করোনা মহামারীর এই দুঃসময়ে যেমন পৃথিবীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন হচ্ছে তেমনি এই পরিবর্তন মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিদিনকার আচরণের উপর প্রভাব ফেলেছে। চিরাচরিতভাবে মানুষে যে একাকিত্বকে ঘোচাতে প্রাচীনকাল থেকেই সমাজ গড়ে তুলেছে এবং মানুষ চেষ্টা করেছে অন্যের সাথে মিশতে, আজ করোনাভীতির কারণে সেই একাকিত্বকে মানুষ সাদরে মেনে নিচ্ছে নিজের নিকটাত্মীয়েরও দূরে ঠেলে দিয়ে। আর করোনাকালীন সময়ে এইসব পরিবর্তন মানুষের স্বাভাবিক বেঁচে থাকাকে করেছে দুর্বিষহ। যার ফলশ্রুতিতে বাড়ছে ঘৃণ্য অপরাধ বা হেটক্রাইম এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনা। আর এই পরিবর্তন যে দুটি বিষয় এর কারণে হচ্ছে তা হলো, ‘ভয়’ ও ‘ভীতি’।
এই দুটি শব্দের সাথেই আমরা অনেক আগে থেকেই পরিচিত। দুটো শব্দের অর্থ এবং তাৎপর্য খুবই কাছাকাছি হলেও এদের মাঝে বিস্তর এক ফারাক বিদ্যমান। ভয় বিষয়টা সাময়িক এবং অল্প সময়ের জন্য স্থায়ী থাকে। অন্যদিকে ভীতি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী এবং নিম্নে ৬মাস থেকে আজীবন মৃত্যুর আগে পর্যন্ত মানুষের মাঝে প্রভাব থাকতে পারে। ভয় সার্বজনীন একটা ব্যাপার, এটা যেকোন কারণেই হতে পারে। কিন্তু ভীতিটা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে। ভয় মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু অন্যদিকে ভীতি মানসিক সমস্যার একটি অংশ। ভয় একটি একক বিষয় কিন্তু অপরদিকে ভীতি চলমান অনেকগুলো ভয়ের সমষ্টি। একটি উদাহরণ দিলে সবার জন্য ভয় এবং ভীতির বিষয়টি সহজ হয়ে যাবে অনেকটা। যেমন, আপনি একদিন মোটরসাইকেল চালিয়ে কোথাও যাচ্ছেন, এর মাঝে রাস্তাতে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে, আপনি প্রায় মৃত্যুর থেকে বেঁচে ফিরলেন। ঘটনাটি ঘটার সময় আপনি প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলেন। দুর্ঘটনার কিছু দিন পরে আপনি সুস্থ হয়ে আবারো মোটরসাইকেলের কাছে আসলেন চালানোর জন্য কিন্তু আপনার মাঝে সেই ঘটনা মনে হতে থাকলো এবং সেটা আপনাকে মোটর সাইকেলে চালানো থেকে বিরত রাখলো। এই ঘটনাটি হচ্ছে ভীতি এবং এটি দীর্ঘদিন আপনার মাঝে বিরাজ করবে।
ভীতি শব্দটির একটি সুন্দর ইংরেজী প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘ফোবিয়া’ (Fobia)। মনোবিজ্ঞানের জগতে ফোবিয়া একটি বিস্তর বিষয়। এ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন। তারা অনেকেই বলেছেন, ফোবিয়া হচ্ছে মানষিক অস্থিতিশীলতার একটি নামান্তর। মানুষের মাঝে যখন কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ বা ভয় থাকে তখন সেটি থেকে ফোবিয়া সৃষ্টি হতে পারে অথবা ফোবিয়া জন্মগত বা জীনগতভাবে কারো কারো মাঝে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীরা ফোবিয়াকে মোটাদাগে চারটি ভাগে ভাগ করেছেন। এর মধ্যে আছে প্রাণী সম্পর্কিত ফোবিয়া (যেমন- মাকরসা, কুকুর, সাপ ইত্যাদি); প্রাকৃতিক বিষয়ে ফোবিয়া (যেমন- ঝড়, বজ্রপাত, পানি, অন্ধকার, উচ্চতা ইত্যাদি); রক্ত কিংবা আঘাত বিষয়ে ফোবিয়া (যেমন: রক্ত, ইঞ্জেকশন, হাত পা ভাঙ্গা ইত্যাদি); নির্দিষ্ট কোন বিষয়ে ফোবিয়া (যেমন: প্লেনে যাত্রা, লিফটে উঠা, গাড়ি চালানো ইত্যাদি)। এগুলোর মাঝে প্রায় শ'খানেক ফোবিয়া বিদ্যমান। এতগুলো ফোবিয়া নিয়ে কথা বলা বিস্তারিত বিষয়, লেখার কলেবর বিবেচনায় এই বিষয়ে আর বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই।
