গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সরবরাহ করা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বেশ। পরিসংখ্যানের মান ও ব্যুরোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়েও সংশয় ছিল। এটি আরো পোক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাংকের স্ট্যাটিস্টিক্যাল ক্যাপাসিটি স্কোরে। বিশ্বব্যাংক বলছে, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে পরিসংখ্যানগত দুর্বলতা আরো তীব্র হয়েছে। দেশের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল ২০১৪ সালে। সে বছর ১০০ পয়েন্টের মধ্যে প্রায় ৮০ পয়েন্ট পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৯ সালে বাংলাদেশের স্কোর পয়েন্ট কমে ৬২ দশমিক ২-এ দাঁড়িয়েছে। বিবিএস অনেক জরিপ ও শুমারি করছে। কিন্তু কোন কাজটা আগে করা উচিত, তারা সেটা নির্ধারণ করতে পারছে না। যেমন জনশুমারি, কৃষিশুমারি, শ্রমশক্তি জরিপ, খানা আয়-ব্যয় জরিপ—সরকারের যেকোনো নীতিকৌশল প্রণয়নের জন্য এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের বাছাই প্রক্রিয়াটা বেশ দুর্বল। বিবিএস এমন কিছু কাজ করে, যেগুলো অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রশিক্ষিত মানুষ দরকার। এটা কারিগরি সংস্থা। এখানে সংস্কার আনা জরুরি। সেটি আমি ধীরে ধীরে করব। তবে এক লাফে করব না। এতে ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বিবেচনায় মূলত তথ্যের উৎস দুর্বলতা, মেথডোলজিক্যাল দুর্বলতা বা মান নির্ধারণে দুর্বলতা, নির্ভুলতা ও নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ করতে না পারার কারণেই ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের তথ্যের মান দুর্বল হচ্ছে। সরকার দেশের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থা তথা বিবিএসের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করাতে চায়। এ লক্ষ্যে পরিসংখ্যান আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একই বছর বাস্তবভিত্তিক একটি এনএসডিএস প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এ সময়েই বাংলাদেশের পরিসংখ্যানের মান কমেছে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। এর পেছনের কারণ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

প্রমাণভিত্তিক, বাস্তবসম্মত ও সঠিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সঠিক পরিকল্পনা দরকার। সময়োচিত ও নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান সংগ্রহ, সংকলন এবং প্রকাশনা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ভারতের আদলে দেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালী করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ব্যুরোতে বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন। এর মূল উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত সঠিক, নির্ভরযোগ্য, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান প্রণয়ন। এ লক্ষ্যে বিবিএস পরিচালিত প্রধান প্রধান জরিপসহ অন্যান্য পরিসংখ্যানগত কার্যক্রমের পরিচালনা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী করা। দ্রুততম সময়ে তথ্য সংগ্রহ, সংকলন, প্রক্রিয়াকরণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে যথাসময়ে তথ্য বা রিপোর্ট প্রকাশ করা। তথ্য সংগ্রহ থেকে রিপোর্ট প্রকাশ পর্যন্ত সামগ্রিক প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার লক্ষ্যে একটি আইসিটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করা। সীমাবদ্ধ সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে সর্বাধিক পরিসংখ্যান প্রস্তুতের লক্ষ্যে জরিপের পরিবর্তে প্রশাসনিক উৎস থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা। এজন্য তথ্য উৎপাদনকারী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, অধিদপ্তরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা। দাপ্তরিক পরিসংখ্যান প্রণয়ন একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এ কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য দক্ষ জনবল অপরিহার্য। তাই বিবিএসে কর্মরত সব ধরনের জনবলকে দেশে-বিদেশে নিয়মিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল হিসেবে গড়ে তোলা দরকার। এছাড়া জাতীয় হিসাব প্রাক্কলন, পরিবেশ পরিসংখ্যান তৈরি, জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার তৈরি, জেন্ডার স্ট্যাটিস্টিকস প্রণয়ন, বিবিএসের সব শুমারি, জরিপের সংজ্ঞা ও মেথডোলজি আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিসংখ্যান ব্যুরো শক্তিশালীকরণ কার্যক্রম চলছে। আমরা আশা করব, বিশ্বব্যাংকের আলোচ্য প্রতিবেদনের আলোকে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে সংস্কার ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যান নিশ্চিতে কার্যকর সংস্কার করা হবে।

পরিসংখ্যানের মান উন্নত না হলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ আরো বেড়ে যাবে। যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ করে গড় বের পরিসংখ্যান নয়। এজন্য গবেষণা দরকার। রফতানি, রেমিট্যান্স, ব্যাংকঋণের যে তথ্য পাওয়া যায় তার সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্যের সমন্বয় হয় না। কর্মসংস্থান ও বেকারত্বের যে তথ্য বিবিএস দিচ্ছে তাও বাস্তবের সঙ্গে খাপ খায় না। সঠিক তথ্য থাকলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়াও সঠিক হয়। তথ্য সময়মতো, নির্ভরযোগ্য ও সাধারণের জন্য কীভাবে সহজলভ্য করা যায় তা জানা থাকাটা সরকারের জন্য জরুরি। একটি পরিসংখ্যান কমিশন গঠন করতে হবে। স্বল্প সময়ের মধ্যে তাদের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে বিবিএসের মধ্যেই কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে। যেখানে বিভিন্ন জরিপ ও গবেষণার জন্য প্রণীত কারিগরি কমিটিতে পরিসংখ্যানবিদদের স্থান নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন বিভাগ ব্যুরোতে পরিণত করতে হবে। প্রয়োজনে বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানবিদদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। প্রতিষ্ঠানের দুজন মানুষকে বাইরে না পাঠিয়ে বাইরের দেশের দুজন প্রশিক্ষক এনে দেশেই ৫০ জনকে প্রশিক্ষিত করানো যায়। পর্যায়ক্রমে জরিপ প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়াতে হবে। সর্বোপরি কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হবে ।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে, লক্ষ্য দ্রুত উন্নত দেশ হওয়ার। তাই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়নে নতুন নতুন তথ্য-উপাত্তের পাশাপাশি সঠিক ও মানসম্পন্ন পরিসংখ্যানও প্রয়োজন। এর জন্য পরিসংখ্যান ব্যুরোকে শক্তিশালী ভিত্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অনেক জরিপ নিয়মিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। অনেক অর্থনৈতিক জরিপ ঝুলে রয়েছে। সমসাময়িক তথ্যের অভাবে অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের গবেষণা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবরও মিলছে। কোনো বিষয়ে পরিসংখ্যান বা সুষ্ঠু তথ্য ব্যবস্থাপনা থাকলে সরকারের জন্য ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সহজ হয়। উপজেলা পর্যন্ত আপনাদের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা রয়েছে। উপজেলায় দপ্তর আছে। সেক্ষেত্রে নতুন যে ক্ষমতা আছে, সেটা প্রয়োগ করতে হবে।