আমরা ডিজিটাল যুগে বাস করছি। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ট্যাবের ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ফলে কাগজের ব্যবহার অনেকটাই কমেছে। পরিবেশের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কিন্তু পরিবেশে এক নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ‘ডিজিটাইজেশন’-এর হাত ধরে ইলেকট্রনিকস দ্রব্যের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়ার সঙ্গে তৈরি হচ্ছে এক নতুন ধরনের বর্জ্য পদার্থ, যাকে বলা হয় ই-বর্জ্য। বিজ্ঞানীদের দাবি, পরিবেশের সঙ্গে এগুলো মিশলে মানুষের জন্য তা প্রভূত ক্ষতি করতে পারে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটা কমিয়ে আনা যায়। বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা জারি করেছে। ইতিবাচক বিষয় হলেও শুধু বিধিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নে যথাযথ পদক্ষেপ ও সহায়ক পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে শক্তিশালী ও সক্ষম করে গড়ে তোলায়ও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশ-সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়নে আমাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর না হওয়ায় ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালার প্রয়োগ নিয়েও সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এটি দূরীকরণের দায়িত্ব বিধিমালা বাস্তবায়নকারী পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ওপরই বর্তাবে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে ই-বর্জ্য বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠছে, যা সমাধানের লক্ষ্যে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ই-বর্জ্যের জন্য স্থায়ী ভাগাড় ও রিসাইক্লিং কারখানা স্থাপন করতে হবে। ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। প্রথমত, যন্ত্র ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি শেখা। এতে মোবাইল, ল্যাপটপ ও ট্যাব বেশিদিন ব্যবহার করা যাবে। দ্বিতীয়ত, গুরুত্ব দিতে হবে পুরনো সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর। একই যন্ত্র একাধিক কাজ করবে এমন মাল্টিপারপাস ইলেকট্রনিকস যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, একই চার্জারে সব সংস্থার সব মডেলের মোবাইল চার্জ করা যায়, এমন চার্জারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, ইউনিফর্মের ব্যবহার, নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, জাপানসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা আমলে নেয়া যেতে পারে। প্রায় উন্নত ও স্বল্পোন্নত সব দেশে আমদানিকারকদের রয়েছে নিজস্ব রিসাইক্লিং ব্যবস্থা। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দেশে প্রচলিত ডাম্পিং ব্যবস্থা বা ই-বর্জ্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়ার যে ব্যবস্থা চালু আছে তা মোটেই কার্যকর নয়, বরং তা ঝুঁকিপূর্ণ। কেননা ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে পণ্য নষ্ট করা হলেও তাতে বিদ্যমান ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো থেকে নিরাপদ হচ্ছে না আমাদের পরিবেশ। এতে বাতাসে সিসার পরিমাণ অতিমাত্রায় বেড়ে চলেছে। শুধু তা-ই নয়, দ্রুত নগরায়ণের ফলে মফস্বল শহরগুলোয় ওই বর্জ্য-সংশ্লিষ্ট ঝুঁকি ক্রমে বাড়ছে।

বাস্তব কারণেই ই-পণ্যের ব্যবহার কমানো যাবে না। সংগত কারণে বর্জ্য উৎপাদনও বাড়বে। যেহেতু ই-বর্জ্য পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। সুতরাং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই। এ-সংক্রান্ত বিধিমালাটি দ্রুত কার্যকর হওয়া আবশ্যক। আজকের দিনে কোনো বর্জ্যই ফেলনা নয়। বর্জ্য রিসাইক্লিং করে নতুন নতুন ব্যবহার্য পণ্য তৈরি হচ্ছে। এসব বর্জ্য ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন পরিবেশের ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি তা থেকে বিভিন্নভাবে উপকারও পাওয়া যাচ্ছে। ই-বর্জ্য সংগ্রহের পরে তা রিসাইক্লিং করে নতুন পণ্য উদ্ভাবনের বিষয়টিকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। এজন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায়। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু কাঠামো গড়ে তুলতে আধুনিক ও মাল্টি-ফাংশনিং রিসাইক্লিং প্লান্ট প্রয়োজন, যেমনটি রয়েছে জাপানে। যাতে বিষাক্ত ধাতুগুলো সর্বোচ্চভাবে ঝুঁঁকিমুক্ত ও নিরাপদ পর্যায়ে নিয়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ পদার্থগুলো কার্যকরভাবে সংগ্রহ করা যায়। এ-সংশ্লিষ্ট কাজে ই-পণ্য আমদানিকারকদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। এছাড়া পণ্য বিনিময়ের মাধ্যমে ই-বর্জ্য সংগ্রহ করার জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। তবে জনসচেতনতা বৃদ্ধি সবচেয়ে প্রধান ভূমিকা রাখবে, কেননা তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে অধিকাংশ মানুষই জানে না ই-বর্জ্যের পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতিকারক দিকগুলো। এজন্য প্রচারণা ও পণ্য বিক্রির সময়ে ক্যাটালগে এটির অন্তর্ভুক্তি কার্যকর সমাধান হতে পারে।

জাপান ২০০১ সালে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি রিসাইক্লিং আইনের আওতায় ভোক্তাদের ওপর নষ্ট টিভি, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন ও এয়ারকন্ডিশনারের পরিবহন ও রিসাইক্লিং ফি প্রদান বাধ্যতামূলক করে। দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০০৩ সাল থেকে সম্প্রসারিত দায়িত্ব নীতির ভিত্তিতে রিসাইক্লিংয়ের খরচ উৎপাদকদের রিসাইক্লিং ম্যানেজমেন্ট বডির কাছে পরিশোধ করতে হয়। তাইওয়ানেও একই ধরনের আইন রয়েছে। রিসাইক্লিং কেন্দ্রগুলো এ বডি থেকে ভর্তুকি পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশও পরিবেশ সংরক্ষণ কর হিসেবে সমপরিমাণ টাকা ইলেকট্রনিক পণ্যের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে সে টাকায় পরিবেশসম্মত রিসাইক্লিং কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। দেশে একটি পরিবেশবান্ধব ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি বিভাগীয় শহরে, সম্ভব হলে প্রতিটি জেলা শহরে বিশেষ অঞ্চল গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশসম্মত ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং প্লান্ট গড়ে তোলা, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে উন্নত প্রযুক্তি আহরণে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগ্রহী প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতার অংশ হিসেবে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া যেতে পারে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর নানা ধরনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ই-বর্জ্যের পাচার রোধ করা যাচ্ছে না। কারণ ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং এসব দেশে ব্যয়বহুল। আবার সস্তায় মূল্যবান ধাতব পদার্থ সংগ্রহের হাতছানি থাকায় উন্নয়নশীল দেশগুলোও এসব বর্জ্যের প্রবেশ রোধ করতে পারবে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এসব বর্জ্যের পরিবেশসম্মত ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তবে এ শিল্পের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তৃতির মাধ্যমে যাতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য হুমকির সম্মুখীন না হয়, সেজন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালাটির যুগোপযোগিতা বাড়ানো ও অতি দ্রুত আইনে পরিণত এবং তা বাস্তবায়ন করা সময়ের দাবি। এছাড়া দেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ ইলেকট্রনিক দ্রব্যাদি ইলেকট্রনিক বর্জ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে, তার জন্য সরকারি উদ্যোগে সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। সঠিক পরিসংখ্যানের সমন্বয়ে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আরো সহজতর হবে বৈকি। এর সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কাজ এবং শর্ত ভঙ্গ করলে যে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, তা অপরাধ সাপেক্ষে অনেক কম। কেননা পরিবেশের যে ক্ষতিটা হচ্ছে, তা স্থায়ী ক্ষতি এবং এর প্রভাব বেশি মারাত্মক, তাই এ-সম্পর্কিত আইনি বাধ্যবাধকতা থাকাটাই বাঞ্ছনীয়।

প্রতি বছর মোট আমদানীকৃত ই-পণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। একটু চিন্তা করলেই এর ভবিষ্যৎ বিপর্যয় ও ভয়াবহতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। তাই উন্নয়নশীল বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য ঠিক রাখতে সঠিক ও কার্যকর ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেয়া উচিত। কেননা এটি পরিবেশগত অস্তিত্ব রক্ষায় রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করার সুযোগ আর নেই।