করোনা সংকটের ব্যাপ্তি এখন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সাবধান করে দিচ্ছে যে আগামী দিনগুলোয় এ সংকট ওইসব দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু সেটা যদি না-ও হয়, বাংলাদেশে বর্তমান যে অবস্থা বিরাজ করছে, তা চলতে থাকলে দেশের অর্থনীতিতে কতগুলো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সহজেই চিহ্নিত করা যায়। সেসব প্রতিক্রিয়ার কিছু কিছু তো এখনই দেখা যায়। গৃহে অবরুদ্ধ হওয়ার কারণে বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন বন্ধ। দোকান খোলা নেই, কারখানায় কাজ হচ্ছে না, লোকজন বাইরে বেরোচ্ছে না।  ফলে যারা ‘দিন এনে দিন খান’, তাদের আয়ের পথ সম্পূর্ণ রুদ্ধ। এর মধ্যে রয়েছেন দিনমজুর, রিকশাচালক, বাজারের ক্ষুদ্র বিক্রেতা, যারা রাস্তার পাশে বেসাতি সাজিয়ে বসতেন এবং এমন অজস্র মানুষ।

এরই মধ্যে বাজার থেকে বহু পণ্য হাওয়া হয়ে গেছে। এমনটাই আশঙ্কা করা হয়েছিল। সংকটকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা লোটার ঐতিহ্য আমাদের আছে। করোনা সংকটও তার ব্যত্যয় নয়। মজুদদাররা মজুদ শুরু করেছেন এবং আগামী দিনগুলোয় এ সংকট গভীরতর হবে। শোনা গেছে যে মুদির দোকানে পরিষ্কারক, মুখাবরণী, শল্য চিকিৎসকের দস্তানা পাওয়া যাচ্ছে, যেগুলো পাওয়ার কথা ওষুধের দোকানে। কিছুদিনের মধ্যেই মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে এবং তার ভারটিও বহন করতে হবে দরিদ্র জনগণকে।

করোনা সংকটের কারণে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে তিনটি প্রভাব পড়বে। প্রথমত, আমাদের উচ্চপ্রবৃদ্ধির দুটো মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে পোশাক রফতানি ও বহির্বিশ্বে কর্মরত বাঙালি শ্রমিকদের প্রেরিত অর্থ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে করোনা সংকটের কারণে দুটো চালিকাশক্তির ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়বে। ফলে আমাদের প্রবৃদ্ধির হার কমে আসবে এবং অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিতে পারে।

মন্দার কারণে কর্মসংস্থান কমে যাবে এবং বেকারত্ব বাড়বে। পোশাক শিল্পের হাজার হাজার কর্মী বেকার হয়ে পড়বেন এবং বিদেশে কর্মরত অদক্ষ শ্রমিকরা কর্মহীন অবস্থায় দেশে ফিরবেন। এসব জনগোষ্ঠী ও তাদের পরিবারের ওপর বিরাট অর্থনৈতিক চাপ পড়বে। সেই সঙ্গে বর্তমানে তেলের দাম যে বাড়ছে, তার ফলে বাংলাদেশকে তেল আমদানির জন্য একদিকে যেমন আমাদের অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে, তেমনি মূল্যস্ফীতিতে এটা একটা বিরাট ভূমিকা রাখবে। এ বছর যদি কৃষি খাতে কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়, তাহলে আগামী বছর কৃষি উৎপাদন কমে যাবে। এতে কমে যেতে পারে খাদ্যসামগ্রীর লভ্যতা। ফলে খাদ্য সংকটের শঙ্কা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী করোনা সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার উদ্দেশ্যে বিরাট অংকের একটি প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছেন। এ কাঠামোর মূল অংশে রয়েছে ৬৭ হাজার ৭৫০ টাকার অর্থায়ন। এর সঙ্গে রফতানিমুখী খাতের জন্য কয়েকদিন আগের ঘোষিত ৫ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন যোগ করলে সামগ্রিক বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা (প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার)। এ বরাদ্দের মধ্যে শিল্প ও সেবা খাতকে সহায়তা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পকে সাহায্য, রফতানি বাণিজ্যিক প্রণোদনা ইত্যাদি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী এ সংকটের ফলে উদ্ভূত সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য একটি তহবিলের কথা বলেছিলেন, যার মধ্যে ছিল বিনা খরচে খাদ্য বিতরণ, ১০ টাকায় চাল বিক্রি, নগদ অর্থ বিতরণ এবং বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও নির্যাতিত নারীদের ভাতা। অবশ্য এ কাঠামোর জন্য কোনো অর্থায়নের পরিমাণ নির্দিষ্ট করা হয়নি। এ দুটো মহতী উদ্যোগের জন্যই প্রধানমন্ত্রী ধন্যবাদার্হ। এমন তহবিলের প্রয়োজন ও গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। এ-জাতীয় দূরদৃষ্টিমূলক ব্যবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাই। তবে তহবিল দ্বয়ের অগ্রাধিকার, সময়োপযোগিতা ও প্রাসঙ্গিকতার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করার সুযোগ আছে।

