মূল্যস্ফীতির প্রভাব শিক্ষা উপকরণের ক্ষেত্রেও পড়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য দুই দশক আগে সরকারিভাবে দেশব্যাপী উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্প চালু হলেও এ সময়ের মধ্যে প্রায় সব শিক্ষা উপকরণের দাম দুই থেকে চার গুণ বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় উপবৃত্তির পরিমাণ মাত্র একবার বাড়ানো হয়েছে, তাও সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ। এর ফলে উপবৃত্তির অপ্রতুল অর্থে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পারছে না।
মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া রোধ ও অংশগ্রহণের হার বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০০৩ সালে সরকারিভাবে দেশব্যাপী উপবৃত্তি প্রদান প্রকল্প চালু হয়েছে। শুরুর দিকে উপবৃত্তির টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে পেরে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের হারও অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবার থেকেও উৎসাহ পেয়েছে। না হলে এর আগে দেখা গেছে, শিক্ষার খরচ মেটাতে না পেরে স্কুলে না পাঠিয়ে পরিবারের উপার্জনে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেই অভিভাবক বেশি আগ্রহী ছিলেন।
বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় উপকরণ বই, খাতা, কাগজ, কলম, পেনসিল, জ্যামিতি বক্স, পেনসিল বক্স, ফাইল, স্কুল ব্যাগ ও স্কুল ড্রেসসহ সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। বস্তুত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির প্রভাব থেকে শিক্ষা খাতও বাদ যায়নি। এভাবে শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ায় সামর্থ্যবান পরিবারগুলো তাদের খরচ পুষিয়ে নিতে পারলেও বিপাকে পড়েছে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা। খরচ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আবারো প্রাথমিক স্তরে পড়ার হার বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর ওপর দিয়ে ধকল বেশি গেলেও মধ্যবিত্তও স্বস্তিতে নেই। সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্যের কশাঘাতে জর্জরিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী সন্তানের শিক্ষা খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। কলম, পেনসিল ও বোর্ডের ক্ষেত্রে কাঁচামালের দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে। এছাড়া আমদানি খরচ ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির কারণেও দাম বেড়েছে। ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় পণ্য আমদানি কমেছে। ফলে দেশী কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে দাম সমন্বয় করছে।
করোনা মহামারীর মধ্যে এমনিতে শিক্ষা খাতের অবস্থা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। মহামারী চলাকালীন যে ক্ষতি হয়েছে, তার পুরোটা মেরামত সম্ভব হয়নি। আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়, মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্য বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি যেভাবে আলোচনায় আসে, শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ার বিষয় সেভাবে আলোচনায় আসে না। এভাবে শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়তে থাকলে চলমান শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হতে পারে। সরকারের ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কর্মসূচিও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। মানুষের খরচের বোঝা আরো ভারী হয়ে যাবে। নিম্নবিত্ত মানুষ পড়াশোনা চালাতে নিরুৎসাহিত হয়ে যাবে। এমনকি সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারে অনেকে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা মত দিচ্ছেন, পড়াশোনার উপকরণ খরচ বাড়ার বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলার আগেই এটি যাতে আর না বাড়ে, সেদিকে সরকারের মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া শিক্ষাসহায়ক পণ্যের ভ্যাট বা ট্যাক্স কমিয়েও যদি দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, সে চেষ্টা করা দরকার। এজন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
শিক্ষার মৌলিক উপকরণ কাগজের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। দাম বাড়ার পাশাপাশি অর্ডার করেও ব্যবসায়ীরা কাগজ পাচ্ছেন না। কাগজের দাম বাড়ায় ফটোকপির দামও বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা কাগজ না পাওয়ার জন্য কলমালিকদের দায়ী করেন। আবার কলমালিকরা জানান তারা নিরুপায়। বিশ্ববাজারে মণ্ডের দাম বাড়ায় কাগজের দামে এ ঊর্ধ্বগতি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে টালমাটাল বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবেই কাগজসহ শিক্ষা উপকরণের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। এসব পণ্যের দাম কমার সম্ভাবনাও কম। কাগজের দাম বাড়ায় বই-খাতার দামও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি ও শিক্ষা উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির মূল্যমান বাড়ানো উচিত। না হলে যে উদ্দেশ্যে উপবৃত্তির প্রচলন হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে না। আবার উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ালেই হবে না, এক্ষেত্রে শিক্ষাপণ্যের বাজারদরের দিকটিও বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকটের সময় উপবৃত্তির মূল্যমান আদৌ বাড়ানোর কথা বিবেচনা করা হবে কিনা সেটিও আশঙ্কার বিষয়। কারণ রিজার্ভ সংকট থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংকটের ঢেউ বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করছে। যে কারণে সরকারকে এমনিতেই বিভিন্ন ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হচ্ছে, সেখানে নতুন করে ব্যয় বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ সরকার নেবে এ আশা করা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবু দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ পুনর্বিবেচনা করা উচিত।
উপবৃত্তির সুফল যেভাবে আমাদের শিক্ষা খাতের কার্যক্রমকে স্বাভাবিক রেখেছে, তাতে আমরা আশান্বিত হয়েছি। এ ধারাবাহিকতা লক্ষ্যচ্যুত হোক বা উদ্দেশ্য পূরণে ছেদ পড়ুক তা কারো কাম্য নয়। তাই শত সীমাবদ্ধতার মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের কার্যক্রম অব্যাহত থাকুক আমরা সে প্রত্যাশাই করি। খরচে কুলোতে না পেরে শিক্ষা কার্যক্রম থেকে কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে, এটি উপবৃত্তির লক্ষ্য ছিল না। আগামীর বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় হিসেবে গড়ে তোলায় শিক্ষার আলো বিস্তারের বিকল্প নেই, কিন্তু ক্ষুধার্ত শরীরে তো শিক্ষা কার্যক্রমে মন বসবে না। যে কারণে উপায়ান্তর না পেয়ে অনেক অভিভাবকই হয়তো সন্তানের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিতে পারেন। এক্ষেত্রে উপবৃত্তি নামক যে সামান্য স্বস্তির জায়গাটুকু রয়েছে, সেটিও শিক্ষা উপকরণের অব্যাহত দাম বাড়ার সঙ্গে সমানুপাতিক অবস্থান বজায় রাখতে না পারলে হতাশাই বাড়বে। সরকার শিক্ষা খাতে যেসব উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বজায় রেখেছে, তার মধ্যে উপবৃত্তির কার্যক্রম সব মহলেই প্রশংসিত হয়েছে। যে কারণে এ কঠিন সময়ের মধ্যেও উপবৃত্তির মূল্যমান বাড়ানোর মতো সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ যদি সরকার নিতে পারে, তাহলে তা দেশের শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে তার ফল বৃথা যাবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যথোপযুক্ত শিক্ষাদানের মাধ্যমে সুশিক্ষিত জাতি হিসেবে গড়ে তোলার পথচলায় বিঘ্ন না ঘটুক, অর্থনৈতিক সংকটের এ দিনগুলোয়ও শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যাক, সময়মতো শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করে দক্ষ নাগরিক হিসেবে তৈরি হোক এটিই আমাদের প্রত্যাশা। এজন্য শিক্ষা উপকরণের বর্ধিত দামের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে উপবৃত্তির মূল্যমান বাড়ানোর জন্য আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি।










