নদী রক্ষায় সরকার
আইনের মাধ্যমে
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন
(এনআরসিসি) গঠন করে। এ সংস্থার কাজ নদীকে দখল ও দূষণের
হাত থেকে
রক্ষা করা।
কিন্তু দুঃখজনক
বিষয় হলো, সেই নদী রক্ষা কমিশনই
৩৭ হাজার
দখলদারের তথ্য
ওয়েবসাইট থেকে
বাদ দিয়েছে।
এমন সিদ্ধান্তের মানে হলো দখলদারদের
সুযোগ এবং বৈধতা দেয়া।
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের
ক্ষমতা একসময়
ছিল সীমিত।
পরে বিভিন্ন
সময়ে উচ্চ
আদালতের রায়ের
মাধ্যমে তাদের
ক্ষমতা বাড়লেও
নদী দখলদার
সঠিকভাবে চিহ্নিত
করতে পারেনি
সংস্থাটি। নদী রক্ষা কমিশন
এর আগেও
দুবার সারা
দেশের নদী দখলদারদের তালিকা
প্রকাশ করেছে।
কিন্তু দখলদার
উচ্ছেদে তারা
ব্যর্থতার পরিচয়
দিয়েছে। এবার
৪৮টি নদী সমীক্ষা প্রকল্পের
তালিকাও বাতিল
করা হলো, যা ভালো
দৃষ্টান্ত তৈরি
করবে না। এতে নদী দখলদাররা উৎসাহিত
হবেন।
অবৈধ দখলদার কারা? তারা গরিব-দুঃখী, সাধারণ মানুষ নন; তারা হচ্ছেন সমাজের উচ্চবিত্ত ও ক্ষমতাধর শ্রেণী থেকে আসা কিছু শক্তিশালী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী। এ ধরনের অবৈধ দখলদারদের মধ্যে কখনো কখনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামও উল্লিখিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ অবৈধ দখল বন্ধ করার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হলে এবং দখলীকৃত ভূমি পুনরুদ্ধার করতে হলে কমিশনকে তথা সরকারকে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। প্রয়োজন হবে প্রশাসনযন্ত্রের সক্রিয় ভূমিকা। নদীর ভৌত অবয়ব নিয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে। নদীর সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে। শীতকালে শীর্ণ নদীটিকে কোনোমতেই নদীর স্বাভাবিক আকার হিসেবে নেয়া যাবে না। আবার আমাদের মতো দেশের যেখানে নদী বর্ষায় দুই কূল ছাপিয়ে তীরবর্তী প্লাবনভূমি ডুবিয়ে ফেলে, সেই পুরো ব্যাপ্তিকেও নদী বলা যাবে না। নদীর পাড় যেখানে সুস্পষ্ট, সেখানে নদী চিহ্নিত করা সহজ। অন্য জায়গার জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি গাণিতিক সূত্রের মাধ্যমে নদী চিহ্নিত করতে হবে। নদীর জায়গা দখল করে আবাসন প্রকল্প ও শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার পাশাপাশি দোকানপাট ও বাজার হয়েছে। ঘরবাড়ি করে স্থানীয়রাও নদী-খালের জমি অবৈধভাবে দখল করেছে। ফলে নদীদূষণসহ অবৈধ স্থাপনা তৈরি করায় মূল নদীর প্রবাহ অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ছে। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সরকার আইন প্রণয়ন করে নদীকে বেদখলের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। নদী রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে জাগরণ শুরু হয়েছে। এমন অবস্থায় ৩৭ হাজার দখলদারের তালিকা বাদ দেয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নদী রক্ষায় তাদের সদিচ্ছা ও দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
৩৭ হাজার দখলদারের
তথ্য বাদ দেয়া নিয়ে
নদী রক্ষা
কমিশনের চেয়ারম্যান বলেছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনা
মোতাবেক সিএস
রেকর্ড অনুযায়ী
সমীক্ষা না করে পানি
আইন, ২০১৩
অনুযায়ী নদীর
অবৈধ দখল বা নদীতীরবর্তী স্থাপনার তালিকা করায়
ওই তালিকা
প্রকাশ করলে
আইনগত ও প্রশাসনিক সমস্যা
হতে পারে।
তাই প্রকল্পের
চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ৩০০ কপিতে অবৈধ
দখল, নদীতীরবর্তী স্থাপনার নাম, তথ্য
অথবা সংখ্যা
কোনোটিই প্রকাশ
করা যাবে
না। অন্যদিকে
৪৮টি নদী সমীক্ষা প্রকল্পের
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদ বলছেন,
পানি আইন ও বন্দর
আইন অনুসারে
তারা সমীক্ষা
চালিয়েছেন। তিনি
আরো বলেন,
‘আমরা যে আইনে সমীক্ষা
চালিয়েছি তাতে
হাইকোর্টের রায়ের
আলোকপাত করা হয়নি। আদালতের
একটি নির্দেশ
যদি বাস্তবিক
অর্থে না হয়ে থাকে
বা কোনো
সমস্যা তৈরি
হয় তখন আদালতের দ্বারস্থ
হওয়া উচিত।
দেখতে হবে যে আদালত
কী সিদ্ধান্ত
দেয়। প্রকল্প
থেকে দখলদারদের
তথ্য বাদ দেয়ার প্রশাসনিক
ও আইনি
ক্ষমতা নদী রক্ষা কমিশনের
চেয়ারম্যানের আছে কিনা, তা এক বড় প্রশ্ন। কোনো
তথ্যে ভুল থাকলে সেটা
সংশোধন করা যেত। কেউ যদি ভুল করে জনগণের
পয়সা অপচয়
করে তাহলে
কমিশন তাদের
আইনের আওতায়
আনতে পারে।
ভাঙনের কারণে
বাংলাদেশের নদীগুলোর
গতিপথ পরিবর্তিত
হয়। এটাই
এ দেশের
নদীর বাস্তবতা।
২০০৯ সালের
রায়ে বলা হয়েছিল, সিএস
ও আরএস
জরিপ ধরে এবং বর্তমান
প্রবাহের সমন্বয়
করে নদীকে
খুঁজে বের করা এবং সীমানা নির্ধারণ
করতে হবে।
হাইকোর্টের রায়টি
বাস্তবায়নযোগ্য, অর্থাৎ
সরেজমিনে নদী পাড়ে যে দখল আছে সেটা পানি
আইন অনুযায়ী
দখল এমনকি
হালনাগাদ আরএস
জরিপেও দখলের
মধ্যে পড়ে।
দেশের
সব নদ-নদীর সুরক্ষা
ও সংরক্ষণে
নদী রক্ষা
কমিশনকে ‘আইনগত
অভিভাবক’ ঘোষণা
করে সর্বোচ্চ
আদালত রায়ে
আরো বলেছেন,
‘দেশের প্রতিটি
জেলা, উপজেলা,
ইউনিয়ন পরিষদকে
নিজ নিজ এলাকার নদ-নদী, খাল-বিল, জলাশয়ের
অবৈধ দখলদারদের
চিহ্নিত করে তাদের নামের
তালিকা জনসম্মুখে
ও পত্রিকায়
প্রকাশ করতে
হবে। নদী বা জলাশয়
দখলকারী বা অবৈধ স্থাপনা
নির্মাণকারীরা ব্যাংকঋণ
পাওয়ার ক্ষেত্রে
“অযোগ্য” বিবেচিত
হবেন। ঋণ দেয়ার সময় আবেদনকারীর বিরুদ্ধে
এ ধরনের
অভিযোগ আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখার
যথাযথ ব্যবস্থা
করবে বাংলাদেশ
ব্যাংক। জাতীয়
বা স্থানীয়
কোনো ধরনের
নির্বাচনে প্রার্থীর
বিরুদ্ধে নদী দখলের অভিযোগ
থাকলে তাকে
নির্বাচনের অযোগ্য
ঘোষণা করবে
নির্বাচন কমিশন।
সে ব্যাপারে
যথাযথ ব্যবস্থা
নিতে হবে।’
হাইকোর্টের এই রায়ের আলোকে
সারা দেশের
নদী দখলকারীদের তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। এক্ষেত্রে
ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়েও
নদী দখলকারীর
তালিকা প্রকাশ
এবং দখলকারীদের থেকে নদীকে মুক্ত
করার কার্যকর
উদ্যোগ গ্রহণ
করার কোনো
নজিরও দেখা
যাচ্ছে না। এ বিষয়ে
সময় বেঁধে
দিয়ে সরকারের
উচ্চপর্যায় থেকে
জোরালো নির্দেশনা
থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে দুঃখজনক
বিষয় হলো, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন
গঠনের পর এতগুলো বছর অতিবাহিত হলেও
দেশব্যাপী ছড়িয়ে
থাকা নদী ও দখলদার
চিহ্নিত করা যায়নি। বারবার
তালিকা প্রণয়ন
এবং তথ্য
বাদ দেয়া
বা বাতিল
করায় অর্থের
অপচয় হচ্ছে
কিন্তু কোনো
সুফল মিলছে
না। নদী দখলদারদের বাঁচাতেই
কি তারা
এমন পদক্ষেপ
নিচ্ছে, এমন প্রশ্ন কেউ তুললে আশ্চর্য
হওয়ার কিছু
থাকবে না।
নদী রক্ষা কমিশন
৩৭ হাজার
দখলদারের তথ্য
বাদ দেয়ায়
দখলদাররা উৎসাহিত
হবেন। জনগণের
অর্থে পরিচালিত
জরিপ ও তালিকা এভাবে
বাতিল করার
যৌক্তিকতা নিয়েও
প্রশ্ন রয়েছে।
বাতিল নয়, তালিকা যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে।
উচ্চ আদালতের
নির্দেশনা মেনে
তালিকা হালনাগাদ
করার সুযোগও
রয়েছে। এ ধরনের কোনো
পদক্ষেপ না নিয়ে পুরো
কাজটি বাতিল
করে দেয়ার
মধ্য দিয়ে
নদী রক্ষা
কমিশনের কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ল।
বিদ্যমান অবস্থায়
আগের আদেশ
প্রত্যাহার করে দ্রুতই নদী দখলদারদের তথ্য
ওয়েবসাইটে প্রকাশ
করার মধ্যমে
নদী রক্ষা
কমিশন তাদের
ওপর অর্পিত
দায়িত্ব যথাযথভাবে
পালন করবে
বলে আমাদের
প্রত্যাশা। শুধু
তালিকা প্রকাশই
নয়, দখলদার
উচ্ছেদেও তারা
কার্যকর ব্যবস্থা
নিতে হবে।










