আমরা বাংলাদেশী নাগরিক যারা, প্রতিনিয়ত কর দিয়ে যাচ্ছি, বিভিন্নভাবে তারাই বারবার করের আওতায় এসেছি, কিন্তু যাদের বিভিন্ন আয় লুকানো থাকে বা তারা তাদের নামে ওই আয় রিটার্নে দেখায় না, উনারা করের আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। উনাদের লায়াবিলিটিজ বা দায়, আর আয়ের সামঞ্জস্যটা না ঠিক করেই উনারা রিটার্ন দিয়ে যাচ্ছেন, কোনো সুবিধা তো হচ্ছে না, কারণ কেউ খতিয়ে দেখছেন না। অনেক ক্ষেত্রে উনারা এ করের আওতার বাইরে থেকেই যাচ্ছেন।

আমাদের ট্যাক্স পলিসি আর ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টের জনবল, ট্যাক্স সাবমিশন সিস্টেম সবই এর জন্য দায়ী। আর আয়কর দাতাদের তো সদিচ্ছার অভাব আছেই, কারো কারো অভিযোগ, এই যে এত টাকা ট্যাক্স দেয়, তা দিয়ে কী হয় জনগণকে দেখালে জনগণ কিছুটা স্বস্তি পেত, আর আস্থা অর্জনও হতো।

কারা আয়কর দেবেন: স্বাভাবিক ব্যক্তি, কোম্পানি কিংবা প্রতিষ্ঠান, আয়কর আইন ২০২৩, ধারা ১৬৬ অনুসারে আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রযোজ্যতা রয়েছে।

৪৩টি ক্ষেত্রে রিটার্ন জমা দেয়ার প্রমাণপত্র লাগে। আগে টিআইএন থাকলেই হতো। এখন টিআইএন থাকলেই আপনার করযোগ্য আয় থাকুক বা না থাকুক, আপনাকে আয়কর রিটার্ন দিতে হবে, কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। জেনে নিন, কাদের আয়কর রিটার্ন দিতে হবে এবং দিতে হবে না।

(ক) যাদের করযোগ্য আয় রয়েছে—

১. কোনো ব্যক্তি করদাতার আয় যদি বছরে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি হয়;

২. তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা, নারী ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের পুরুষ করদাতার আয় যদি বছরে ৪ লাখ টাকার বেশি হয়;

৩. প্রতিবন্ধী করদাতার আয় যদি বছরে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হয়।

৪. গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা করদাতার আয় যদি বছরে ৫ লাখ টাকার বেশি হয়।

(খ) যাদের আবশ্যিকভাবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে:

১. করদাতার মোট আয় করমুক্ত আয়ের সীমা অতিক্রম করলে;

২. সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষের অব্যবহিত পূর্ববর্তী তিন বছরের মধ্যে কোনো বছর তার কর নির্ধারণ করা হয়;

৩. কোনো ফার্ম, কোনো ব্যক্তিসংঘ ও কোনো ফার্মের অংশীদার হলে;

৪. কোম্পানির কোনো শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী হলে;

৫. গণকর্মচারী হলে;

৬. কোনো ব্যবসায় নির্বাহী বা ব্যবস্থাপকের পদধারী কোনো কর্মচারী;

৭. কেবল দাতব্য উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যতীত, সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষে এরূপ কোনো আয়প্রাপ্ত হন বা অংশ ৬-এর প্রথম অধ্যায়ের অধীন কর অব্যাহতি বা হ্রাসকৃত কর হার সুবিধাপ্রাপ্ত।

৮. ধারা ২৬১ অনুসারে করদাতা হিসেবে নিবন্ধনযোগ্য কোনো ব্যক্তি; বা

৯. ধারা ২৬৪ অনুযায়ী রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, এমন ৪৩টি ক্ষেত্রে।

(গ) যাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয়: ধারা ১৬৬ (২) অনুযায়ী নিম্নবর্ণিত ব্যক্তিদের জন্য আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক নয়, যথা-

(১) কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, (২) বাংলা ভাষায় পাঠদানকারী প্রাথমিক বা প্রাক্-প্রাথমিক বিদ্যালয় বা সরকারি মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় বা মাসিক পেমেন্ট আদেশভুক্ত (এমপিও) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং (৩) যার ইংরেজি ভার্সন কারিকুলাম নেই; (৪) সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়; (৫) বাংলাদেশ ব্যাংক; (৬) স্থানীয় কর্তৃপক্ষ; (৭) সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, যার সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তহবিল ও সুদ আয় ছাড়া অন্য আয় নেই; (৮) আপাতত বলবৎ কোনো আইন দ্বারা বা আইনের অধীন প্রতিষ্ঠিত বা গঠিত যেকোনো সত্তা, যাদের সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তহবিল ছাড়া অন্য কোনো আয় নেই; (৯) সরকারি ভবিষ্য তহবিল ও সরকারি পেনশন তহবিল; (১০) কোনো অ-নিবাসী স্বাভাবিক ব্যক্তি, যার বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট ভিত্তি নেই; বা (১১) বোর্ড কর্তৃক, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, রিটার্ন দাখিল করা হতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের।

টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর: পরোক্ষ করের আওতায় আরেকটি ক্ষেত্রে করদাতা ভয় পান ডিক্লারেশন দিতে, কারণ আবার সেই পলিসি। টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর হিসেবে কর্তিত আগাম কর এর চেয়ে কম মুনাফা কিংবা লোকসান হলে পরবর্তী বছরগুলোর মুনাফার সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ আসছে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে।

