দেশে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো সুখবর নেই। আমদানিনির্ভর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পরিকল্পনা নেয়া হলেও কার্যত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে চলতি মাসেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। অথচ গত বছরের জুন মাসেই গ্রাহক পর্যায়ে সর্বশেষ গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু এর ফলে গ্যাস সংকটের সমাধান তো হয়নি বরং মূল্যবৃদ্ধির পর গ্যাস সংকট আরো তীব্র হয়েছে। দাম বাড়ানোর সময় সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি দামে এলএনজি কেনা হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকার তা রক্ষা করতে পারেনি। এ পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাসের দাম আবারো বাড়ানো হলে তা সংশ্লিষ্ট খাত থেকে শুরু করে ভোক্তাদের জন্য অর্থনৈতিক চাপ আরো জোরালো করে তুলবে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম সর্বশেষ বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয় গত বছরের ৫ জুন। সে সময় গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছিল ২২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর সাত মাসের মাথায় আবারো গ্যাসের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে জ্বালানি বিভাগ। সরকারের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে শিগগিরই এ-সংক্রান্ত ঘোষণা আসতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রে জানা গেছে।

যদিও মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানা গেছে। কিন্তু এর প্রভাব সর্বস্তরের গ্রাহক পর্যায়ে পড়বে, এটা খুব সহজেই অনুমেয়। এমনিতেই ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে জর্জরিত জনগণ যেখানে নাভিশ্বাস ফেলছে, সে মুহূর্তে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত কেমন প্রভাব ফেলবে সেটি অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে।

এটা সত্য, পরিস্থিতি বিবেচনা করেই গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়। কিন্তু এর ফলে যে জনভোগান্তি হবে সেটিকে তো অবহেলা করা যাবে না। তার ওপর গত বছর যখন গ্যাসের মূল্য বাড়িয়েও কোনো সমাধান মেলেনি, সে পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাসের মূল্য বাড়ালেই যে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে তারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এছাড়া দাম বাড়ানোর পর বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) যে টাকা সাশ্রয় হয়েছে, সে টাকা রাজস্ব চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে কিনা সেটিও বিবেচ্য বিষয়। না হলে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার কথা বলে জনগণের কাছ থেকে বর্ধিত মূল্য গ্রহণ করে যদি কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদান না করা হয়, তাহলে তো এটি সরাসরি প্রতারণার শামিল। এক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো আইনানুগ পদক্ষেপও গ্রহণ করতে পারে।

জাতীয় গ্রিডে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় দেশের গ্যাস খাতে সংকট বিরাজ করছে। এক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর এলএনজির মাধ্যমে গ্যাসের চাহিদা মিটছে না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে (বাপেক্স) কাজে লাগিয়ে দেশের নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনে গুরুত্ব দেয়া হলেও এর সুফল খুব সহসা মিলবে না তা সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমন্বিত মহাপরিকল্পনায়ও উঠে এসেছে। এদিকে গত বছরও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের বিষয়টি বলা হয়েছিল, কিন্তু সঠিক কর্মপরিকল্পনা না থাকায় গত ২৬ বছরেও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশ কোনো সফলতা পায়নি। প্রতিবেশী দেশগুলো সমুদ্র থেকে নিয়মিত প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করলেও এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই পিছিয়ে। ২৬টি ব্লকের মধ্যে মাত্র দুটি ব্লকে অনুসন্ধান চলছে। দেশের সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগাতে ১৯৯৬ সালে সরকার বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করে। এরপর ২০১২ ও ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমার আয়তন বাড়লেও গ্যাস অনুসন্ধানে এখনো কাঙ্ক্ষিত সাফল্য মেলেনি। দুঃখজনক হলেও সত্য, সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি হয়নি। 

এদিকে গ্যাস সরবরাহের জন্য এলএনজিনির্ভর থাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট তীব্র হয়েছে। তাছাড়া সরকারও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের জন্য বাধ্য হয়ে এলএনজি আমদানি কমিয়েছে। যে কারণে শিল্প, বিদ্যুৎ, আবাসনসহ সব খাতে গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়ে সংকট ঘনীভূত হয়েছে। আবাসন খাতে বর্তমানে স্থায়ীভাবে নতুন সংযোগ বন্ধ রয়েছে। এর পরও রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কম পাওয়া যাচ্ছে। 

গ্যাসের সমস্যা বর্তমানে শুধু বাংলাদেশ নয়, বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সে হিসেবে গ্যাসের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন সম্ভব না হলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আমদানি করতে হবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য আরো বড় ঝুঁকি তৈরি করবে। অন্যদিকে গ্যাসের দাম বাড়লে বিদ্যুতেরও দাম বাড়বে। কারণ দেশের প্রায় ৭০ ভাগ বিদ্যুৎ গ্যাস থেকে আসে। কিছুদিন আগে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর আবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে সেটি ব্যাপক জনভোগান্তি তৈরি করবে। এদিকে এলএনজিনির্ভরতা থাকায় গ্যাস সংকট সমাধানে এলএনজি ফিলিং স্টেশনে রেশনিং করা হয়েছে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয় বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। এদিকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের যে অবস্থা, তাতে সরকার এলএনজি আমদানির ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না। এক্ষেত্রে সাময়িক সমাধান হিসেবে দেশে উত্তোলিত গ্যাস সিএনজিতে করে হলেও গ্রিডে যুক্ত করার যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন করা দরকার। একটা বিষয় বিবেচনা করা দরকার, শিল্পে ‘প্রাকৃতিক গ্যাস, গৃহস্থালিতে বিকল্প জ্বালানি’-এ মূলমন্ত্রে গ্যাস সরবরাহে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হলেও তা সফলতার মুখ দেখছে না। তাই শিল্পায়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য হলেও গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। তাছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য হলেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আমরা সাশ্রয়ের কথা যতই বলি, পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না হলে এর ফলে বিদ্যুৎ খাতে বিপর্যয় ঘটতে বাধ্য। যার ফল আমরা গত বছরেই পেয়েছি, এখন শীতকাল হওয়ায় বিদ্যুৎ সংকট অতটা তীব্র না হলেও গরমের সময় বিদ্যুতের যে চাহিদা তৈরি হবে সেটি পূরণ করতে হিমশিম খেতে হবে। এজন্য এখন থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। এদিকে দেশে মজুদ থাকা গ্যাস দিয়ে ১১ বছরের চাহিদা মেটানো যাবে বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তাতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললে চলবে না। জ্বালানি বিভাগকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। সেই সঙ্গে সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে তত্পরতাও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।