চলতি বন্যায় ১ হাজার ৩২৩ কোটি টাকার ফসল এবং ১৩ লাখ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে কৃষি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। করোনা কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিকে করেছে বিপর্যস্ত। ব্র্যাকের এক গবেষণায় এর আগে বলা হয়েছে যে করোনার লকডাউন পরিস্থিতিতে প্রথম দেড় মাসে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার। এরই মধ্যে দেশে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় আম্পান এবং ক্ষতি করে গেছে শাকসবজি, ফল, মাছসহ অনেক সম্পদের। দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জমিতে ঢুকে পড়ে লবণাক্ত পানি, যা এখনো রয়ে গেছে। এখন জেঁকে বসেছে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা।
বর্তমানে দেশের তিন ভাগের এক ভাগ এলাকা পানিতে তলিয়ে আছে। করোনা, আম্পান ও বন্যার আঘাতে দেশের কৃষক, খামারিসহ সাধারণ মানুষ যখন চরম দুর্ভোগের মধ্যে সময় পার করছে, সে মুহূর্তে রোপা আমনের মৌসুম চলছে। অথচ বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোয় নষ্ট হয়ে গেছে আমনের বীজতলা। আগাম সবজি বাজারে আনার জন্য কৃষকের যখন প্রস্তুতি নেয়ার কথা, তখন বানভাসি কৃষক ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তা বা বাঁধের ওপর। অথচ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য আমন মৌসুম থেকে আমাদের চাল উৎপাদন আনতে হবে ১ কোটি ৫৬ লাখ টন। দেশের কৃষককুল বিশেষ করে বন্যা এলাকার কৃষকের অবস্থা কেমন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আগস্টে বন্যার পানি চলে যাওয়ার পর পরই যাতে কৃষিতে কৃষক কোমড় বেঁধে নামতে পারেন, সেই সঙ্গে সামনের রবি মৌসুমে বিশেষ কিছু ফসলের আবাদ যাতে বাড়ানো যায়, তার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে ত্বরিত গতিতে সব ধরনের কৃষি সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়াতে হবে কৃষকের পাশে।
কৃষিঋণ, এসএমই ঋণ ও এমএফআই ঋণের যে প্রণোদনা প্যাকেজ সরকার ঘোষণা করেছে, সেসব অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে যেন বন্যাকবলিত অঞ্চলে বাস্তবায়ন করা হয়, তার জন্য জোর তাগাদা ব্যাংকগুলোকে দিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এজন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারে। অতীতে এ রকম সংকটে আমাদের সরকার, সমাজ ও বাজার মিলে এমন অংশীদারিত্বমূলক নানা কর্মসূচি হাতে নিয়ে মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে এবং সফলও হয়েছে। বন্যা-পরবর্তী কৃষি খাতের পুনর্বাসনেও সরকার যথাযথ ভূমিকা পালন করবে, সে প্রত্যাশাই করছি। আমাদের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরাও কৃষি খাতে নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আধুনিক কৃষির প্রসারে আরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, সে আশা নিশ্চয়ই করতে পারি।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠে কৃষি উৎপাদন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে ফসল, মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে প্রকৃত চাহিদা ও বাস্তবতার নিরিখে নতুন ঋণ বিতরণের পাশাপাশি পুরনো ঋণ আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক যাতে চাহিদা অনুযায়ী যথাসময়ে নতুন ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন এবং ঋণ পেতে কোনো হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বসতবাড়ির আঙ্গিনায় হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, গো-খাদ্য উৎপাদন ও ক্রয় এবং অন্যান্য আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডে ঋণ প্রদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
বন্যার ফলে অধিকাংশ কৃষক অভাবের তাড়নায় গৃহপালিত পশুপাখি বিক্রি করে দিয়েছেন। তাদের বিনা মূল্যে হাঁস-মুরগি এবং গরু-ছাগলের বাচ্চা ও খাবার সরবরাহ করতে হবে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে গৃহপালিত পশুপাখির চিকিৎসা ও ওষুধ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রবি ফসল বিশেষ করে বোরো ধান, গম, আলু, মিষ্টি আলু, শীতকালীন সবজি, তেলবীজ, পেঁয়াজ, রসুন, আখ প্রভৃতি ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিনা মূল্যে বীজ, সার ও বালাইনাশক সরবরাহের সরকারি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যবস্থা করতে হবে পর্যাপ্ত কৃষিঋণের। যাতে সময়মতো ঋণ গ্রহণ করে কৃষক পুরোদমে কৃষিকাজে আত্মনিয়োগ করতে পারেন। বন্যায় সর্বস্বান্ত কৃষকের হাতে কোনো নগদ অর্থ নেই। মাঠে নেই বিক্রয়যোগ্য ফসল। তাই নতুন ফসল ঘরে না ওঠা পর্যন্ত বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সব এনজিওর ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখতে হবে। প্রয়োজনে নতুন ঋণ দিতে হবে। উঁচু জমির অভাব হলে ভাসমান বীজতলায় এসব ফসলের চারা তৈরি করতে হবে। বন্যায় অনেক কৃষকের পাওয়ার টিলার, অগভীর নলকূপ, গভীর নলকূপসহ অনেক কৃষি যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে। এসব কৃষি যন্ত্রপাতি জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের উদ্যোগ নিতে হবে।
বন্যা এ দেশের কৃষকের কাছে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৮৭, ১৯৮৮,১ ৯৯৮, ২০০৭ ও ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যা মোকাবেলার বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে দেশের পৌনে দুই কোটি সাহসী ও কর্মঠ কৃষকের। তারা জানেন বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়; নদীমাতৃক বন্যা বিধৌত পলি মাটিতে কীভাবে ফসল ফলাতে হয়। তাই এ মুহূর্তে প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ, কৃষিঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করলেই বন্যাবিধ্বস্ত ফসলের মাঠ তারা আবার সবুজ শস্যে ভরে তুলবেন। এতে কৃষি ও কৃষক যেমন বাঁচবে, তেমনি নিশ্চিত হবে দেশের টেকসই খাদ্য ও পুষ্টিনিরাপত্তা। চলমান বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা চরম অনিশ্চয়তায় আছেন। বন্যার পানি নেমে গেলে জরুরি ভিত্তিতে কৃষি পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কাজ করতে হবে। বীজ, সারসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কার্যক্রম বেগবান, তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য এরই মধ্যে ১৪টি কমিটি গঠন করেছে সরকার। এসব কমিটির পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তাদেরও নিয়মিত কাজের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠ পর্যায়ে কাজের তদারক করতে হবে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর কৃষক যেন দ্রুত কৃষিকাজে ফিরতে পারেন, সেজন্য সহায়ক পরিবেশ ও অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।