এখন মূল আলোচনায় আসি, যদি ফোবিয়ার কারণে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে ব্যক্তি এড়িয়ে যায় তাহলে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, করোনা ফোবিয়ার কারণে কোন জিনিসটাকে মানুষ এড়িয়ে যাবে বা দূরে থাকবে? কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, করোনা ফোবিয়ার কারণে মানুষ তার স্বজাতিকেই অর্থাৎ নিজের পরিবারের, আত্মীয়কে অথবা পাড়া প্রতিবেশি সমাজের মানুষকেই এড়িয়ে চলছে। এখন সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষ কীভাবে অন্য মানুষদের এড়িয়ে চলব এই নীতি। করোনা একটি ভাইরাসবাহী রোগ হলেও মানুষই একমাত্র বাহন এই রোগ ছড়ানোর জন্য। তাই মানুষ এখন প্রতি পদক্ষেপে ভয় পাচ্ছে, কখন সে করোনার ভয়াল থাবার শিকার হয়। এর কারণে অনেকেই তাদের স্বাভাবিক আচার আচরণ করতে পারছেন না বলে সমাজতত্ত্বিক ও মনোবিজ্ঞানীগণ মতপ্রকাশ করছেন। এ ভয় থেকেই মানুষ অনেকবেশি অমানবিক কাজ শুরু করেছে যা কিছুদিন যাবত আমাদের সামনে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে উঠে আসছে। আমি তেমনি কিছু ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছি গত ১৪ এপ্রিলের দৈনিক প্রথম আলোর একটি সংবাদে উঠে আসে যে, ৫০ বছর বয়সী এক মাকে করোনা সন্দেহে মধুপুরের বনে ফেলে যায় তার এক ছেলে, দুই মেয়ে এবং তাদের জামাতারা।
একইরকমভাবে, ফেনীর সোনাগাজীতে ৫৫ বছর বয়সী বৃদ্ধবাবার জ্বর, কাশি হলে তিনি করোনা টেস্টের জন্য নমুনা দিয়ে আসেন কিন্তু তার পরিবার তাকে করোনা সন্দেহে একটি রুমে আটক করে রাখে, বৃদ্ধলোকটি মারা যাওয়ার আগে সাহায্যের জন্য অনেক ডাকাডাকি করলেও তার কাছে পরিবারের কেউ যায়নি। নারায়ণগঞ্জের এক ডাক্তারের পরিবারের ১৭ জন করোনা আক্রান্ত হলে এলাকাবাসী তাদের প্রতি নানা ধরনের খারাপ ব্যবহার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। বিগত ৬ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটে ৫০ বছর বয়সী এক মাকে তার সন্তানেরা করোনা সন্দেহে ফেলে আসে। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা সন্দেহে রোগীদের ভর্তি না নেওয়ার প্রচুর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে বলে আমরা পত্র-পত্রিকায় সংবাদ মারফত জানতে পারি, এবং এর ফলে অনেকেই চিকিৎসার অভাবে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। যেসব দেশগুলো করোনা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে যেমন, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, কিউবা, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড সেসব দেশেও করোনা ভীতি এখন চলমান। জিল নিওভি তার লেখাতে প্রকাশ করেন যে, অষ্ট্রেলিয়াতে লকডাউন খুলে দেওয়ার পরও অনেকে বাইরে যেতে বা কাজে যোগদান করতে অনিচ্ছুক, তারা ঘরে থাকতেই বেশি সুরক্ষিত মনে করছেন।