বর্তমানে দেশের কোম্পানির টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম কর শূন্য দশমিক ৬ থেকে ৩ শতাংশ। অর্থাৎ, যেকোনো ধরনের কোম্পানিকে তাদের টার্নওভারের ওপর ন্যূনতম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কর দিতে হয়। এছাড়া মোবাইল ফোন কোম্পানির ক্ষেত্রে ২ শতাংশ, তামাক ও কার্বনেটেড বেভারেজ কোম্পানির ওপর ৩ শতাংশ ন্যূনতম কর প্রযোজ্য রয়েছে।

মোট রফতানির ওপর ১ শতাংশ উৎসে কর হিসেবে কোনো কোম্পানির কাছ থেকে ১ কোটি টাকা নেয়ার পর চূড়ান্ত রিটার্ন দাখিলের সময় যদি দেখা যায়, বাস্তবে ওই কোম্পানির কর দিতে হবে ৩০ লাখ টাকা। তখন এনবিআর বাড়তি নেয়া ৭০ লাখ টাকা আর ফেরত দেয় না। অথচ ওই কোম্পানির অন্যান্য বিভিন্ন হিসাবে যদি এনবিআর ১০ লাখ টাকা কর পাওয়া হয়, সেটিও কোম্পানিকে দিতে হয়। অর্থাৎ কোম্পানিটির মোট কর দেয়ার কথা ৪০ লাখ, কিন্তু দিতে হচ্ছে ১ কোটি ১০ লাখ।

সমন্বয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে এনবিআরের ট্যাক্স বিভাগের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি বাজেটে পরিষ্কার করা হবে। তবে যদি কর্তিত করের চেয়ে বেশি কর আদায় হয়—ওই কর সরকারের কোষাগারে থাকবে। পরবর্তী যেকোনো বছরে যদি উক্ত ব্যবসায়ী বেশি মুনাফা করেন, কিংবা অন্য কোনো কারণে বেশি ট্যাক্স দায় আসে, তাহলে ওই টাকা থেকে তিনি সমন্বয় করতে পারবেন। এনবিআর চেয়ারম্যান তাদের আশ্বস্ত করেছে যে আগামী অর্থবছর থেকেই ন্যূনতম অগ্রিম করের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হবে।

রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ট্যাক্স-সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট দরকার: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেছেন, এবার অনলাইনে রিটার্ন জমা সফল হয়েছে। আগামী বছর অনলাইনে রিটার্ন দেয়া বাধ্যতামূলক করা হবে। অনলাইনে রিটার্ন না দেয়ার কোনো উপায় নেই। পুরোপুরি অনলাইনে রিটার্ন দিতে হবে। অনলাইনে রিটার্ন জমায় সময় ও অর্থ বাঁচে। আর টেনশন একদমই থাকে না। কারণ ক্যালকুলেশন তো, কোনটা ট্যাক্সেবল, কোনটার কত করহার কিছুই জানা দরকার নেই। আপনি তথ্যগুলো দেবেন, সিস্টেম ক্যালকুলেশন করে দেবে।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামী বছরের পহেলা জুলাই থেকে অনলাইনে রিটার্ন সহজলভ্য হবে। এ বছর যারা রিটার্ন দিয়েছেন, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষিত থাকবে। এটা অনেক লম্বা সময় ধরে আমাদের আর্কাইভে থাকবে। আমরা ক্লাউড সার্ভারও নেব। আমরা অ্যাপস তৈরি করব। আগামী বছর থেকে করপোরেট রিটার্ন অনলাইনে দিতে হবে। অনলাইন রিটার্ন গত বছরের তুলনায় ৫ গুণ বেড়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সার্ভার প্রতি মাসের ১০ তারিখের পর খুবই স্লো হয়ে যায়, যার ফলে অনেক সময় অনলাইনে রিটার্ন সাবমিশনে ভোগান্তি শুরু হয়। সুতরাং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরামর্শ মতে অবশ্যই শেষ দিকের জন্য অপেক্ষা না করে প্রথম দিকেই রিটার্ন সাবমিশন করুন এবং আমাদের সাবমিশনে সহযোগিতা করুন।

ট্যাক্স-অডিটের ফাইল সিলেকশন: তিনি আরো বলেন, আপনি কেবল তথ্য দেবেন। ক্যালকুলেশনের সিস্টেম আছে। যদি কোনো ভুলত্রুটি হয় তার দায়িত্ব ডিপার্টমেন্টের। আপনার কোনো দায় নেই। কিন্তু আপনি যখন ম্যানুয়ালি করেন, এতে যখন ভুলত্রুটি হয় তখন পুরো দায় আপনার ওপর চলে আসে। অনেকেই অডিটের নামে ডাকাডাকি করে। অডিটের সিলেকশন আপনাদের বিবেচনায় সঠিক হয় না। একজন করদাতা প্রতি বছর ডাক পান, আরেকজন করদাতাকে কখনোই ডাকা হয় না। এরকম হওয়ার কথা না। যদি করদাতা অনলাইনে রিটার্ন দেন তাহলে প্রয়োজনীয় তথ্য আমাদের কাছে থাকবে। আমাদের পক্ষে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ব্যবহার করে অটোমেটেড পদ্ধতিতে ফাইল সিলেকশন করা যাবে। তখন আপনাকে পছন্দ করে না বলে বারবার ডাকবে, এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।

আমাদের দেশের ডেভেলপমেন্ট এ আমাদের সবাইকে করতে হবে। আমাদের সবাইকে ট্যাক্স যেমন পলিসিগত দিক দিয়ে সহজ করতে হবে তেমনি, আয়করদাতার যেন এটা দিতে আর এর সুবিধাপ্রাপ্তিতে কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আসমা আখতার: প্রিন্সিপাল অ্যান্ড সিইও, আসমা আখতার অ্যান্ড কোং চ্যার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট