বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশে দ্রুত নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিতভাবে কংক্রিটনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণের ফলে শহরগুলোও ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠছে। এ অবস্থাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপ বলা হয়। এ অবস্থায় শহরের তাপমাত্রা নিকটস্থ সবুজ এলাকা বা গ্রামীণ অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকে। সম্প্রতি বেশকিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নগরের তাপমাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে নগরের স্থাপত্য বিন্যাস, নগরের সামগ্রিক স্থাপত্য বিন্যাস, ভবনের ঘনত্ব, সড়ক অবকাঠামো ও সবুজায়নের হার ভূমিকা রাখে। গবেষণায় এও দেখা গেছে, শুধু জলবায়ু পরিবর্তন নয়, বরং মানবসৃষ্ট কারণেও পরিবেশ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।

শহরের অবকাঠামোতে কংক্রিট, অ্যাসফল্ট ও কাচের মতো উপকরণ সূর্যের তাপ দ্রুত শোষণ করে এবং দীর্ঘক্ষণ তা ধরে রাখে। দিনের সময় এ উপকরণগুলো মাত্রাতিরিক্ত তাপ শোষণ করে এবং রাতে তা নির্গত করে। এজন্য রাতেও পরিবেশ ঠাণ্ডা হতে পারে না। বিশেষত উঁচু ভবন ও সংকীর্ণ রাস্তায় বাতাস চলাচলে বাধা তৈরি হওয়ায় নগরের তাপমাত্রা আরো বেড়ে যায়। গবেষণায় এটিকে ‘আরবান ক্যানিয়ন ইফেক্ট’ বলা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অনেক গুরুতর সমস্যা। ঢাকা শহরকে নিয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপপ্রবাহের সময় নগর তাপদ্বীপ প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে এবং শহরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা আশপাশের এলাকার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। দ্রুত নগরায়ণের কারণে ঢাকায় উন্মুক্ত স্থান, জলাধার ও সবুজায়নের পরিমাণ কমে গেছে। একই সঙ্গে কংক্রিটনির্ভর বহুতল ভবনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শহরের প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে নগরের মানুষ দিন ও রাত উভয় সময়ই তাপজনিত অস্বস্তির মধ্যে বসবাস করছে।

আবেদা তাবাসসুমের সমসাময়িক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গত ২৫ বছরে ঢাকার নগর তাপদ্বীপ তীব্রতা (ইউএইচআই) একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে। প্রতি দশকে এ হার শূন্য দশমিক ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকার গড় ইউএইচআই তীব্রতা শূন্য দশমিক ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মৌসুমি ভিত্তিতে দেখা যায়, শীতকালে এ হার সবচেয়ে বেশি (শূন্য দশমিক ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) এবং বর্ষাকালে সবচেয়ে কম (শূন্য দশমিক ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। সব ঋতুতেই রাত ৯টায় (স্থানীয় সময় অনুযায়ী) ইউএইচআই সর্বাধিক শক্তিশালী হয়। ঢাকার দৈনিক সর্বোচ্চ গড় ইউএইচআই তীব্রতা ২ দশমিক ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গবেষণায় আরো দেখা যায়, ঢাকায় তাপপ্রবাহের ঘটনার হার বর্ষা মৌসুমে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে; প্রতি দশকে ৫ দশমিক ৮ দিন করে বাড়ছে। বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ সাধারণত প্রাক-বর্ষা মৌসুমে মধ্য ও উচ্চ ট্রপোস্ফিয়ার স্তরে অ্যান্টি-সাইক্লোন বায়ুপ্রবাহ এবং উচ্চ চাপ অস্বাভাবিকতার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর বর্ষা মৌসুমে নিম্ন থেকে মধ্য ট্রপোস্ফিয়ার স্তরে একই ধরনের অ্যান্টি-সাইক্লোনিক প্রবাহ ও উচ্চ চাপ অস্বাভাবিকতার সঙ্গে যুক্ত থাকে। তাপপ্রবাহের সময় দেখা যায়, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে দিন ও রাত উভয় সময় এবং বর্ষা মৌসুমে মূলত রাতের বেলায় নগর তাপদ্বীপ তীব্রতা আরো বেশি বেড়ে যায়। আপেক্ষিক আর্দ্রতা ও মেঘাচ্ছন্নতার হ্রাস ইউএইচআই এবং তাপপ্রবাহের পারস্পরিক প্রভাব আরো শক্তিশালী করে তোলে।

তাপজনিত চাপ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। অতিরিক্ত গরমের কারণে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, উচ্চ রক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে নগর তাপদ্বীপ প্রভাব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু, বৃদ্ধ ও নিম্ন আয়ের মানুষ এ ঝুঁকির মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকে। বিশেষ করে যেসব মানুষ খোলা পরিবেশে কাজ করেন, যেমন নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালক বা কৃষিশ্রমিক—তারা দীর্ঘ সময় তাপের মধ্যে থাকার কারণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। অতিরিক্ত গরম মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং অর্থনৈতিক উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ সমস্যা সমাধানে স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় বলা হয়েছে, নগরে ভবনের ঘনত্ব কমানো, ভবনের উচ্চতা ও বিন্যাস সঠিকভাবে নির্ধারণ করা এবং পর্যাপ্ত সবুজায়ন নিশ্চিত করলে নগর তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষভাবে ভবনের অবস্থান এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত যাতে প্রাকৃতিক বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে। একই সঙ্গে উঁচু ছাদ, বারান্দা, সূর্যরোধী ছায়া ব্যবস্থা এবং আড়াআড়ি প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ব্যবহারের মাধ্যমে ঘরের অভ্যন্তরে তাপমাত্রা কম রাখা যায়। বর্তমানে ‘শীতল ছাদ’ প্রযুক্তি নগর তাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিফলক রঙের ছাদ সূর্যের তাপ কম শোষণ করে এবং ভবনের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হ্রাস করে। হালকা রঙের উপকরণ ও তাপ প্রতিফলক পৃষ্ঠ ব্যবহার করার মাধ্যমে নগরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একইভাবে সবুজ ছাদ এবং উল্লম্ব বাগান ভবনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছপালা পরিবেশে ছায়া সৃষ্টি করে এবং বাষ্পীভবন ও উদ্ভিদের প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ কমায়। নগর এলাকায় সবুজায়ন বৃদ্ধিও তাপদ্বীপ প্রভাব কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।

স্থাপত্য উপকরণের নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে অধিকাংশ শহরে কংক্রিট ও অ্যাসফল্টের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় তাপ শোষণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কম তাপ শোষণকারী এবং উচ্চ প্রতিফলন ক্ষমতা উপকরণ ব্যবহার করলে নগর পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শীতল রাখা সম্ভব। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে মাটি, বাঁশ ও প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার ছিল, যা স্বাভাবিকভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ছিল। আধুনিক স্থাপত্যে সেই স্থানীয় জ্ঞান ও জলবায়ুভিত্তিক নকশার পুনর্ব্যবহার সময়ের দাবি। নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। গবেষণায় বলা হয়েছে, পার্ক, খেলার মাঠ, জলাধার এবং উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ নগর তাপমাত্রা কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। রাস্তার পাশে গাছ লাগানো, ছায়ানির্ভর পথচারী চলাচল করিডোর তৈরি এবং বায়ু চলাচলের করিডোর সংরক্ষণ শহরের তাপ কমাতে সহায়ক। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভবন আচ্ছাদন অনুপাত কমিয়ে নগরের মধ্যে পর্যাপ্ত খালি স্থান রাখা জরুরি। এ পরিকল্পনার আওতায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাধ্যমে আগাম তাপ সতর্কবার্তা প্রচার, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র জরুরি চিকিৎসা প্রস্তুতি, নগর এলাকায় পর্যাপ্ত ছায়াযুক্ত বিশ্রাম কেন্দ্র স্থাপন এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা জরুরি। একই সঙ্গে স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও নির্মাণ সাইটে তাপপ্রবাহকালীন বিশেষ নির্দেশনা কার্যকর করা উচিত।

সরকারি উদ্যোগও এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু উপযোগী বিল্ডিং কোড প্রণয়ন, শক্তি সাশ্রয়ী ভবন নির্মাণে প্রণোদনা এবং নগর সবুজায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় কর্মপরিকল্পনা তৈরি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর নগর পরিকল্পনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের শহরগুলোকে আরো বাসযোগ্য ও তাপ সহনীয় করে তুলতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, নগর তাপদ্বীপ প্রভাব এখন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং নগর জীবনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং কংক্রিটনির্ভর স্থাপত্য ভবিষ্যতে এ সংকট আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাই টেকসই স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাভিত্তিক নীতিমালার মাধ্যমে একটি শীতল, স্বাস্থ্যকর ও টেকসই নগর পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

ড. সজল চৌধুরী: বিভাগীয় প্রধান ও অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)