‘এখনকার ছেলেমেয়েরা চরম বেয়াদব। এদের ব্যাপারে আমি খুবই হতাশ।’ আমাদের বয়সী অনেকেই মাঝেমধ্যে এমন উষ্মা প্রকাশ করেন। যুক্তি হলো, তারা শৈশব-কৈশোরে অসংখ্য বিষয়ে সচেতন ছিলেন। অভিভাবক ও শিক্ষকদের আদেশ-উপদেশ প্রতিপালনেও খুব আন্তরিক থাকতেন। অথচ এখনকার ছেলেমেয়েরা সেগুলো কেয়ারই করে না! পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বিষয়ে তাদের উদাসীনতা লক্ষণীয়। সারা দিন কী যেন সব নিয়ে তারা ব্যস্ত থাকে। মন খুলে বড়দের সঙ্গে কথাও বলে না! মোটাদাগে এই হলো অভিযোগ। কিন্তু একটু ভেবে দেখলাম, আমাদের কিশোর বয়সেও মুরব্বিরা ঠিক এমনটাই বলতেন। হয়তো তাদের বাবা-চাচারাও তাদের ব্যাপারে এমন দৃষ্টিভঙ্গিই পোষণ করতেন...!
তাহলে স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে, একই অভিযোগ কেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়াচ্ছে? এর একটা কারণ হতে পারে—উভয় প্রজন্মের মাঝে ২০-৩০ বছরের যে বড় ব্যবধান রয়েছে, তা ঠিকমতো ধরতে না পারা; কিংবা সেদিনের ছোট্ট বাবুটা আজ দৃঢ়ভাবে নিজের মত দিচ্ছে, সেটা মানতে কষ্ট হওয়া। খুব সম্ভবত প্রত্যেকেই নিজের শৈশবকে স্ট্যান্ডার্ড ধরে পরবর্তীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করান। ফলে বিচ্যুতিটা বেশ বড় হয়ে ধরা দেয়। কিন্তু একবার ভাবুন তো আপনার দাদা যেমন ছিল, আপনার ছেলেও যদি তেমন হয়, তবে কি সে চলমান গতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে? আর সব শিশুই আপনার শৈশবের মতো জীবনযাপন করলে পৃথিবীটা কি খুব দ্রুতই বড় একঘেঁয়ে হয়ে উঠত না?
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ পরিবারকে না জানিয়ে লেখিকা তসলিমা নাসরীনকে বিয়ে করার পরে কৈফিয়ত হিসেবে তার বাবাকে একটা চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে এই বিষয়ে জুতসই এক ব্যাখ্যা মেলে (ইউটিউবে দেখুন: বাবাকে লেখা রুদ্রের চিঠি)। আসলে এ দ্বন্দ্ব পিতা-পুত্রের নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের! এই পার্থক্য ক্রমেই প্রবল হচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে শঙ্কার বিষয় হলো, বদলের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আকস্মিক শিকড়ে যে টান লাগছে, তা ক্রমেই আমাদের সংস্কৃতির জন্য হুমকি হয়ে উঠছে না তো?
বিষয়টার গভীরতা উপলব্ধি করলেও মুখে স্বীকার করতে কষ্ট হয়। কারণ আমাদের আঁতে ঘা লাগে। অসংখ্য যুক্তি ও তথ্য দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ব্যাপারে আমরা খুবই যত্নশীল। যেকোনো মূল্যে সেগুলো রক্ষায় শপথ নিতেও দ্বিধা করি না। কিন্তু কথা ও কাজ কি সামঞ্জস্যপূর্ণ? খুব সম্ভবত, না। হয়তো সে কারণেই বুঝে হোক কিংবা না বুঝে ক্ষতিকর উপাদানগুলোকে দৈনন্দিন জীবনে ব্যাপকভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছি। ফলে মুখে যা-ই বলি না কেন, ঘটনা কিন্তু ঠিকই ঘটে চলেছে। লাগাম টানার নেই দৃশ্যমান উদ্যোগ।
কয়েকটা উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বুঝতে চেষ্টা করি। প্রথমত, আমাদের খাবারের ঐতিহ্য গর্ব করার মতো। শুধু দেশ নয়, বিশ্বপরিমণ্ডলেও তা দিয়ে উল্লেখযোগ্য সফলতা এসেছে। কিন্তু আপনার-আমার সন্তানের প্রিয় খাবারের তালিকাটি দেখুন। তাদের পছন্দের জায়গায় খাওয়াতে চাইলে কোন রেস্টুরেন্টগুলোয় যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে? তাদের পছন্দের মেনুতে কি দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলো থাকে? তাহলে নিজেদের খাবার অর্ডার করার মতো যথেষ্ট স্বাধীন হওয়ার পরে তাদের টেবিলে দেশী খাবার স্থান পাবে তো?
দ্বিতীয়ত, তাদের দৈনন্দিন জীবনে পরস্পর ভাব বিনিময়ের ধরন ও প্রবণতা কি বাংলা ভাষার গৌরব সমুন্নত করে? তাদের কত শতাংশ বাংলা সাহিত্য পড়ে, বাংলা গান শোনে, বলা ও লেখায় হাজার বছর ধরে চালু থাকা প্রবাদ-প্রবচন, বাগধারা ব্যবহার করে? বিনোদনের জন্য তারা যেসব উপাদান নির্দ্বিধায় গ্রহণ করছে, তা কি আমাদের ঐতিহ্য সুরক্ষার জন্য ইতিবাচক? পোশাক-আশাক কি আমাদের সংস্কৃতিকে মোটাদাগে ধারণ করে?
এর পরে অতিথিপরায়ণতা আমাদের সংস্কৃতির বিশেষ ঐতিহ্য বলে আমরা গর্ববোধ করি। রক্তের আত্মীয় নয় এমন ব্যক্তিদেরও ছোটবেলা দেখতাম নানা প্রয়োজনে এসে আমাদের বাড়িতে কয়েক দিন পর্যন্ত থাকত। নগরজীবনে সে চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো, স্বল্প সময়ের জন্য বাসায় মেহমান এলেও শিশুরা তাদের কাছে গিয়ে বসে না, আন্তরিকভাবে কথাবার্তা বলে না। অনেকে তো রীতিমতো বিরক্ত হয়; পছন্দের ডিভাইস নিয়ে ঘরের কোণে ঘাপটি মারে, ঠেলেও সামনে পাঠানো যায় না। তাহলে তারা যখন বাড়ির কর্তা হবে তখন নিকটাত্মীয়দের সঙ্গেও সম্পর্ক কি বজায় থাকবে?
আগে ‘নাড়ির টান’ বলে একটা কথা শোনা যেত। অর্থাৎ জন্মের সময় নাড়ি পোঁতার স্থান বা অঞ্চলের প্রতি নাকি বিশেষ টান অনুভব হয়। এখন হাসপাতাল-ক্লিনিকে জন্ম হওয়ায় সে ল্যাঠাও চুকেছে! ফলে সুতাবিহীন ঘুড়ির মতো আমরা হাওয়ায় ভাসতে পেরে নিজেদের খুব ভাগ্যবান ভাবছি। কিন্তু কোনো রেসিং কারো উল্টে গেলে অন্য প্রতিযোগীদের যেমন ফিরে তাকানোর সুযোগ থাকে না, ঠিক তেমনিভাবে প্রতিনিয়ত টার্গেটের পেছনে ছুটতে থাকা আমরা বড় ধাক্কা খেলে টেনে তোলা হাতের সংখ্যা দ্রুতই কমে আসছে। পিছুটান বা টেনে ধরার মানুষগুলো ক্রমেই নিঃশেষ হলে সুতা কাটা ঘুড়ির পরিণতি হওয়াই কি স্বাভাবিক নয়?
আগের দিনে পরিবার ও চারপাশ থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রাথমিক শিক্ষাগুলো পাওয়া যেত। ব্যক্তি ও সমাজের অধঃপতন ঠেকাতে সেই শিক্ষাগুলোর বিশেষ ভূমিকা থাকত। কারণ কোনো ধর্মই অন্যায়-অনৈতিক কাজকে সমর্থন করে না। কিন্তু আমাদের সন্তানদের তথাকথিত সফলতার দৌড়ে জেতাতে গিয়ে নৈতিক ও মানবিক জ্ঞান থেকে দূরে রাখছি। ফলে কোনো কারণে একবার কেউ লাইনচ্যুত হলে টেনে ধরার মতো লাগাম অবশিষ্ট থাকছে না। সবাই প্রত্যাশা করছি যে পরবর্তী প্রজন্ম মানবিক গুণাবলির অধিকারী হবে। কিন্তু সেগুলো চর্চার বন্দোবস্ত না করে শুধু প্রত্যাশা করা অনেকটা গাছ না লাগিয়ে ফল খাওয়ার আশা করার মতোই, তাই না?
এখন কথা হলো, আমরা কি চলমান এই পরিবর্তন প্রবণতা ঠেকাতে পারব? না, পারব না; সেটা জরুরিও নয়। কারণ মনীষীরা বলেন, দুনিয়ায় পরিবর্তনই হলো সবচেয়ে স্থায়ী বিষয়। অর্থাৎ ক্রমেই পরিবর্তিত হওয়া মানবসমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই আমাদের সন্তানরা আধুনিকতার উপাদানগুলো অবশ্যই গ্রহণ করবে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বদলের চেয়ে তাদের পরিবর্তনের গতি অনেক বেশি হলে তখনই শঙ্কা জাগে। ভালো লাগে বলেই ভিনদেশী সব ইউটিউবারকে (কিংবা দেশীয় টিকটকার বা লাইকিবাজদের) আদর্শ ভেবে তাদের মতো জীবনযাপন শুরু করলে তথাকথিত সভ্য দেশগুলো যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ভোগ করছে, সেগুলো গ্রহণ করার জন্যও আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।
এর একটা সহজ উদাহরণ হলো, আমরা ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ ধারণাটি এরই মধ্যে গ্রহণ করেছি। অর্থাৎ উন্নয়নের ইঁদুর দৌড়ে শামিল হতে গেলে শিশুকে যে অন্যদের তত্ত্বাবধানে রেখে যাওয়া দরকার, তা বুঝতে পারছি। কিন্তু সেই একই প্রেক্ষাপটে ওল্ড হোম (বা বৃদ্ধাশ্রম)-কে গ্রহণ করতে পারছি না! কিন্তু উন্নয়ন নেবেন আর তার সাইড ইফেক্টকে অস্বীকার করবেন, তা তো হয় না! আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার এক্ষেত্রে মজা করে বলেন, আজকালকার মায়েরা চায় তার সন্তান সফল হতে হতে মঙ্গল গ্রহ পর্যন্ত যাক। আবার সারা দিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে আসুক!
সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো, যাদের অনুকরণে সংস্কৃতির নিত্যনতুন উপাদান গ্রহণ করা হচ্ছে, আমাদের বাস্তবতা কি তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগুলো কি সেভাবে কার্যকর রয়েছে? যেমন তাদের দেশে সন্তানকে স্কুলে পাঠালে তার ওই বয়সে যা শেখা বা জানা দরকার, তা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই যথেষ্ট। আমরা কি তেমনটা প্রত্যাশা করতে পারি? সেখানে বিপদকালে একটা ফোনকলে পুরো সিস্টেম যেভাবে তার সহযোগিতায় এগিয়ে আসে, আমরা কি সেটা কল্পনাও করতে পারি? চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে তারা যেভাবে বিদ্যমান সিস্টেমের ওপর নির্ভর করতে পারে, আমরা কি সেটা চিন্তা করতে পারি? তাদের সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব-কর্তব্য যেভাবে প্রতিপালন করে, আমরা কি তা আশাও করতে পারি?
এই সবগুলো প্রশ্নের জবাব নেতিবাচক হলে তার পরও তাদের মডেল ফলো করা বা সেগুলোর অনুমোদন দেয়া কি আদৌ কল্যাণ বয়ে আনবে? গতির সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ হলে হয় সংঘর্ষ না-হয় বিচ্যুতি অনিবার্য। আমরা খুব সম্ভবত দুটোরই মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এক বোতলের ছিপি অন্য বোতলে লাগাতে গিয়ে বিষয়টা বুঝতে পারলে নিজের বোকামির জন্য হেসে উঠি। কিন্তু সংস্কৃতির মতো জীবনের অপরিহার্য উপাদানের ক্ষেত্রে একই কাজ করতে গিয়ে বোকা নয়, নিজেদের চালাক ভাবছি! গতি ততক্ষণই ভালো যতক্ষণ তা নিয়ন্ত্রিত উপায়ে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। সংস্কৃতির পরিবর্তনের বিষয়টাও তেমনি। কিন্তু গত দুই দশকে ক্ষেত্রবিশেষে এই গতি এতটাই প্রবল হয়েছে যে তা ভাবনার বিষয় বটে...।
মার্কেটিংয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এ বিষয়গুলো কেন আমাকে ভাবায়? কারণ এই ‘ইনোসেন্ট’ পরিবর্তনের মধ্যেই ইঙ্গিত রয়েছে ব্যবসায়-বাণিজ্যের গতি ও বাঁকবদলের। এ ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা পেতে আমার সদ্য প্রকাশিত ‘পোস্ট ক্রাইসিস বিজনেস’ বইটা পড়তে পারেন। সেখানে দেখাতে চেষ্টা করেছি যে এই চর্চার মাধ্যমে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে ক্রমেই ক্রেতা হারাবে, দেশীয় শিল্পী-খেলোয়াড়-সেলিব্রেটির জায়গা দখল করবে বিদেশীরা। নিজে কখনো মাঠে গিয়ে ফুটবলে লাথি দেয়নি, আমাদের জাতীয় ফুটবল দলের একজন খেলোয়াড়কেও চেনে না, তবুও সে বার্সা-রিয়ালের খেলা দেখার জন্য সারা রাত জেগে থাকে। ভোরে চিল্লায়া প্রতিবেশীদের ঘুম ভাঙায়! তার পরও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে?
এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। তবে উপলব্ধির জন্য উল্লিখিত বিষয়গুলোই যথেষ্ট। বাঙালির খাবার পছন্দ না করা, দেশীয় পোশাক পরতে স্বচ্ছন্দ্য বোধ না করা, পূর্বপুরুষের ভাষায় নিজেদের ভাব বিনিময় না করা, নীতি ও মূল্যবোধের ব্যাপারে উদাসীন থাকাদের হাতে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ঠিক কতটা সুরক্ষিত? শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় নিয়মিত গবেষণা করে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নিয়মিত কাজ করে। লক্ষ্য থাকে বিচ্যুতির মাত্রা যতটা সম্ভব হ্রাস করা। আমাদের সংস্কৃতির ধারক-বাহক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো কি তেমন দায় বোধ থেকে কাজ করছে?
মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মস্তিষ্কের মালিকানা’ বইয়ের লেখক