এ সকল অমানবিক এবং নৃশংস কাজ যারা করছে তারা নিজেদের অজান্তে করোনার প্রতি ভয় থেকেই করছে, এ সকল কাজ মানসিক অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে নিয়ে যায়।
এত সব খারাপ সংবাদের মাঝেও অনেক মানবিক সাহায্যের এবং করোনা ভয়কে জয় করার সংবাদও আছে। যেমন, অনেক স্বেচ্ছাসেবী দল নিজ উদ্যোগে করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তিদের সৎকারের ব্যবস্থা করছেন, ভারতের উত্তর প্রদেশের রবি শংকর নামে এক ব্যক্তি করোনাতে মারা গেলে তার আশে পাশের কেউ সৎকারের দায়িত্ব না নিলে একদল মুসলিম যুবক তার যথাযথ সৎকারের ব্যবস্থা করে। অন্যদিকে, মুম্বাইতে এক মুসলিম বৃদ্ধ করোনাতে মারা গেলে এলাকাবাসী তাকে দাফন করতে বাধা দেয়, পরে স্থানীয় কয়েকজন হিন্দু ব্যক্তি পরিবারের অনুমতি নিয়ে তাকে শ্মশানে পোড়ানোর ব্যবস্থা করে। আমাদের দেশেও আঞ্জুমান মুফিদুল, কোয়ান্টাম ও মারকাজুল ইসলাম নামের সংগঠন লাশ দাফনের কাজ করছে। নাম না জানা অনেক অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার মৃতদেহ এবং করোনা রোগীদের পরিবহনের কাজ করছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। এখান থেকে আমরা বুঝি যে, বিশ্বের এমন ক্রান্তিলগ্নে মানুষ ধর্ম ভেদাভেদ ভুলে অসাম্প্রদায়িকভাবে এক অপরকে সাহায্য করছে যা আমাদের জন্য অত্যন্ত সুসংবাদ। নারায়ণগঞ্জ সিটি ১৩ নাম্বার ওয়ার্ড কাউন্সিলর খন্দকার খোরশেদ, যিনি প্রায় ৬১ জন করোনা আক্রান্ত বা করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তিদের দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন, তিনি গত ৩০ মে করোনা পজেটিভ হন এবং তার স্ত্রীও আইসোলেশনে আছেন এবং বর্তমানে তিনি সুস্থ হয়ে আবারো কাজে যোগদান করেছেন। আমরা জানি যে, পুরো বিশ্বের ডাক্তাররা, নার্সরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন এবং এতে অনেক ডাক্তারও করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এরপরেও কিন্তু তাদের সেবাদান বন্ধ হয়ে যায়নি। অনেক পুলিশ ভাইও তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষকে ঘরে রাখার দায়িত্ব পালন করছেন। এমন দুঃসময়ে যারা মানবতার হাত অন্যদের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে সে সকল অকুতোভয় করোনা যোদ্ধাদের প্রতি থাকবে আমাদের গভীর শ্রদ্ধা এবং শুভকামনা।
করোনার জন্য নির্দিষ্ট কোন অসুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কার না হলেও আক্রান্ত ব্যাক্তির দৃঢ় মনোবলের সাহায্যে এ রোগ থেকে পরিত্রাণ সম্ভব। তাই বিশ্বের এই ক্রান্তিলগ্নে আমরা করোনা আক্রান্তদের সাথে যথাসম্ভব মানবিক ও সহানুভুতিশীল আচরণ করবো। আশাকরি, আমরা করোনার ভীতিকে দূর করতে পারবো মন থেকে এবং সকল খারাপ কাজকে পিছনে ফেলে করোনাযুদ্ধে সবাই নিজেদের জায়গা থেকে নিজেদের সুরক্ষা করবো এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরা করবো, একমাত্র তাতেই আমাদের জয় আসবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ৩য়বর্ষ, অপরাধতত্ত্ব ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগ
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল










