একসময় অভ্যন্তরীণ আয়ের বেশির ভাগই ব্যয় হতো আমাদের চাল আমদানিতে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত আধুনিক ধানের জাত ও চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ খাদ্যঘাটতির দুর্নাম ঘুচিয়ে খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে; সাশ্রয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। তীব্র খাদ্যঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ এবং গড় ফলনের হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম। মাঠে কৃষক এ ধান উৎপাদনের কারিগর হলেও নেপথ্যে রয়েছে ব্রির বিশেষ ভূমিকা। গতকাল ছিল ব্রির সুবর্ণজয়ন্তী। স্বাধীনতা পদকসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক অর্জন তাদের ঝুলিতে। ধান গবেষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে সহযোগিতার টেকসই সেতুবন্ধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

ধানকে এ দেশের জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা বলতে মূলত ধান বা চালের নিরাপত্তাকেই বোঝায়। ব্রি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এ দেশের ক্রমবর্ধমান জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির গবেষকরা। ১৯৭১ সালে সাত কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে চাল উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। ৪৯ বছর পর সাড়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বিপরীতে চাল উৎপাদন হচ্ছে ৩ কোটি ৮৭ লাখ টন। খাদ্যোৎপাদনে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে ব্রির উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কারণে। উন্নত জাত দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া এখন মূল চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ব্রির কাছে গণমানুষের প্রত্যাশা হলো, হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে সক্ষম উফশী জাত উদ্ভাবনে তাদের গবেষণা আরো জোরদার করবে।

বর্তমান স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা উদ্বৃত্ত উৎপাদন একদিনে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ধানবিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম। প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বয়ংসম্পূর্ণতা টেকসই হবে কিনা? কারণ টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের বড় চ্যালেঞ্জ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রমহ্রাসমান সম্পদ (কৃষিজমি, শ্রমিক, পানি ইত্যাদি) ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত (বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা প্রভৃতি) এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে বিপুল অঞ্চলে ধান চাষ কঠিন হয়ে পড়ছে। উত্তরাঞ্চলে পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ বেড়ে ওঠায় খাদ্যে তার প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া ও উপরিস্থ পানির সংকটের কারণেও বোরো ধানের চাষ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অসময়ে বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো ধানও আবিষ্কার প্রয়োজন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দ্রুতই আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসছে। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন করতে না পারলে ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ধান গবেষণা জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে তারা আর্সেনিক-সহিষ্ণু ধান উদ্ভাবনে সাফল্য অর্জন করেছে। ধান গবেষণায় সরকারের বরাদ্দ এখনো কম, এটি আরো বাড়াতে হবে। দক্ষ জনবলের অভাবের কথাও শোনা যায়, দ্রুতই তা পূরণ করা প্রয়োজন। ধানের রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবও বাড়ছে। এটি প্রতিরোধ ও ধানের পুষ্টিমান উন্নয়ন করতে হবে।

টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের লক্ষ্য পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি। এটি মোকাবেলায় প্রয়োজন আধুনিক ধানের জাতগুলোর জেনেটিক গেইন ত্বরান্বিতকরণ। দেশে প্রতি বছর ধানি জমি কমছে; ফলে চাষের জমি সম্প্রসারণের সুযোগ নেই। উৎপাদন বাড়াতে হবে উলম্বভাবে। বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা পূরণে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি প্রয়োজন গবেষণা মাঠ ও কৃষক পর্যায়ে ফলনের পার্থক্য কমানো। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সীমিত ও ক্রমহ্রাসমান সম্পদের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণ। জমির উর্বরতা শক্তি ধরে রাখতেও গবেষণা প্রয়োজন। আরেকটি উপায় হচ্ছে ধানভিত্তিক শস্য বিন্যাসে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, নতুন নতুন স্বল্পমেয়াদি জাতগুলো চাষের মাধ্যমে একই জমি থেকে বছরে অধিক পরিমাণে আয় করা। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ধান চাষে সেচ বা পানি সরবরাহের নিশ্চয়তা। ধান একটি অধিক পানি শোষণকারী ফসল। আউশ ও আমন বৃষ্টিনির্ভর হলেও বোরো মৌসুমে ধানের জমি সেচের কাজে ব্যবহূত হয় ভূগর্ভস্থ পানি, যা ভবিষ্যৎ আশঙ্কার কারণ। কেননা অনবরত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ও ব্যবহারের কারণে ভবিষ্যতে সুপেয় পানির অভাব দেখা দিতে পারে। এদিকে দৃষ্টি দিয়ে স্বল্প সেচসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবনে মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন।

বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থা আধুনিক হয়েছে। কৃষিতে অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও ধান চাষে আধুনিক জাত এবং প্রযুক্তির বিস্তার ও ব্যবহার বাড়াতে হবে। সর্বোপরি ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্রির আধুনিকায়ন প্রয়োজন। এর গবেষণাগারকে আরো উন্নত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা যেতে পারে। শুধু গবেষণা করে নতুন জাত উদ্ভাবন করলেই হবে না, পুষ্টিমান উন্নয়নের পাশাপাশি বায়োসেফটিও নিশ্চিতে জোর দিতে হবে। জিএমওসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ধানের আর্বিভাব ঘটছে। এক্ষেত্রে মানুষের সেফটি নিশ্চিত করতে হবে। টেকসই খাদ্যনিরাপত্তার জন্য ধানের জাতের উন্নয়ন ও ধান উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনই ব্রির লক্ষ্য হওয়া উচিত। উন্নয়নের মাধ্যমে কম খরচে অধিক ও মানসম্পন্ন ধান উৎপাদনে অবদান রাখা; বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মান সংরক্ষণের মাধ্যমে রোগ, পোকামাকড়, সার, মাটি ও পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা; বৈরী পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো ধানের জাত উদ্ভাবন ও প্রাগ্রসর গবেষণার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে দৃষ্টি থাকবে বলে প্রত্যাশা।