মহামারী নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিও টালমাটাল। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে প্রতিটি খাত। অন্যদিকে মানুষের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাও ব্যাহত হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা চলার পর কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বিশ্ব। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থাও সচল হয়েছে। অনেক দেশে করোনা সংক্রমণের হার কমতেও শুরু করেছে। কিন্তু উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এরই মধ্যে বিশ্বে ফের আসছে নভেল করোনাভাইরাসের আরো একটি প্রবাহ বা ঢেউ। বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় দফা ঢেউয়ের খবর এসেছে। প্রথম দফার ঢেউ সফলভাবে মোকাবেলা করা দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশেও দ্বিতীয় দফার ঢেউ আঘাত হানছে। প্রথম দফার ঢেউ মোকাবেলায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত হিমশিম খেয়েছে। চিকিৎসা না পাওয়া থেকে টেস্ট করতে না পারার ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের কল্যাণে সবাই জেনেছে। এখন পরীক্ষার সংখ্যা কমে দৈনিক ১০ হাজারের নিচে নেমে এসেছে। হাসপাতালের চেয়ে বাইরে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। এর মধ্যে আবার বন্যায় দেশের এক-তৃতীয়াংশ ডুবে রয়েছে। দ্বিতীয় দফার ঢেউ আরো ভয়াবহ হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেখানে প্রথম দফার ঢেউয়ে দরিদ্র ও কর্মহারাদের পুনর্বাসনই করা যায়নি, সেখানে দ্বিতীয় দফায় কীভাবে করোনার প্রভাব সামলানো যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বিশ্ব ব্যাপক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকির মুখে আছে বলেও এর আগে সতর্ক করেছিল জাতিসংঘ। ফলে একদিকে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে পুরো বিশ্বই বিপর্যস্ত, অন্যদিকে ৩৪ কোটি লোক কাজ হারাতে পারে, আছে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি—এসব বিষয় আমলে নিলে কতটা ভয়ানক পরিস্থিতির আশঙ্কা আছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সংগত কারণেই যত দ্রুত সম্ভব বিশ্বনেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্টদের এখনই এ বিষয়গুলো সামনে রেখে এর পরিপ্রেক্ষিতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশ সংশ্লিষ্টদেরও এটা মনে রাখা দরকার, দেশে করোনার সংক্রমণ বাড়ছে, বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। ফলে বিশ্বের ভয়াবহ পরিস্থিতি আমলে নেয়া এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণসাপেক্ষে উদ্যোগী হতে হবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পুরো বিশ্বকেই। এরই মধ্যে যে চ্যালেঞ্জের বিষয়গুলো সামনে আসছে, তা মোকাবেলা করা সহজ কাজ নয়, তবু তা আমলে নিয়ে সর্বাত্মক প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

যে সংকট সারা বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে এসেছে, তা নিরসনে একসঙ্গে কাজ করতে হবে এবং অর্থনৈতিকসহ যাবতীয় ঝুঁকি সামনে রেখে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। মনে রাখা জরুরি, এই ভয়াবহ সময়কে মোকাবেলা করার জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ভিন্ন পথ নেই। এর আগে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনলাইনে দেয়া এক ব্রিফিংয়ে ডব্লিউএফপির প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, সুতার ওপর ঝুলে থাকা কোটি কোটি মানুষের জন্য কভিড-১৯ ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আর পরিস্থিতি মোকাবেলায় সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসার বিষয়টিও তিনি আলোচনায় আনেন। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জীববিজ্ঞানী জেনিফার রোহন মনে করেন, নভেল করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আসবে কিনা, তা নিয়ে সংশয়ের কোনো অবকাশ নেই, বরং প্রশ্ন হচ্ছে সেটি কখন আর কতটা ভয়াবহভাবে আঘাত করবে? এমনকি যেসব দেশ সফলভাবে পরীক্ষা, যোগসূত্র খুঁজে বের করা এবং লকডাউন ব্যবস্থাপনা করেছে, যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, সেসব দেশেও গুচ্ছ আকারে রোগটির সংক্রমণ বৃদ্ধি পেতে দেখা যাচ্ছে। সুতরাং যখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে, ভাইরাস আরো কিছুদিন থেকে যাবে, তার মানে হলো বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হতে থাকবে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে সে বিষয়ে পূর্বাভাস দেয়া যাবে, কীভাবে তাদের শনাক্ত করা হবে এবং তাদের ব্যবস্থাপনা কী হবে?

ইউনিভার্সিটি ডে বার্সেলোনার স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক জুডিথ ভ্যাল বলছেন, নানা ঘটনা থেকে দেশের জনস্বাস্থ্যসেবা বিভাগ কী শিখতে পারছে, সেটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এ মহামারীর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ প্রমাণ করেছে যে এটা নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার আর দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। শুধু একজনের পরীক্ষা করে নয় বা একজনের সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করলে হবে না; এ অঞ্চলের অনেক দেশ এসব করেছে পুরো সরকারের, পুরো সমাজের সব ব্যবস্থাপনা সঙ্গে নিয়ে। জনগোষ্ঠীর ভেতরে এ ভাইরাস ঠেকানোর কোনো সক্ষমতা নেই। যতদিন না একটি কার্যকরী এবং সহজলভ্য টিকা পাওয়া যাবে, আমরা সবাই ঝুঁকির ভেতরে থাকব। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। থানা পর্যায়ে করোনার ন্যূনতম চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।