তিনি সর্বদা বিশ্বাস করতেন এগিয়ে যাওয়ার, উন্নত থেকে উন্নততর কিছু করা এবং আত্মতৃপ্তির কাছে কখনই আত্মসমর্পণ না করার। শ্রেষ্ঠত্বই তার উদ্দেশ্য ছিল, সবসময় বড় কিছু চিন্তা করা ছিল তার অভ্যাস এবং ইতিবাচক ফলাফল তৈরি করাই ছিল অন্যতম লক্ষ্য।

উন্নয়নের কিংবদন্তি, স্যার ফজলে হাসান আবেদকে শায়িত করা হয়েছে বনানী কবরস্থানে। সবসময় মৃদু হাসির একজন মানুষ কীভাবে উন্নয়নের বিভিন্ন অলিগলি এবং মহাসড়কে তার পদচিহ্ন এঁকেছেন সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য এবং সংকল্পবোধ নিয়ে এবং সে প্রেরণার গল্প ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সামনে যখনই তুলে ধরা হোক, তা বিলম্বিত একটি অধ্যায় হবে না।

আবেদ ভাই সম্পর্কে যতকিছুই বলি তা কম বলা হবে, কেননা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বদ্ধমূল ধারণা ভাঙার ক্ষেত্রে তার ভূমিকাকে শব্দের মাপকাঠিতে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আবেদ ভাই ছাড়া অন্য কেউ কি প্রথাগত চিন্তাধারার বাইরে গিয়ে তার চেয়ে উন্নততর কোনো চিত্র আমাদের সামনে তুলে আনতে পেরেছিলেন?

আমরা দরিদ্র এবং স্বল্পোন্নত হওয়ার কারণ ও পরিণতি নিয়ে বিশ্লেষণ ও তাত্ত্বিকীকরণ করি এবং তারপর হতাশা জানাই। আবেদ ভাই সবসময় বিশ্লেষণকে সম্মান করতেন, তবে কখনই তিনি ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করার জন্য পৃথক উদ্যোগের ব্যর্থতা অনুভব করে হতাশা প্রকাশ করেননি। সামাজিক পরিবর্তন আনতে যে বাধা পেরিয়ে যেতে হবে, তা খুব ভালোভাবেই তিনি জানতেন। এমনটি করতে পেরেছিলেন, কারণ তিনি নিজে উদ্যোগ গ্রহণ করতেন, সেখান থেকে শিখতেন, নিজের ও অন্যের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেন এবং কখনই নিজের ধারণায় বন্দি হয়ে থাকেননি।

একজন হিসাবরক্ষক থেকে বিশ্বের সর্বাপেক্ষা দক্ষ উন্নয়ন অনুশীলনকারী, সীমাহীন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এক ব্যক্তি; তিনি দেখিয়েছিলেন বাস্তবিকভাবে ছোট একটা উদ্যোগ, যা করা সম্ভব নয় বলে মনে হয়, একটা সময় সেটা সম্ভব হয় এবং প্রমাণ করেন মাঠে নেমে কাজ করলে সব সম্ভব। বাস্তবতা যখন তাকে চ্যালেঞ্জ করেছে, তখন তিনি বাস্তবতাকে পরিবর্তন করেছেন নিজের মতো করে। বাস্তবতার কাছে হার মেনে নেননি। তিনি সম্ভব করার শিল্পে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাঁর কৌশল পরিবর্তন করেছিলেন তখন, যখন নিশ্চিত হয়েছিলেন তার গৃহীত পদক্ষেপ তার উদ্দেশ্য থেকে তাকে বিচলিত করবে না। বাস্তববাদ পরিবর্তনের শত্রু হতে পারে, কিন্তু বাস্তবতাকে যদি তার যথাযথ মূল্য পরিশোধ না করা হয়, তবে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এটা আবেদ ভাইয়ের চেয়ে কেউ ভালো জানতেন না।

তিনি কখনই একা পথ চলতে বিশ্বাস করতেন না, কেননা একা পথ উদ্দেশ্যহীন। তিনি স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী একজন মানুষ ছিলেন; তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সহযোগিতা করতেন। সম্মিলিত প্রয়াসের ক্ষেত্রে ফ্রি-রাইডার সমস্যা হয়ে প্রতীয়মান হলে তিনি সমস্যা সমাধানের পথে সব বাধাকে নিষ্ক্রিয় করতেন। তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই দল গঠন করতেন, যাদের ছোট-বড় সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকত এবং দলে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ করে দিতেন; যাতে খুব সহজে দলীয় লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হতো।

যেকোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে মেধার ভিত্তিতে, তবে সেটির টিকে থাকা নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ কর্মগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্যের প্রতি আনুগত্যের ওপর। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের অধঃপতন তখন হয়, যখন আনুগত্য মেধার ওপর আধিপত্য করে, একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানই নিখুঁতভাবে মেধার ওপর টিকে থাকতে পারে না। একটি বর্ধনশীল প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেধা এবং আনুগত্যের মধ্যে অনুকূল ভারসাম্য বজায় রাখতে পারা একটি শিল্প। আবেদ ভাই ছিলেন তেমনই একজন শিল্পী।

শ্রেষ্ঠত্বই তার উদ্দেশ্য ছিল; সবসময় বড় কিছু চিন্তা