাকবে না এই নিয়ে জনসাধারণের মনে রয়েছে নানা জল্পনা কল্পনা। প্রশ্ন হয়ে সবথেকে বেশি যে বিষয়টি সামনে আসে তা হল লকডাউন থাকলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী খাবে কি বা অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলবে কিভাবে? কিন্তু ২ নং বক্তব্য অনুসরণ করলে দেখা যাবে রাজনীতিবিদেরা তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞায় যা সঠিক মনে করবেন তাই করা হবে তাদের জন্য এই নীতির কার্যকর অনুসরণ।
৩। আত্মস্বার্থ একটি মৌলিক বিষয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতি হল সেটি প্রকাশের সর্বোত্তম স্থান। অবশ্য রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রকৃতি অবস্থাভেদে পরিবর্তিত হলেও স্বার্থের ধারণা অপরিবর্তিত থাকে।
- নিজেদের সুবিধার জন্য চীন, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সহ বেশ কিছু দেশ বিদেশি নাগরিকদের তাদের দেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্নরকম বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এখানে মুখ্য প্রাধান্য অর্জন করেছে নিজের সুরক্ষা। শেষের অংশ মূলত প্রকাশ করছে এই ভাবনা যে এই সঙ্কট শেষে আবার তাদের দরজা খুলে যাবে সবার জন্য যেখানে মুখ্য প্রাধান্য পাবে তাদের নীতি ও স্বার্থ।
৪। রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা ব্যক্তি পর্যায়ের নৈতিকতা থেকে ভিন্ন। বিশ্বজনীন নৈতিকতার মূলনীতিসমূহ রাষ্ট্রীয় আচরণকে দিক নির্দেশনা দেয়না। রাষ্ট্র ব্যক্তি নৈতিকতা দ্বারা প্রভাবিত হলেও তার প্রতিনিধিত্ব করেনা। রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক ঘটনার মাধ্যমে।
- কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর অসুবিধার কথা মাথায় রেখে রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত নিবে না- অন্তত এই মত তাই বলছে। এ কারণেই প্রণোদনায় কে অন্তর্ভুক্ত নয় বা কোন খাত আওতাভুক্ত হবে তার থেকে বেশি গুরুত্ত পায় রাষ্ট্রের আসলে কি দরকার বা রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে কিভাবে উপকৃত হবে?
৫। বাস্তববাদীরা বলেন একটি রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন তার নিজের আদর্শ অন্য রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেয়া যাবে না। কেননা এর বিরূপ প্রভাব নিজ রাষ্ট্রের ওপরই পরতে পারে।
- এ কারণেই বড় কোন শর্তযুক্ত সাহায্যের আশ্বাস দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য এই বিষয়ে আলোচনার সময় এখনো আসেনি।
৬। রাজনীতি মানুষের সীমাবদ্ধতা, অপূর্ণতা এগুলো নিয়েই কাজ করে। এগুলোই আসলে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মৌলিক বিষয়।
- এই জন্যই চিকিৎসাশাস্ত্রের এই চরম উৎকর্ষের সময় যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিমিষেই সমাধান করা যাচ্ছে তখন এক কভিড- ১৯ মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে গোটা বিশ্ব। এখানেই রয়েছে ভবিষ্যৎ রাজনীতির চাবি- কে প্রথম আবিষ্কার করবে টীকা? তা কি সকলের জন্য উন্মুক্ত হবে? সব দেশে কি একই মূল্যমানে বিক্রি হবে তা? সব দেশে সরবরাহকৃত ওষুধের মান কি একই হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক বছরের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রূপরেখা।
এই ছয়টি মূলনীতি একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে আর বিভিন্ন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তসমূহ দেখলে এর মাঝে এক সম্পর্ক নিরূপণ করা খুব একটা কষ্টের হয় না।
তবে ভুলে গেলে চলবে না বিশ্বায়নের এই যুগে শুধু নিজের রাষ্ট্রভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বৈশ্বিক ঘটনাবলী থেকে নিজেকে আলাদা করে রাখলে শেষ পর্যন্ত নিজের উন্নয়ন ব্যহত হওয়া ছাড়া আর কিছু আশা করা হবে অবাস্তব। তাছাড়া বাস্তববাদ বলি আর যাই বলি মানবতার বাইরে যাবার খুব বেশি সুযোগ এই একবিংশ শতাব্দী দেবে না।
লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
raiyanamir@gmail.com
তথ্যসূত্র
https://bonikbarta.net/
https://edition.cnn.com/2020/05/15/politics/house-vote-covid-aid-3-trillion-remote-voting/index.html
https://iclg.com/briefing/11570-covid-19-coronavirus-german-government-stimulus-package-for-private-equity-and-venture-capital-financed-companies
https://tbsnews.net/coronavirus-chronicle/qatar-airways-planning-substantial-job-cuts-77875
https://treasury.gov.au/coronavirus
https://www.aa.com.tr/en/europe/spain-announces-a-220b-stimulus-package/1769513
https://www.bbc.com/news/business-52450850
https://www.bbc.com/news/world-us-canada-52289056
https://www.businessinsider.com/salary-cuts-coronavirus-could-slow-economic-recovery-recession-labor-market-2020-4
https://www.cnbc.com/2020/04/10/eu-approves-half-a-trillion-in-virus-stimulus-but-no-corona-bonds.html
https://www.cnbc.com/2020/04/22/coronavirus-job-losses-and-pay-cuts-are-hitting-these-households-the-hardest.html
https://www.dailysabah.com/business/economy/france-announces-194b-stimulus-package-for-virus-hit-tourism-sector
https://www.france24.com/en/20200415-france-boosts-covid-19-economic-rescue-package-to-%E2%82%AC110-billion
https://www.france24.com/en/20200513-italy-covid-19-coronavirus-giuseppe-conte-stimulus-bailout
https://www.inquirer.com/health/coronavirus/coronavirus-stimulus-nancy-pelosi-3-trillion-dollars-friday-vote-congress-20200512.html
https://www.macrobusiness.com.au/2019/11/australias-37-6b-international-student-export-con/
https://www.smh.com.au/politics/federal/loss-of-international-students-set-to-blow-30b-60b-hole-in-economy-20200416-p54kif.html
https://www.theguardian.com/australia-news/2020/mar/31/australian-economic-stimulus-package-how-much-governments-have-committed-to-coronavirus-crisis
https://www.wtsp.com/article/news/health/coronavirus/what-is-world-health-organization-what-does-it-do-us-funding/67-d794b448-69cb-42f6-a640-0c484f6eac17
Introduction to International Relations Theories and Approaches (Fifth Edition) by Robert Jackson and Georg Sørensen










