অন্য সহায়ক ফ্যাক্টর ছাড়াও যেকোনো খাতের বিকাশ, স্থায়িত্বশীলতা ও অধিকতর উন্নয়নের জন্য সদিচ্ছাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে পাট খাতের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রধান চালকে পরিণত হওয়ার নেপথ্যেও অন্যতম ফ্যাক্টর ছিল এই সদিচ্ছার বিষয়টি। এক অরাজক পরিস্থিতিতে ১৯৭২-এ এক অধ্যাদেশবলে বঙ্গবন্ধু পরিত্যক্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয়করণ করেছিলেন। পাটকলগুলোর সামগ্রিক তত্ত্বাবধানের জন্য গঠন করেছিলেন বাংলাদেশ পাটকল সংস্থা (বিজেএমসি)। সে সময় এর অধীনে ৭৭টি পাটকল ছিল। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সংস্থাটির অব্যাহত পরিবীক্ষণে পাটকলগুলো অর্থনীতি পুনর্জাগরণে সহায়তা করেছিল। পাট ও পাটজাত পণ্য রফতানিই হয়ে উঠেছিল তখন বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও মোট দেশজ উৎপাদনের সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ উৎস। কিন্তু ১৯৮২-৮৩ থেকে সামরিক শাসক এরশাদ শিল্প খাতের বিরাষ্ট্রীয়করণ শুরু করেন এবং এর অংশ হিসেবে প্রথম দফায় ৩৫টি পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। এর পরে উপর্যুপরি সরকারই রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের সংকোচন অব্যাহত রাখে। সর্বশেষ গত জুলাইয়ে দ্রুত পুনরায় চালুর আশ্বাস দিয়ে ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে করোনা মহামারীর মধ্যে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক অনিশ্চয়তায় দিনাতিপাত করছেন। মূলত লোকসান দেখিয়ে অব্যাহতভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের এ আয়োজনের পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবকেই দায়ী করছেন অনেকেই। সম্প্রতি পাটকল-চিনিকল বিষয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান ও গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে ‘সর্বজন কথা’র পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তাদের আলোচনায়ও এর অনুরণন ঘটেছে। বলা চলে, দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সমর্থনের মাধ্যমে যে খাতটি একসময় প্রবৃদ্ধির চালকে আসীন হয়েছিল, এর বিপরীত প্রবণতার কারণে এখন এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্রমসংকোচনের পথে। এ প্রবণতার পরিবর্তন জরুরি।
উত্কৃষ্ট মানের পাট উৎপাদনের উপযোগী মাটি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকা এবং পাঁচ দশকে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞ ও দক্ষ শ্রমশক্তি থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো লোকসানি হওয়ার কারণগুলো প্রথমে খতিয়ে দেখা জরুরি। মোটাদাগে কারণ হলো, যথাসময়ে বরাদ্দ না দেয়ায় বিলম্বে দুই বা তিন গুণ বেশি দামে পাট ক্রয়, পুরনো ও জরাজীর্ণ যন্ত্রপাতি, উন্নত ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে বিজেএমসি ও মিল ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি-অনিয়মের বিস্তার। বিশেষ করে দুর্নীতি ও পুরনো যন্ত্রপাতির কারণে উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ায় পাটকলগুলো লোকসানে পড়ে এবং এতে ব্যাংকঋণ ও সুদের চক্রবৃদ্ধির একটি আবর্তনিক সংকটে নিপতিত হয়। এ সংকটের আপাত পরিত্রাণ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি বাবদ বাজেটারি বরাদ্দ দেয়া হলেও পাটকলগুলো কাঠামোগত রূপান্তরে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং দুর্নীতি বন্ধ করে উন্নত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বিজেএমসির পাটকলগুলোকে মুনাফার ধারায় ফেরানো সম্ভব মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রতি ইউনিটে উৎপাদন খরচ হ্রাসের মাধ্যমে বহুল আলোচিত সমস্যা সমাধানে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার একটি তহবিল গঠনের প্রস্তাব এসেছে। এটি আমলে নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা যেতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কৃষিভিত্তিক শিল্প হিসেবে পাট খাতকে কৃষিভিত্তিক শিল্পে প্রদত্ত সব ধরনের সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ বাজার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও পাট খাতের বেসরকারীকরণের নীতিতে বদল ঘটেনি। মূলত বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ ও অর্থায়নে নেয়া এক সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে পাট শিল্পের বেসরকারীকরণের কাজটি শুরু হয়েছিল। আলোচ্য সংস্কার কর্মসূচিতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল যে সংস্কার শেষ হতে হতেই পুরো খাত ব্যক্তিমালিকানাধীনে চলে যাবে। এ ধারায়ই দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী বন্ধ হয়েছিল। বলা হয়েছিল, এসবের মধ্য দিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং এ খাতের উন্নয়ন ঘটবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা গেছে, পাট শিল্পের অধিকতর উন্নয়ন তো হয়নি, বিশেষ করে আদমজীর ক্ষেত্রে পাটসংশ্লিষ্ট কিছু প্রকৃত উদ্যোক্তা বাদে প্লটগুলো বেশির ভাগই অন্য শিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। বন্ধ হওয়া অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর ক্ষেত্রেও এটি কম-বেশি সত্যি। চলতি বছর বন্ধ ঘোষিত হওয়া পাটকলগুলো স্বল্প সময়ের ব্যবধানে চালু হওয়ার কথা থাকলেও এ ধরনের কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। প্রায় ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও এক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই। শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের জন্য আপাতত ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হলেও আগের অভিজ্ঞতায় আশঙ্কা থেকে যায় যে পাটকলগুলো শেষ পর্যন্ত প্রকৃত উদ্যোক্তাদের হাতে যাবে কিনা। পিপিপির মাধ্যমে ফের চালুর ক্ষেত্রে প্লটগুলো যেন অন্য খাতে বেহাত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আগের শ্রমিকরা যেন নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধিকার পান, সেটিও নিশ্চিত করা চাই।
বাংলাদেশের পাট শিল্পের সম্ভাবনা যে এখনো নিঃশেষিত হয়নি, তার প্রমাণ পাটজাত শিল্পের রফতানি বৃদ্ধি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে, মহামারীর মধ্যে গত জুলাই-আগস্ট দুই মাসে পাট ও পাটজাত পণ্যে লক্ষণীয় রফতানি প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। প্রধানত বেসরকারি খাতের হাত ধরে এ সাফল্য এসেছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সচেতনতার অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহুমুখী পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ছে। সামনে এসব পণ্যের চাহিদা আরো বাড়বে। কাজেই এটাকে কাজে লাগাত হবে। সেক্ষেত্রে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। বেসরকারি পাটকলগুলো পণ্যের মূল্য সংযোজনে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো এক্ষেত্রে বেশি পিছিয়ে। বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হলে এক্ষেত্রে দৃষ্টি দিতে হবে। বাজার চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে পাটকলগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে বহুমুখী এবং উন্নত মানসম্পন্ন পাটপণ্য উৎপাদনে সক্ষম করে আমাদের পাট শিল্পকে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। পাট শিল্পসংক্রান্ত গবেষণালব্ধ ধারণার বাণিজ্যিক ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পাটকলগুলোর নিবিড় যোগাযোগ স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ ছাড়াও বর্তমান প্রধান পাটপণ্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে রয়েছে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার। তবে এখনো আমাদের দেশই উত্কৃষ্ট পাট উৎপাদনের ভূমি এবং বিশ্বের বৃহত্তম কাঁচা পাট রফতানিকারক। প্রতিযোগী দেশগুলো কী ধরনের নীতি নিচ্ছে, কী ধরনের রফতানি কৌশল গ্রহণ করছে, সেগুলো নিয়মিত পর্যালোচনাপূর্বক রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিলে পাট শিল্প আমাদের প্রবৃদ্ধির নতুন চালকে পরিণত হতে পারে বৈকি।