তাত্ক্ষণিকভাবে এ সময়ে এবং স্বল্পকালে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী, তা হলো সামাজিক সুরক্ষা। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ সময়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে দ্বিতীয় প্রস্তাবিত তহবিলকে, যার মধ্যে রয়েছে বিনা খরচে খাদ্য বিতরণ, ১০ টাকায় চাল বিক্রি, নগদ অর্থ বিতরণ এবং বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও নির্যাতিত নারীদের ভাতা।

এজন্য তিনটি জিনিস অনতিবিলম্বে করা দরকার। এক. দ্বিতীয় তহবিলের জন্য সুনির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ; দুই. বিভিন্ন প্রকারের ভাতার পরিমাণ বাড়ানো। বর্তমানে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও অন্যান্য ভাতার পরিমাণ জনপ্রতি ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। এ অংক লজ্জাজনক। সব ভাতার পরিমাণ ন্যূনতম ১ হাজার টাকা করা দরকার। তিন. এ তহবিলকে এখনই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা দরকার। এজন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ও প্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভারত সরকারও একই রকমের অগ্রাধিকার তহবিলের ঘোষণা দিয়েছে।

সে দেশে সম্প্রতি প্রাথমিকভাবে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক প্রণোদনা তহবিল গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু এ পুরো তহবিলের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দরিদ্র মানুষের জন্য খাদ্য ও নগদ অর্থসহায়তা প্রদান। খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচির অধীনে ৮০ কোটি দরিদ্র মানুষকে রক্ষা করবে। আগামী তিন মাসে প্রতিটি মানুষকে পাঁচ কেজি চাল ও এক কেজি ডাল বিনা মূল্যে দেয়া হবে। নগদ অর্থ সাহায্যের মাধ্যমে দরিদ্র কৃষক, গ্রামীণ শ্রমিক, বিধবা ও অন্যদের সাহায্য করা হবে। সেই সঙ্গে ভারত সরকার ঘোষণা করেছে যে করোনা সংকট মোকাবেলায় যেসব চিকিৎসক, সেবিকা ও স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছেন, তাদের প্রত্যেকের জন্য ৫০ লাখ টাকার স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা করা হবে।

ধারাবাহিকতায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা কাঠামোটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়, সময়োপযোগী ও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে তখনই, যখন আগামী দিনগুলোয় কোনো এক সময়ের পরে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু শেষে অর্থনীতির পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এখনকার অগ্রাধিকার নিঃসন্দেহে করোনা সংক্রমণ রোধ ও প্রতিকার এবং বর্তমানে যে দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্যহীন ও অর্থহীন, তাদের আশু সাহায্য। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় প্রণোদনা কাঠেমোটিই এখন বেশি প্রযোজ্য।

প্রাসঙ্গিক সময়ে ৭২ হাজার ৭৫০ হাজার কোটি টাকার উদ্যোগ যখন বাস্তবায়ন হবে, তখন তিনটি বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। এক. যে বিশাল অংকের অর্থ প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, তার কিছু অংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা পাবেন (২০,০০০ কোটি টাকা), বাকিটি অন্যরা। লক্ষ রাখতে হবে যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অংশটুকু যেন বৃহৎ ব্যবসায়ীরা গিলে না ফেলেন। সেই সঙ্গে ব্যাংকসহ বৃহৎ শিল্পকে উদ্ধার করা ও বাঁচিয়ে রাখার জন্য এ প্রণোদনা যেন ব্যবহার না হয়। দুই. এ রকম বিশাল বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতির সুযোগও বেশি। দৃশ্যমানতা ও দায়বদ্ধতা ভিন্ন এ তহবিল তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না। সম্পদ নষ্টের বিরুদ্ধে কী রকম কাঠামো কার্যকর হবে তা নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। তিন. এ তহবিল থেকে যারা অর্থ নেবেন, তাদের ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য ঋণ বীমার কথা চিন্তা করা যেতে পারে।

এসব ছাড়িয়ে আরো একটু দীর্ঘমেয়াদে ভাবা দরকার। আমি নিজে ভাবিত আগামী বছরের খাদ্যলভ্যতা নিয়ে। এ বছর বিভিন্ন দেশে যদি সময়মতো এবং পর্যাপ্ত হারে কৃষিকাজ না করা যায় তাহলে আগামী বছর বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। করোনা সংকট ও তার পরবর্তী অবস্থায় আমাদের কী করণীয়, তার তিন ধরনের বিভাজন প্রয়োজন—স্বল্পমেয়াদে, মধ্যমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে। এ নিয়ে চিন্তাভাবনা একটি সুসংহত কাঠামোর মধ্যেই হতে হবে, যার জন্য প্রচেষ্টার শুরু হতে হবে এখন। কারণ এখনই সময়।

 

সেলিম জাহান: ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র