বৈশ্বিক মহামারী নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির চাকা সব বন্ধ হয়ে আসছে। লাখ লাখ মানুষ হারাচ্ছে তাদের চাকরি। দেশের অর্থনীতিও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোয় কাজ করা অভিবাসী শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স, যাদের অধিকাংশই মধ্যপ্রাচ্যে থাকেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে করোনা-উত্তর নতুন নিয়মকানুনে প্রবাসীরা চাকরিচ্যুত হচ্ছেন। দেশের অর্থনীতিতে এটি মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। করোনা পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে আসছেন হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক। যাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা এখন সরকারের জন্য বাড়তি একটি চাপ, কারণ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের তরফ থেকে বেশকিছু উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও প্রবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষায় এখনো কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেখা যাচ্ছে না।
করোনা মহামারীর কারণে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে পুঁজির স্বল্পতা ও বাজার সংকোচনের কারণে রফতানিমুখী শিল্প, এসএমই এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে বেকারত্বের সৃষ্টি হয়েছে। প্রবাসীরা বেকার হয়ে দেশে আসছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিদেশফেরত ও স্থানীয় কর্ম হারানো শ্রমিকদের শিল্প খাতে পুনরায় কর্মসংস্থান ফেরাতে সুযোগ দিতে হবে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা আইএলও, ইউএনআইডিও ও আইওএমের সহযোগিতা প্রয়োজন। এছাড়া প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে এসএমই উদ্যোক্তাদের সহজে ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। যেসব দেশে বাংলাদেশী শ্রমিক কর্মরত, তাদের দেখভালের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য খাদ্য, চিকিৎসাসহ সামগ্রিক সুরক্ষায় সব ধরনের সহযোগিতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মানবিক বিবেচনায় কয়েকটি দেশ থেকে যাচাই-বাছাইসাপেক্ষে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশী কর্মীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব দেশ প্রবাসীদের ফেরত পাঠাতে চাইছে, তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে সচেষ্টও হতে হবে। বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসনের জন্য অর্থঋণ সহায়তা প্রদানে আলাদা ফান্ড গঠন করা যেতে পারে। সর্বোপরি আমাদের শ্রম কূটনীতি আরো সুসংহত করতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ষায় সরকারকে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা এবং সেখানে বৈধভাবে বসবাসকারীদের ফেরত না পাঠানোর জন্য লবিং জোরদার প্রয়োজন। যেসব বাংলাদেশী প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে অথবা ইকামার মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, তাদের ভিসা/ইকামার মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। কোনো কর্মী বিদেশে চাকরিচ্যুত হলে অথবা নিয়োগকারী কোম্পানি যদি কর্মী ছাঁটাই করে, সেক্ষেত্রে তাদের দেশে না পাঠিয়ে সেখানকার অন্য কোনো কোম্পানিতে নিয়োগে লবিং করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ফেরত আসাদের কীভাবে সহায়তা দেয়া হবে, তারও একটি পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। এজন্য প্রথমেই একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে। এতে ফেরত আসা প্রবাসীদের দক্ষতা, কাজের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, কোম্পানির নাম প্রভৃতি সন্নিবেশিত থাকতে হবে। নিজ নিজ দক্ষতা অনুযায়ী দেশে কাজের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার। তাছাড়া প্রবাসীরা উন্নত দেশের কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসছে বা আসবে, তাদের সেই দক্ষতা দেশে কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতিই উপকৃত হবে। দেশে ফেরত আসাদের স্বকর্মসংস্থানে নিয়োজনের লক্ষ্যে স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে ঋণ দিতে পারে প্রবাসী কল্যাণ বা কর্মসংস্থান ব্যাংক। প্রবাসীরা এসে বেকার যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে যে যে কাজ করতে আগ্রহী বা যে কাজে দক্ষ তাকে সে কাজ করতে সহায়তা জোগানো। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা আরো বাড়িয়ে তোলা যাতে পরবর্তীতে জনশক্তি রফতানির কোনো সুযোগ এলে দক্ষ এসব শ্রমিক পাঠানো যায়।
করোনা মহামারীর এই সংকটকালে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টি অবশ্যই অগ্রাধিকার দাবি করে। তাই দেশে ফেরা অভিবাসী শ্রমিকদের যেমন সহায়তা দেয়ার উপায় খুঁজতে হবে, তেমনি প্রবাসে শ্রমবাজার ধরে রাখা এবং ভবিষ্যতের জন্য নতুন শ্রমবাজার খোঁজার কাজেও মনোযোগ দিতে হবে। যারা দেশে ফিরে এসেছেন, তাদের পাঠানো অর্থে প্রতিষ্ঠিত ‘প্রবাসী কল্যাণ ফান্ড’ থেকে এককালীন নগদ সহায়তা দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তাদের নিবন্ধিত করে ডাটাবেজ করতে হবে। নিবন্ধিতদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত কর্মস্থলে যেতে সাহায্য করতে হবে।










